২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার লেখিকা অ্যান কার্সন। বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ বিজয়ী হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে স্টকহোলমের সুইডিশ অ্যাকাডেমি। তাদের তরফে জানানো হয়েছে, তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবক রচনাসম্ভার ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ আদানপ্রদান করে আধুনিক সাহিত্যের নব ধারা তৈরি করেছে। তার জন্যই অ্যানকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
যে সাহিত্যসম্ভারের কথা উঠে আসছে, তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ১৯৫৫-র ‘গ্লাস, আয়রনি, অ্যান্ড গড’-এর ‘দ্য গ্লাস এসে’, যা এক বিশালাকার কবিতা হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও আসলে সাহিত্যের জগতে এক নবধারার উদাহরণ বলা চলে। কাব্য ও গদ্যের কঠিন বিভাজনের রেখা এক অর্থে ঝাপসা করে দিয়েছে অ্যানের এই সৃষ্টি। সাহিত্যের জগতে যা কিছু প্রথাগত, সে সবের প্রতি কোনও ভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার জন্যই সবচেয়ে পরিচিত তিনি। তাঁর লেখায় তাই গুলিয়ে যায় গদ্য ও কাব্যের ভাগাভাগি, প্রবন্ধ রচনার ভঙ্গি, এমনকি, বই সাজানোর চিরাচরিত নিয়মকানুনও।
১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টো শহরে জন্ম অ্যানের। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম বই ‘ইরস দ্য বিটারসুইট’। সে সময় থেকেই প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থেকেছে তাঁর লেখালেখিতে। সেই থেকে কাব্য, গদ্য, অনুবাদ— সাহিত্যচর্চার নানা ধারায় বরাবরই থেকেছে অ্যানের অবাধ গতিবিধি।
বরাবর ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন অ্যান। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকাজের মধ্যে পড়ে কাব্যে লেখা উপন্যাস, ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’। প্রাচীন গ্রিসের পুরাকথার প্রভাব তাতেও ভরপুর। লাল ডানাধারী দানব গেরিয়নের যে লোককথা প্রচলিত, তা-ই নতুন ভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। বলেছিলেন এ কালের এক কিশোরের গল্পের মোড়কে।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্ভাবনী প্রকাশভঙ্গির জন্য খুব কম সময়েই অ্যানের দিকে বিশেষ ভাবে নজর পড়ে শিল্পচর্চায় যুক্ত বিশিষ্টজনেদের। ২০০১ সালে তাঁর বই ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজ়ব্যান্ড’-এর জন্য পান টি এস এলিয়ট পুরস্কার। অ্যানের আগে কোনও নারী এই পুরস্কার পাননি। তিনিই প্রথম।
সাহিত্য রচনার প্রথাগত ধারার যে ধারণা, তা বরাবরই ভেঙেছেন অ্যান। তাঁর ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’-এ একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে কাব্যে লেখা প্রবন্ধ, কবিতা, সমাধিলিপি, অন্য শিল্পী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা গদ্য। ২০০১ সালে গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ় পায় সেই বই। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর বেড়াভাঙা ভাবটাই বারবার প্রশংসিত হয়েছে সমসাময়িক শিল্পীমহলে।
২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘ডিক্রিয়েশন’-ও সে লেখিকার তৈরি নিজস্ব ধারাকেই আরও বলিষ্ট করে। একই বইয়ে তিনি ভরে দেন কবিতা, প্রবন্ধ ও একটি অপেরা। ২০১০ সালের ‘নক্স’ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে শুধু বইয়ের বিষয়বস্তু নয়, অভিনবত্ব আনে তার বহিরাঙ্গেও।
সাহিত্য রচনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন অ্যান। ১৯৮১ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট পাওয়ার পর থেকে পড়িয়েছেন আমেরিকার বহু শিক্ষাঙ্গনে। তার মধ্যে রয়েছে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়েও। প্রাচীন গ্রিসের সাহিত্য তাঁর চর্চার বিশেষ অঞ্চল। অধ্যাপনার সঙ্গে নিজস্ব সাহিত্য সৃষ্টি যেমন করেছেন, তেমনই নিয়মিত করেছেন অনুবাদের কাজ। তবে কথা লেখার প্রথা ভাঙাই ৭৬ বছর বয়সি অ্যানের কাজের বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়ে গিয়েছে।
অ্যানের লেখা ও অনুবাদ করা ২০টির বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে কানাডা, ব্রিটেন ও আমেরিকা থেকে। তার অধিকাংশের মধ্যে রয়েছে একটা মিল। তা হল, গল্প বলার ধারাকে কোনও না কোনও ভাবে ভাঙে সে সব সৃষ্টি। কখনও তা হয় বইয়ের আকারে, কখনও হয় গল্প লেখার ভঙ্গিতে।
পুরনোকে নতুনের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা, হাজার পুরনোর সম্ভারের মাঝে নতুনকে বিশেষ ভাষা দিয়ে তার পরিচয় গড়া সেই অ্যান এ বার নোবেলজয়ীদের দলে। আগামী ডিসেম্বর মাসে সুইডেনে আনুষ্ঠানিক ভাবে সে সম্মান গ্রহণ করবেন কানাডার এই সাহিত্যিক। তাঁর আগে ১৯০১ সাল থেকে মোট ১১৮ জন পেয়েছেন সাহিত্যের নোবেল। গত বছর এই সম্মান পেয়েছিলেন হাঙ্গেরীয় লেখক লাজ়লো ক্রাসনাহোরকাই।