E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অটোইমিউনে আক্রান্ত হতে পারে অগ্ন্যাশয়, লিভার

নিজের কোষকে নিজেই ক্ষতি করতে পারে অগ্ন্যাশয়। একই সমস্যা হতে পারে লিভারেও। এর লক্ষণ ক্যানসারের মতো।

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:২৯

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

অগ্ন্যাশয় বা লিভারে প্রদাহ মানেই সব সময়ে যে খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মদ্যপানের মতো সমস্যা রয়েছে, এমন নয়। বরং অনেক সময়েই তা অটোইমিউন ডিজ়িজ়ের কারণে হতে পারে। গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডা. কালিদাস বিশ্বাস বলছেন, “দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিস, হেপাটাইটিসের মতো সমস্যা বাড়ছে।” অটোইমিউন ডিজ়িজ়ে যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরের কোষ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করতে শুরু করে।

অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিস

সব সময়ে পিত্তথলির পাথর, অতিরিক্ত মদ্যপান কিংবা অন্য কোনও পরিচিত কারণে নয়, কখনও কখনও অগ্ন্যাশয় নিজেই নিজের সুস্থ কোষকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে। এ এক দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ, যা অনেক সময়ে উপসর্গ দেখে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের থেকে আলাদা করা কঠিন হয়। অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিস মূলত তিন ধরনের—

  • টাইপ ওয়ান: সাধারণত ইমিউনোগ্লোবিউলিন জি ফোর ডিজ়িজ়ের অংশ। এর ফলে অগ্ন্যাশয়ের পাশাপাশি পিত্তনালি, লিভার, লালাগ্রন্থি, কিডনি বা লিম্ফ নোডের মতো অন্য অঙ্গও আক্রান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখে প্রাথমিক ভাবে ক্যানসার বলে মনে হয়। “রক্তপরীক্ষা, বায়পসি থেকে অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিসের আন্দাজ পাওয়া যায়,” বলছেন ডা. কালিদাস। টাইপ ওয়ান অটোইমিউন প্যানক্রিয়াটাইটিস ষাটের কাছাকাছি বা তার বেশি বয়সি পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
  • টাইপ টু: বাতজনিত রোগের কারণে হয়। এ দেশে এই ধরনটাই বেশি।
  • টাইপ থ্রি: কিছু ক্যানসারের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এই সমস্যা হতে পারে।

উপসর্গ

এই রোগের নির্দিষ্ট কোনও উপসর্গ থাকে না। অগ্ন্যাশয়ের অন্যান্য সমস্যার মতোই জন্ডিস, পিঠে-পেটে ব্যথা, বমি, খিদে কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন হ্রাস ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। ডা. বিশ্বাস বলছেন, “উপসর্গ হিসেবে ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজ়িজ়ও দেখা যায়। পাশাপাশি পিত্তনালির গতিপথ শুকিয়ে যাওয়া, সেখানে পাথর ইত্যাদিও হতে পারে। তা ছাড়া, অনেক সময়ে এর ফলে টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিসও হয়।”

চিকিৎসা

ক্যানসারের সঙ্গে লক্ষণ, উপসর্গে মিল থাকায় এই রোগ নির্ণয় করা কঠিন। তবে রোগ নির্ণয়ের পরে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হওয়া সম্ভব হয়। সাধারণত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। তাতে উপসর্গ ও প্রদাহ কমতে শুরু করে। পাশাপাশি অন্যান্য উপসর্গেরও চিকিৎসা করা হয়। তবে টাইপ ওয়ান রোগীদের মধ্যে রোগ ফিরে আসার প্রবণতা থাকে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েডের বদলে অন্যান্য ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধও ব্যবহার করা হয়।

অটোইমিউন হেপাটাইটিস

এ ক্ষেত্রে শরীর লিভারের কোষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। তবে এই রোগ কেন হয়, তার কোনও নির্দিষ্ট কারণ এখনও পাওয়া যায়নি। বিশেষ কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকলে এর প্রবণতা বাড়তে পারে। সঙ্গে পরিবেশগত কিছু কারণও ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে দিতে পারে। কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ এবং নির্দিষ্ট ওষুধ সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কোনও একটিই অটোইমিউন হেপাটাইটিসের নিশ্চিত কারণ নয়। ডা. কালিদাস বিশ্বাস বলছেন, “এই রোগ যে কোনও বয়সের ছেলেমেয়েদের হতে পারে। তবে মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির অন্য অটোইমিউন রোগ থাকার সম্ভাবনাও বেশি।” অটোইমিউন হেপাটাইটিস দু’ধরনের হয়—

  • টাইপ ওয়ান: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক— দু’জনেরই হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরীরে অ্যান্টিনিউক্লিয়ার অ্যান্টিবডি ও স্মুদ মাসল অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।
  • টাইপ টু: তুলনায় কম হয়। বাচ্চাদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। শরীরে অ্যান্টি-লিভার কিডনি মাইক্রোসোমাল-১ অ্যান্টিবডি (অ্যান্টি-এলকেএম-১) তৈরি হয়।

এ ক্ষেত্রেও শরীরে রোগের উপসর্গ থাকে না। ডা. বিশ্বাসের কথায়, “নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজ়াইম বেড়ে যাওয়ার পরে রোগটি ধরা পড়তে পারে। সঙ্গে অন্যান্য অটো-অ্যান্টিবডি উপসর্গ পরীক্ষা করা হয়। লিভারের বায়পসি করারও প্রয়োজন হতে পারে।” তা ছাড়া, ক্লান্তি, দুর্বলতা, খিদে কমে যাওয়া, বমি ভাব, পেটে-গাঁটে ব্যথা, চোখ-ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, জন্ডিস, ত্বকে চুলকানি ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। সমস্যা গুরুতর হলে পেটে জল জমা, পা ফুলে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও হয়।

চিকিৎসা

শরীরের অতিরিক্ত সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে অসুখকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। লিভারের প্রদাহ কমাতে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখা জরুরি। প্রয়োজনে লিভার প্রতিস্থাপন করতে হতে পারে। এই রোগ দীর্ঘমেয়াদি। রোগ নিয়ন্ত্রণে এলেও ফের বাড়াবাড়ি হতে পারে।

উভয় রোগকেই নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘকাল সুস্থ থাকা সম্ভব। নিয়মিত চিকিৎসকের নজরদারিতে থাকা জরুরি।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
autoimmune disorders Health Care Tips Health care

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy