পুজো আসছে। অষ্টমী বা নবমীর সাজের জন্য একটি ভাল আর দামি শাড়ি কিনবেন নিশ্চয়ই। ভাল একটি কাঞ্জিভরম বা বোমকাই, তসর, গরদ কিংবা জামদানি। প্রতিবছরই এমন কেনেন। আলমারিতে হয়তো ভাল শাড়ির স্তূপ জমেছে। অথচ কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে মনে হবেই— ‘একটাও পরার মতো শাড়ি নেই’! কারণ, যত্নের অভাবে দামি শাড়িও মলিন হয়ে গিয়েছে।
আবার হয়তো কেউ মা বা ঠাকুমা, দিদিমার একটি চান্দেরি কিংবা বেনারসি শাড়ি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানে পরবেন বলে। কিন্তু যখন পরতে গেলেন দেখা গেল, তখন তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কেটে গিয়েছে ভাঁজে ভাঁজে। ছোটবেলা থেকে যে শাড়িটি পরার স্বপ্ন দেখেছেন, বহু বার বড় হয়ে তা পরার সুযোগই পাওয়া গেল না।।
মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, শাড়ি নারীর কাছে সম্পদের থেকে কিছু কম নয়। আর সেই সম্পদ তারা আগলে রাখতেও ভালবাসে। কিন্তু এ তো ধাতু দিতে গড়া গয়না নয় যে, বছরের পর বছর বাক্সবন্দি করে রেখে দিলেও অবিকল থাকবে। শাড়ি তৈরি হয় পলকা সুতোয়। সে সুতো যত মজবুতই হোক না কেন, যত্ন না করলে দ্রুত ক্ষয় অনিবার্য। তবে চাইলে শা়ড়িকে ভাল রাখাও যায়। তার জন্য একটু বাড়তি যত্নের দরকার। জেনে নিন, কোন শাড়িকে কী ভাবে যত্ন করলে দীর্ঘ দিন ভাল থাকবে।
কোন শাড়ির যত্ন কী ভাবে?
কাঞ্জিভরম ও বেনারসি সিল্ক: ড্রাই ক্লিন করান এবং জরির দ্যুতি ফিরিয়ে আনতে রোল পলিশ করিয়ে নিন। প্লাস্টিকের কভার বা হ্যাঙ্গার ব্যবহার করবেন না। পরিষ্কার, নরম সাদা সুতির কাপড়ে মুড়ে সমতল জায়গায় রাখুন। প্রতি ২-৩ মাস পর পর শাড়ি আলমারি থেকে বার করে উল্টে-পাল্টে নতুন করে ভাঁজ করুন। জরির অংশ ভিতরের দিকে থাকবে। সরাসরি পারফিউম স্প্রে করবেন না। বছরে দু'বার ১৫-২০ মিনিট হালকা রোদে দিন ।
ঢাকাই জামদানি: জামদানি শাড়ির বুনন সূক্ষ্ম হয়। ড্রাই ক্লিন করানোই নিরাপদ। পাটে পাটে ভাঁজ না করে নরম সুতির কাপড়ে গোল করে পাকিয়ে রাখুন। মাঝে মাঝে খুলে ভাঁজ বদলানো দরকার। নয়তো ভাঁজের মুখে সুতো কেটে যেতে পারে। এই শাড়িতেও সরাসরি সুগন্ধি স্প্রে করা উচিত নয়।
তসর সিল্ক: তসর সিল্কের নিজস্ব স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য আর কাগজের মতো খসখসে ভাব থাকে। যা রক্ষণাবেক্ষণের ভুলে নষ্ট হতে পারে। বাড়িতে না ধোয়াই ভাল। পরার পরে হাওয়ায় শুকিয়ে তার পরে তুলে রাখুন। রোদে দেবেন না। রোদ তসরের রং ফ্যাকাশে করে দেয়। ইস্ত্রি করার সময় কাপড়ের উপর একটি পাতলা সুতির কাপড় রেখে ইস্ত্রি করুন। আর আলমারিতে রাখার সময় সুতির ব্যাগে রাখুন, যেন কাপড়টিতে আর্দ্র ভাব না লাগে।
মটকা সিল্ক: মটকা সিল্কের সুতো কিছুটা মোটা। এই শাড়ি ইস্ত্রি করার সময় স্টিম আয়রন ব্যবহার করা উচিত। ড্রাই ক্লিন করানোই ভাল। শাড়িতে কাদা বা দাগ লাগলে তা জোরে না ঘষে সঙ্গে সঙ্গে কোনও শুকনো তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে চেপে জল শুষে নিন। না নিঙড়ানোই ভাল।
চান্দেরি: চান্দেরি অত্যন্ত হালকা ও স্বচ্ছ কাপড়। সহজেই কুঁকড়ে যায়। সুতোও উঠে যেতে পারে। বাড়িতে ধুতে গেলে জোরে নিঙড়ানো বা ঘষাঘষি করা উচিত না। ইস্ত্রি করার সময় সবসময় শাড়ির উল্টো পিঠে খুব সামান্য তাপ ব্যবহার করে ইস্ত্রি করতে হবে। হ্যাঙ্গারে রাখলে চান্দেরির সুতো ঝুলে গিয়ে শাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাখার জায়গায় স্যাঁতসেঁতে ভাব যাতে না থাকে।
জর্জেট বা শিফন শাড়ি: ভাল মানের জর্জেট বা শিফন খুব হালকা ও নরম হয়। ঝুলিয়ে রাখলে আকার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সমান জায়গায় ভাঁজ করে রাখুন। কাচলে যেন শাড়ির পাড়ে বেশি জল না জমে। মৃদু তরল সাবান ব্যবহার করুন। ইস্ত্রি করার সময় তাপমাত্রা খুব কম রাখুন।
কোটা শাড়ি: কোটা শাড়ির জালের মতো বুনন অত্যন্ত নরম এবং সূক্ষ্ম। প্রথমে দু’-এক বার ড্রাই ক্লিন করুন। পরে ধুতে হলে ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন। জোরে ঘষে কাচা বা নিঙড়ানো চলবে না। কড়া রোদে না শুকিয়ে ছায়ায় শুকোলে এর রং আর টেক্সচার বজায় থাকে। আলমারিতে রাখার সময় সুতির কভারে চওড়া ভাঁজ করে রাখুন, যাতে বুনন কেটে না যায়।
তাঁতের শাড়ি: তাঁতের শাড়ি প্রথম বার ধোয়ার আগে নুন-জলে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে রং পাকা থাকে এবং স্থায়িত্ব বাড়ে। সবসময় ঠান্ডা জল ও কম ক্ষার রয়েছে, এমন হালকা সাবান ব্যবহার করে ধোবেন এবং কড়া রোদ এড়িয়ে ছায়ায় শুকোতে দিলেই ভাল। তাঁতের শাড়িতে ধোওয়ার পরে অল্প স্টার্চ বা মাড় দিতে পারেন।
অরগ্যাঞ্জা : অরগ্যাঞ্জা শাড়ির কাপড় বেশ পলকা এবং নরম। ওয়াশিং মেশিনে দেবেন না। খুব বেশি শক্তি প্রয়োগ করে না কাচাই ভাল। তাতে কাপড় ফেটে যেতে পারে। ইস্ত্রি করার সময় তাপমাত্রা সবচেয়ে কমে রাখুন এবং অবশ্যই অরগ্যাঞ্জার উপর একটি সুতির কাপড় পেতে নিয়ে তবেই ইস্ত্রি করুন। হ্যাঙ্গারে ঝোলালে এর ফোলা ভাব নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের কিছু জরুরি টিপস
১। আলমারিতে পোকামাকড়ের হাত থেকে শাড়িকে বাঁচাতে নিমপাতা বা শুকনো লবঙ্গ ছড়িয়ে রাখুন।
২। অন্তত মাসে এক বার আলমারির শাড়িগুলির ভাঁজ বদলে দিন। শুনতে একটু ঝক্কির মনে হলেও এটি করলে শাড়ি ছিঁড়ে যাওয়া বা ফেঁসে যাওয়ার মতো সমস্যা এড়ানো যায়।
৩। শাড়ি রাখার জায়গায় কয়েকটি সিলিকা জেলের স্যাশে বা প্যাকেট রেখে দিন। এটি ভিতরের অতিরিক্ত আর্দ্রতা শুষে নেবে এবং পোকামাকড় দূরে রাখবে।
৪। প্লাস্টিকের এয়ার-টাইট কভারে শাড়ি রাখবেন না, এতে আর্দ্রতা আটকে গিয়ে কাপড়ের ক্ষতি হয়। এর বদলে ভাল মানের সুতির ব্যাগ বা শাড়ি কভার ব্যবহার করুন।