ঘন ঘন চোখ পিটপিট করছেন? কিংবা হঠাৎ চোখের পাতা কাঁপছে? এই ধরনের সমস্যা হলে সাধারণ ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান অনেকে। কেউ ভয় পান, চোখের ক্ষতি হবে না তো? অনেকে আবার ডান চোখ নাচা, বাঁ চোখ কাঁপা নিয়ে শুভ-অশুভ বিচার করে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এগুলি সাধারণত খুব একটা ভয়ের কারণ নয়। তবে, বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন এবং কোন ক্ষেত্রে ঘরোয়া প্রতিকার সম্ভব, জেনে রাখা ভাল।
ক্লান্তিই উৎস
চোখের পাতার পেশি অনবরত বা মাঝেমাঝেই কাঁপছে, তাকে থামানোই যাচ্ছে না— এই অবস্থাকে ‘আইলিড মায়োকিমিয়া’ বলে। কথ্য ভাষায়, চোখের পাতা নাচা। চক্ষুবিশেষজ্ঞ অসীম কুমার ঘোষ বলছেন, “এতে খুব একটা ভয়ের কিছু নেই। দু’-এক সপ্তাহে এই সমস্যা মিটে যায়। এটিকে পেশির ক্লান্তি জানানোর একটি প্রক্রিয়া হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। খুব বেশি চাপে থাকলে, সারা দিন ধরে চোখের কাজ করলে বা শারীরিক পরিশ্রম করলে এমন হয়। সারা দিন রাস্তায় ঘোরা, কিংবা সারা দিন-রাত ধরে পড়াশোনা, কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজের ক্ষেত্রে এই পেশিগুলির অতিব্যবহার হয়ে যেতে পারে। তখন মাংসপেশির কাঁপন বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়। ক্লান্তি ছাড়াও ঘুম কম হলে, বেশি চা-কফি বা ধূমপান করলে এমন হয়। আবার অনেক সময়, বাড়ি ফেরার পরে প্রসাধনী ঠিক ভাবে না ধুয়ে রাখলে এমন হয়। প্রসাধনীতে বিশেষ কিছু উপাদান এর মূলে। আলোর কারণেও এই সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
জীবনশৈলী পরিবর্তনের মাধ্যমে এই অনিয়মগুলি যদি রুখতে পারেন, তবে এই ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্ত হবেন। ডা. ঘোষ বললেন, “এতে দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হয় না। তবে মাথাব্যথা হতে পারে। প্রতিকার সম্ভব বাড়িতেই। এ ক্ষেত্রে কাজের ফাঁকে নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া, অন্ধকার ঘরে শুয়ে হালকা গরম জলে ডোবানো তুলো নিংড়ে সেটিকে চোখের পাতার উপরে খানিক ক্ষণ রাখলে সমস্যা চলে যাবে। চা-কফির নেশায়, ধূমপানে লাগাম দিতে হবে। তা ছাড়া, ৭-৮ ঘণ্টা টানা ঘুমানো প্রয়োজন। এখন মোবাইলের আসক্তিতে, কাজের চাপে পাঁচ-ছ’ঘণ্টা ঘুমিয়ে দিন কাটাচ্ছেন অনেকেই। এই অনিয়ম এড়িয়ে চলুন।” দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি কমানোর নানা পদ্ধতি আছে, সেগুলো অভ্যাস রাখুন। সমস্যা কমবে।
তা ছাড়া, ড্রাই আইজ়-এর সমস্যা হলে চোখ পিটপিটের প্রবণতা দেখা দেয়। বেশিক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকানোর ফলে, কনট্যাক্ট লেন্স পরার জন্য এই সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসক শির্মার টেস্ট-এর মাধ্যমে চোখের জলের পরিমাণ মাপতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দু’ঘণ্টা অন্তর আর্টিফিশিয়াল টিয়ার ড্রপ ব্যবহারে সুফল পাবেন। বেশিক্ষণ জোরালো আলোর দিকে তাকাতে হলে অ্যান্টি-গ্লেয়ার গ্লাস ব্যবহার করুন। এগুলি ডিজিটাল যুগে রেডিয়েশনের সমস্যা, বাইরে গেলে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়।
কখন চিকিৎসা জরুরি
অনেক সময় চোখের পাতা বা আশপাশের পেশি খুব জোরে কাঁপতে পারে, কিংবা হয়তো চোখের পাতা এক দিক পুরো বুজে গিয়েছে, কিছুতে খোলাই যাচ্ছে না। এগুলি স্নায়বিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। এ রকম ক্ষেত্রে চোখ দিয়ে জল পড়ে, লাল হয়ে যেতে পারে। এই লক্ষণ দেখলে প্রথমে চক্ষুবিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। ডা. ঘোষ বললেন, সে ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি দিয়ে চোখের সামনের অংশ পরীক্ষা করা হয়। বাইরের ধুলোবালি লেগে আছে কিনা দেখে তা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। তিনি বললেন, “এমনও দেখেছি, ধান ঝাড়তে গিয়ে ধানের বীজ চোখে চলে গিয়েছে ও অনেক দিন ধরে তা ঢুকে রয়েছে। চোখে স্প্যাজ়ম হচ্ছে, ফুলে ঝুলে যাচ্ছে। পরীক্ষা করে দেখি, সেখানে অঙ্কুর বেরিয়ে গিয়েছে! ফলে চোখের পর্দায় লাল হয়ে উঠেছে, পুঁজ বেরোচ্ছে। এর ফলে যদি কর্নিয়ায় ঘা হয়ে যায়, তবে সেটি সারানো মুশকিল।”
এ ভাবে চোখ যদি নিজে থেকে বুজে আসে, তবে চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানোর কথা বলতে পারেন। নিউরোলজিস্ট ও স্ট্রোক স্পেশ্যালিস্ট জয়ন্ত রায় এ বিষয়ে বললেন, “পুরোপুরি স্প্যাজ়ম শুরুর আগে চোখের পাতা ঘন ঘন পিটপিট করতে দেখা যায়। তার পর দেখা গেল দশ সেকেন্ড ধরে দু’চোখের পাতা বুজে শক্ত হয়ে রয়েছে, চাইলেও খুলতে পারছে না। একে বলা হয় ব্লেফ্যারোস্প্যাজ়ম। ব্লেফ্যারো অর্থাৎ, চোখের পাতা। পেশির অস্বাভাবিক সঙ্কোচন বা ডিস্টোনিয়া এর কারণ। চোখের পেশিতে বোটক্স ইঞ্জেক্ট করে ভাল ফল মেলে। এ ছাড়া আইলিড মায়োক্লোনিয়ার ক্ষেত্রেও চোখ পিটপিট দিয়ে শুরু হয়ে খিঁচুনি পর্যন্ত হয়। এর সঙ্গে এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগের যোগ আছে।” তবে সাধারণ চোখের পাতা নাচা বা ফড়ফড় করা যে ক্ষতিকর নয়, তা নিয়ে দুই চিকিৎসকই আশ্বাস দিলেন।