আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে দ্বিতীয় বার বসার পরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নয়াদিল্লিকে ‘এফ-৩৫ লাইটনিং২’ যুদ্ধবিমান বিক্রির বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু শুল্কযুদ্ধের আবহে সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ভারতের ছ’দশকের পুরনো সামরিক সহযোগী রাশিয়ার উপরেই ভরসা রাখতে পারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। শুক্রবার দিল্লিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈঠকেই মস্কোর প্রস্তাব মেনে যৌথ উদ্যোগে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘সুখোই এসইউ-৫৭’ (‘ফেলন’ নামে যা পরিচিত) নির্মাণের বিষয়ে চূড়ান্ত হতে পারে বলে সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত কয়েকটি খবরে দাবি।
আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর (শনি ও রবিবার) দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ব্রিক্সের ১৮তম শীর্ষসম্মেলন। গত ৩১ অগস্ট কিরগিজ়স্তানের রাজধানী বিশকেকে ‘শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজ়েশন’ (এসসিও)-এর ২৬তম শীর্ষসম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে পুতিনকে ব্রিক্সে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদী। সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে শুক্রবার সকালে দিল্লি পৌঁছেছেন পুতিন। ব্রিক্স শীর্ষসম্মেলন শুরুর আগেই দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক হবে। ‘সুখোই এসইউ-৫৭’ যুদ্ধবিমান চুক্তির পাশাপাশি মোদী-পুতিন আলোচনায় ভারতীয় বায়ুসেনার ব্যবহৃত সুখোই-৩০ এমকেআই আধুনিকীকরণ (যার পোশাকি নাম ‘সুপার সুখোই প্রজেক্ট) এবং আরও এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ও পন্টসার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
প্রতিরক্ষা সমঝোতার পাশাপাশি শুক্রবারের বৈঠকে ভারতে নতুন রুশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও অসামরিক পরমাণুক্ষেত্রের সম্প্রসারণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলার-নির্ভরতা কমিয়ে টাকা ও রুবলের ব্যবহার বাড়ানো এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তেলের উপর শুল্কের বিষয়টি নিয়েও মোদী-পুতিন আলোচনা হতে পারে বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আমেরিকা সফরের সময়ই ভারতকে ‘এফ-৩৫ লাইটনিং২’ যুদ্ধবিমানের ‘এফ-৩৫এ’ মডেলটি বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তা ফিরিয়ে পুরনো সামরিক সহযোগী রাশিয়ার তৈরি ‘সুখোই এসইউ-৫৭’ (‘ফেলন’ নামে যা পরিচিত)-এর উপরেই মোদী সরকার ভরসা রাখে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যেই। কারণ, শুধু বিক্রি নয়, ইতিমধ্যেই পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্থ ফাইটার জেট এসইউ-৫৭-এর যৌথ উৎপাদন, এমনকি প্রযুক্তি হস্তান্তরেও প্রস্তাব এসেছে মস্কোর তরফে।
গত মার্চ মাসে ভারতকে ‘এসইউ-৫৭ই’ (এসইউ-৫৭-র এক্সপোর্ট ভ্যারিয়েন্ট) যুদ্ধবিমানের ‘যৌথ উৎপাদন’ এবং ‘সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তরে’র প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। পাশাপাশি, ক্রেমলিনের তরফে বার্তা দেওয়া হয়, তারা এসইউ-৫৭ ফাইটার জেটের গুরুত্বপূর্ণ ‘সোর্স কোড’ দিতেও রাজি। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ গোড়া থেকেই রুশ বিমান কেনার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, অতীতে কখনও আমেরিকার তৈরি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান ভারতীয় সেনা ব্যবহার করেনি। অন্য দিকে, মিগ-২১, মিগ-২৭, মিগ-২৯, সুখোই-৩০-সহ বিভিন্ন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনার ফাইটার পাইলটদের। তা ছাড়া, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগানের মাধ্যমে দেশের মাটিতে উন্নত হাতিয়ার তৈরির উপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। ফলে বর্তমানে বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত রাখছে কেন্দ্র।
সেই মাপকাঠির নিরিখে রুশ এসইউ-৫৭-র পাল্লা ভারী। কারণ, এফ-৩৫-এর নির্মাতা সংস্থা লকহিড মার্টিন নয়াদিল্লিকে প্রযুক্তি হস্তান্তরে নারাজ বলেই সূত্রের খবর। অন্য দিকে, রাশিয়ার সুখোই সংস্থা ইতিমধ্যেই ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, ‘হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড’ (হ্যাল)-এর সঙ্গে যৌথ ভাবে যুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ বিমান উৎপাদন শুরু করেছে। অন্য দিকে, মস্কোর সঙ্গে ‘সুপার সুখোই প্রকল্পে’ সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানগুলিতে ‘আংশিক স্টেল্থ প্রযুক্তি’ বসানো হবে। যুক্ত হবে উন্নত ‘লো প্রোবাবিলিটি অব ইন্টারসেপ্ট’ (এলপিআই) রেডার। যা নিজের অবস্থান গোপন রেখেই শত্রুর বিমানকে ট্র্যাক করতে পারবে। প্রায় ১১০০ কোটি ডলারের (প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা) এই প্রস্তাবিত প্রকল্পে উন্নততর নেভিগেশন অ্যান্টেনা, এআই-নির্ভর ‘ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট’ এবং দূরপাল্লার আর-৩৭এম ‘আকাশ থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র-সহ বিভিন্ন অস্ত্র ও সেন্সর ব্যবস্থার সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরক্ষা ক্রয় বিষয়ক সমিতি’ (ডিফেন্স অ্যাকুইজ়িশন কাউন্সিল বা ডিএসি) রাশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় ২৮৮টি এস-৪০০ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কেনার প্রস্তাবে ছাড়পত্র দেয়। এর মধ্যে ১২০টি স্বল্পপাল্লার এবং ১৬৮টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। পহেলগাঁও সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় ২০২৫ সালের ৭ মে পাক জঙ্গিঘাঁটিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়েছিল ভারতীয় বাহিনী। ২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই ব্যবস্থার অন্যতম উপাদান ছিল রুশ নির্মিত এস-৪০০। এর উন্নততর সংস্করণ এস-৫০০ ‘প্রমিথিউস’ কেনার রুশ প্রস্তাব নিয়েও মোদী-পুতিন বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।
ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অস্ত্র রফতানিকারক সংস্থা ‘রোজ়োবোরাএক্স’-এর মধ্যে ‘পন্টসার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’-এর যৌথ নির্মাণের বিষয়ে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। পুতিনের এ বারের ভারত সফরে তা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। পন্টসার একটি বহুমুখী এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা বিমান ও ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে বহুস্তরীয় সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমানবিধ্বংসী কামান— এই তিন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা উন্নত রাডার এবং ট্র্যাকিং সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। ৩৬ কিমি দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুকে শনাক্ত করতে এবং সেগুলিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে পন্টসারের।