আনুমানিক ৩ কোটি ৫০ লক্ষ ২০ টাকার ভুয়ো কয়েন বানিয়ে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে একটি চক্র। হরিয়ানা, দিল্লি, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে এই জালিয়াতির কারবার চালাত দলটি। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ৭০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ভুয়ো কয়েন ছড়িয়ে পড়েছে বাজারে।
পুলিশ সূত্রে খবর, এক দল ব্যক্তি হরিয়ানার সোনিপত জেলায় বিগত ১০ মাস ধরে নাটবল্টু বানানোর আড়ালে এই ভুয়ো কয়েন বানাচ্ছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর সহরানপুর থানার পুলিশ তাঁদের পাঁচ জনকে আটক করে। বাজেয়াপ্ত হয় ছ’টি বিরাট উৎপাদন যন্ত্র। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, সোনিপতে পুলিশি অভিযানের আশঙ্কা ছিল। এক সঙ্গীকে দিল্লি পুলিশ আগেই গ্রেফতার করেছিল। তাই যন্ত্রপাতি নিয়ে তড়িঘড়ি উত্তরপ্রদেশে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা।
কী ভাবে তাঁদের খুঁজে পেল পুলিশ? এক চরের মারফৎ তাঁদের অবস্থানের খবর মেলে। তিনি জানান, তিন জন সন্দেহজনক ব্যক্তি ৫০০ বর্গ ফুটের একটি জায়গা খুঁজছে। উদ্দেশ্য, উৎপাদনের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি লাগানো। সেই সূত্র ধরে তীতরোঁ এলাকায় উপকার লুথরা ওরফে অভয়প্রতাপ সিংহকে, সাহরানপুর থেকে হিমাংশু ওরফে গুল্লুকে ও মুজ়ফ্ফরনগর থেকে কূলদীপকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, আরও দুই সঙ্গী সন্তোষ চৌরাসিয়া ওরফে জনার্দন ও অনুরাগ পাল ওরফে লঙ্কেশ কাছেই একটি মোড়ে গাড়ি নিয়ে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছেন। পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে দু’জনকে গ্রেফতার করে। গাড়ির ভিতর থেকে বাজেয়াপ্ত হয় ভারী যন্ত্রপাতি। পাওয়া যায় ৬ হাজার ৪০০ ভুয়ো ২০ টাকার কয়েন। তার মূল্য ১ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা। তাছাড়াও মেলে অসম্পূর্ণ বেশ কিছু কয়েন। সে সব মিলিয়ে মোট মূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা। বিহার পুলিশের সঙ্গে একটি যৌথ অভিযানে সহরানপুরের পুলিশ বিহারের মধুবনী থেকে আরও এক অভিযুক্ত মিথিলেশ চৌরাসিয়াকে গ্রেফতার করে। তিনি অভিযুক্ত সন্তোষ চৌরাসিয়ার ভাই। পুলিশের দাবি, তিনি এই চক্রটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল কয়েন বানানোর পর্যাপ্ত কাঁচামাল জোগান দেওয়া।
আরও পড়ুন:
এই পাঁচ জনকে জেরা করে পুলিশ জানতে পারে, দেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে এই ভুয়ো কয়েনের কারবার চালাচ্ছেন তাঁরা। তার মধ্যে রয়েছে রাজধানী দিল্লিও। মূল অভিযুক্ত উপকার এর আগেও ভুয়ো কয়েন বানানোর অপরাধে শাস্তি পেয়েছেন। তদন্তকারীদের মতে তিনিই এই জাল কয়েন চক্রের মূলচক্রী। এক পুলিশ আধিকারিক রাজীবকুমার কৌশিক বলেন, ‘‘এর আগে উনি স্বর্ণকার ছিলেন। এই কাজ জানেন। ফলে ভুয়ো কয়েন কী ভাবে বানানো হবে, সেই নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করার সমস্ত ভার ছিল ওঁর উপর।’’ পুলিশের মতে, তিহাড় জেলে থাকার সময় উপকারের হিমাংশুর সঙ্গে দেখা হয়। সেখান থেকেই দু’জনে পরিকল্পনা করেন। অন্যান্য জেলে থাকার সময় যোগ দেন বাকি সদস্যেরা।
জেরায় কয়েন বানানোর বিস্তারিত পদ্ধতি জানা গিয়েছে। প্রথম কাজ শুরু হয়েছিল দিল্লি থেকে। একটি কারখানায় অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও নিকেলের সংমিশ্রণে তৈরি মুদ্রার আকারের ধাতব পাত বানানো হত। এর পর আসল ২০ টাকার কয়েনের নকশা নকল করে তৈরি বিশেষ ধরনের ছাঁচ অন্য একটি কারখানায় বানিয়ে নেওয়া হত। ওই ধাতব পাতগুলি ছাঁচে ফেলে শক্তিশালী যন্ত্রের মাধ্যমে চাপ দেওয়া হত, যাতে ২০ টাকার নকশাটি মুদ্রার পাতে পরিষ্কার ভাবে বসে যায়। তার পর ভুয়ো মুদ্রাগুলিকে আরও চকচকে করে তোলা হত। নিখুঁত বৃত্তের আকৃতি দেওয়া হত, যাতে সেগুলি দেখতে একদম আসল ২০ টাকার কয়েনের মতোই মনে হয়। ধৃতদের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, এ সব মুদ্রা বানাতে কয়েন-পলিশিং মেশিন, গ্রাইন্ডিং স্টোন, ডাই, হাতুড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হত। রাজীব এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘প্রতিটি নকল ২০ টাকার কয়েন তৈরি করতে তাঁদের খরচ হত প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার ভুয়ো কয়েন বানানো হত।’’
এ তো গেল বানানোর পদ্ধতি। কিন্তু এই ভুয়ো কয়েন বাজারে ছড়িয়ে পড়ত কোন উপায়ে? জানা গিয়েছে, অভিযুক্তেরা ১০০টি কয়েন একটি প্যাকেটে ভরে দালালদের হাতে তুলে দিতেন। দু’হাজার টাকার প্যাকেট বিক্রি হত ১ হাজার ৬০০ টাকায়। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, এই দালালেরা মূলত বেকার যুবক। এঁদের নির্দেশ দেওয়া হত, ‘ছোট শহর, মদের দোকান বা গাঁ-গঞ্জের দোকানে’ গিয়ে এই কয়েনগুলি ছড়িয়ে দিতে। আধিকারিকদের দাবি, কয়েনগুলি যে নকল সে ব্যপারে কোনও ধারণা ছিল না এই দালালদের। সহরানপুরের এসএসপি অভিনন্দন বলেন, ‘‘এই ভাবে গোটা দেশে ৭০ কোটি টাকার ভুয়ো কয়েন ছড়িয়ে দিয়েছে এই চক্রটি।’’
অতীতে এই ধরনের ভুয়ো কয়েন বানানোর আরও দু’টি চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দিল্লি পুলিশ দিল্লি ও হরিয়ানার তিনটি কারখানায় হানা দিয়ে ১২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা মূল্যের ভুয়ো কয়েন বাজেয়াপ্ত করে। সেই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন উপকার। তাঁর ভাই স্বীকার লুথরার সঙ্গে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সে বারও অন্য কারবারের আড়ালে এই উৎপাদন চলছিল। দ্বিতীয় চক্রটিকে পাকড়াও করা হয় ২০১৯ সালের মে মাসে। উত্তরপ্রদেশের সুরজকুণ্ড রোডে ফরিদাবাদ পুলিশের অপরাধদমন শাখার হাতে ধরা পড়ে একটি দল। ৫০ হাজারটি পাঁচ টাকার ভুয়ো কয়েন উদ্ধার হয়েছিল সেই অভিযানে।