মাসখানেক আগেকার কথা। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগের কর্মী ও আধিকারিকেরা নামখানার আশপাশে মাছের গাড়ির উপর নজরদারি শুরু করেছিলেন। আর তার ফল হয়েছিল চমকপ্রদ। খোঁজ মিলেছিল, মাঝের ঝুড়ির আড়ালে লুকোনো বঙ্গোপসাগর থেকে সদ্য তুলে আনা একাধিক প্রজাতির হাঙরের! ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিল পাচারচক্রের এক জনকে। ১৯৭২ সালের ‘ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী যার সবগুলিই ‘সংরক্ষিত প্রজাতি’ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ, ধরা, মারা বা কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মাছের ব্যবসার আড়ালে ‘নিষিদ্ধ’ হাঙরের চোরাকারবার ঠেকাতে তার পরেই তৎপর হয় বন দফতর। এ বছরের বন্যপ্রাণ সপ্তাহে তাই দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগের তরফে বাদাবনের পশুপাখির পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বঙ্গোপসাগরের বাসিন্দা হাঙরদের রক্ষায় জনসচেতনতা গড়ে তোলার উপরে। স্থানীয় গ্রামবাসী এবং স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে সপ্তাহব্যাপী চলেছে ও সচেতনতা-প্রচারাভিযান।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভাগীয় বনাধিকারিক (ডিএফও) নিশা গোস্বামী জানিয়েছেন, তাঁর বিভাগের অন্তর্গত প্রতিটি রেঞ্জেই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হয়েছে জাতীয় বন্যপ্রাণ সপ্তাহ। সহকারী বিভাগীয় বনাধিকারিক (এডিএফও) পার্থ মুখোপাধ্যায় জানান, নিষিদ্ধ জলজ প্রজাতিগুলিকে রক্ষা করতে বছরভরই বকখালি, নামখানা এবং ডায়মন্ড হারবার রেঞ্জে সচেতনতা প্রচার অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘‘ওই রেঞ্জগুলির অন্তর্গত এলাকায় অনেকগুলি মাছের আড়ত আছে। মৎস্যজীবীরা সেখানেই সমুদ্র ধরা মাছ নিয়ে আসেন। হাঙর, শঙ্কর মাছ-সহ বেশ কয়েকটি প্রজাতি ধরা যে আইনে নিষিদ্ধ সে বিষয়ে তাঁদের সচেতন করা হয়। বলা হয়, কোনও ভাবে জালে আটকে গেলে সমুদ্রই ছেড়ে দিতে।’’
হাঙর চোরাচালানের বিরুদ্ধে সে দিনের সেই অভিযানে অংশ নেওয়া অন্যতম আধিকারিক, বকখালির রেঞ্জ অফিসার তন্ময় চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁর এলাকার অন্তর্গত উপকূলবর্তী এলাকায় ব্লু শার্ক, বুল শার্ক, হ্যামার হেড শার্ক, গ্যাঞ্জেটিক শার্কের দেখা মেলে। ‘সংরক্ষিত’ ওই প্রজাতিগুলি চোরাচালানকারীদের নিশানায় থাকায় ধারাবাহিক নজরদারি চালায় বন দফতর। এর পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শঙ্কর মাছ এবং করাত মাছ ধরার অভিযোগের কারণেও সতর্ক থাকতে হয় বন দফতরের আধিকারিক এবং কর্মীদের। এডিএফও পার্থ জানান, এ বারের বন্যপ্রাণ সপ্তাহে ডায়মন্ড হারবার রেঞ্জের মৎস্যজীবীদের মধ্যে গাঙ্গেয় শুশুক রক্ষায় প্রচার অভিযান চালানো হয়েছে। কারণ ওই এলাকায় মুড়িগঙ্গায় গাঙ্গেয় শুশুকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
আরও পড়ুন:
এরই পাশাপাশি এ বারের জাতীয় বন্যপ্রাণ সপ্তাহে, বারুপুর রেঞ্জের অন্তর্গত চিন্তামণি কর পাখিরালয়ে বসেছিল স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে পাখি চেনার আসর। নামখানা রেঞ্জের অন্তর্গত কাঁকড়ামারি চরে সুন্দরবনের বাসিন্দা নানা প্রজাতির কাঁকড়া, মাড স্কিপারের মতো জল-কাদার প্রাণী আর উপকূলবর্তী চরের পাখি (ওয়েডার্স) চেনানো হয় কচিকাঁচাদের। পাশাপাশি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগের তরফে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সঙ্গী করে রায়দিঘি এবং রামগঙ্গা রেঞ্জের ম্যানগ্রোভ-ব্যাঘ্রভূমি লাগোয়া গ্রামবাসীদের নিয়ে বাদাবন রক্ষা ও মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত প্রশমনের কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। মাতলা রেঞ্জের অন্তর্গত ঝড়খালির ‘সুন্দরবন ওয়াইল্ড অ্যানিমেল পার্কে’ স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে গিয়ে হাতেকলমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ম্যানগ্রোভের নানা প্রজাতি আর সুন্দরবনের বন্যপ্রাণ জগতের সঙ্গে।