E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিজয়ার সুর বিরহের সুর

বিজয়া মানে শৈশব-যৌবনের অগণিত স্মৃতি। যে স্মৃতি আমরা নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করি, চোখ বন্ধ করে বারবার ফিরে যাওয়া যায় সেখানে।

অনুপম রায়

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩৬
ছবি: দেবর্ষি সরকার।

ছবি: দেবর্ষি সরকার।

মহালয়া থেকে বুকের মধ্যে যে আনন্দস্রোত বইতে শুরু করে তা বাঙালি ছাড়া কে-ই বা বুঝবে? পুজো আসছে! পুজো আসছে! এই বলতে বলতেই হঠাৎ দেখি পুজো শেষ। প্রতিমা চললেন বিসর্জন। মণ্ডপ খুলে ফেলা হচ্ছে। ফাঁকা মণ্ডপের বিকেলগুলোয় যে কী অদ্ভুত বিষণ্ণতা লেগে থাকে কী করে বোঝাই! ঘণ্টায় দুটো করে গান লিখে ফেলা যায় সেই শূন্যতায়। যে যার কাজে গিয়েছে ফিরে, সব উত্তেজনা শেষ, পৃথিবীর বুকে শুধু ছড়িয়ে রয়েছে এঁটো শালপাতা আর হেরে যাওয়া প্রেমিকের মতো দাঁড়িয়ে সেই ফাঁকা প্যান্ডেল। বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। এ বারও তাকে পাওয়া হল না। দুর্গা চলে গেল কৈলাসে আর মর্তে আমরা অপেক্ষার দিন গুনি। আসছে বছর নাকি আবার হবে। আবার সেই অপেক্ষা, আবার সেই দু’দিনের আলো তার পর রিয়ালিটি চেক।

বিজয়া খুব আশ্চর্য একটা সময়। শাক্তরা মহিষাসুর বধ করে বিজয় উৎসব পালন করছে ও দিকে বৈষ্ণবরা রাবণ বধ করে রামের বিজয় উৎসব করছে। মোট কথা একটা ব্যাপক যুদ্ধের পর সত্যের জয় হয়েছে। এতে সবার হইহই করে আনন্দ করা উচিত, এ দিকে বাঙালিদের শুরু হয় প্রবল মন খারাপ। কারণ আবার তো স্কুল খুলে যাবে, আবার অফিস। প্রবাসী যারা ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিল, তাদেরও ফিরে যেতে হবে কাজের জায়গায়। আমরা যারা ভেবেছিলাম, এই পুজোতে তাকে কাছে পাব কিন্তু সে যে অধরাই রয়ে যায় প্রতিবারের মতো। আরও একটা পুজো ফুরিয়ে যায় তবু কোনও দিন একটা মনের মতো প্রেম জোটে না। কিন্তু এই যে দশমীর পরে মন কেমন, এ কি শুধু প্রেমের জন্য? আমি তো গোটা বাংলার আকাশ-বাতাসে সেই মনখারাপের সুরটা পাই। কখনও কখনও গিটারে বেঁধে রাখি, খাতায় লিখে রাখি, চুপিচুপি দেওয়ালের কানে গেয়ে রাখি তাকে। আচমকা চারিদিক কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে। হাওয়ার স্পর্শে আমি পাই তার আহত নিঃশ্বাস। বড় ব্যথা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে শহর থেকে শহরতলি। আবার এক বছরের অপেক্ষা।

যাই হোক, শুভ বিজয়া বন্ধুরা। প্রণাম, কোলাকুলি ইত্যাদি সেরে ফেলে চট করে মুখে পুরে দিই গরম রসগোল্লাটা। কারণ ওটাই তো আসল। চরম হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে বাঙালির পেটপুজো। পুজোর চার দিন হাবিজাবি খেয়ে সাধ মেটেনি যাদের, তারাই এক বুক মন খারাপ নিয়ে হাঁ করে ছুটে যাই বিজয়ার দিকে! যাকে-তাকে প্রণাম করে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকি নিষ্পাপ শিশুর মতো, নাড়ুটা? নিমকিটা? চন্দ্রপুলিটা? আমাদের কে বাঁচাবে? এ রকম পেটুক বাঙালির কাছে সব উৎসবই শেষমেশ ফুড ফেস্টিভ্যাল হয়ে যায়। আমাদের যাবতীয় শোক, মন খারাপ ভুলিয়ে রাখে বিজয়ার খাবার।

শৈশবের স্মৃতি আমরা কিছুটা নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করি যাতে চোখ বন্ধ করে বারবার ফিরে যাওয়া যায় সেখানে। বিজয়ার সময়ে আমার বহরমপুরের মামার বাড়ির সন্ধেগুলো মনে পড়ে। সেই প্রথম বাড়ির বড়দের প্রণাম করতে শেখা। কিন্তু খেলতে আমরা এত ব্যস্ত যে সে কাজে তেমন মন নেই। মনে আছে কোনও এক মেসোমশাইয়ের দু’পায়ের পিছন দিয়ে হাত গলিয়ে প্রণাম করায় কানমলা খেয়েছিলাম।

আর একবার শুয়ে থাকা অবস্থায় এক দাদুকে প্রণাম করাতেও বকুনি খেয়েছিলাম। বিজয়ার প্রণামের এত নিয়ম বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তার পর স্কুলে কিছু বন্ধু শেখাল, পুরো মাটি অবধি ঝুঁকে চরণস্পর্শ করার প্রয়োজন নেই, সিনিয়রের হাঁটুতে হাত দিয়েও নাকি এখন সেরে ফেলা যাচ্ছে ব্যাপারটা। আর ছিল নারকেল নাড়ু, এলোঝেলো, কুচো নিমকি, খই-মুড়কি আর নানা রকমের মিষ্টি! দাদু-দিদার আশকারা, “আহা! রোজ তো আর খাচ্ছে না, একদিন না হয় একটু...”

তার পর মনে পড়ে পাড়ার বিজয়া। আমাদের ঠাকুরপুকুরের পাড়ায় প্রচুর খ্রিস্টান পরিবার থাকত। তারা ক্রিসমাসের সময়ে কেক-পিঠে, আরও দারুণ দারুণ সব খাবার পাঠাত আর আমরা বিজয়ার সময়ে। তা এই প্লেট সাজানোর সময়ে সব তো আর মাপে মাপে হয় না, কিছু জিনিস অতিরিক্ত হত, যা আমার জন্যই তোলা থাকত। মনে আছে সন্ধেবেলা গুটি গুটি পায়ে মায়ের সঙ্গে প্রতিবেশীদের বাড়ি যাওয়া, হাতে ঢাকা দেওয়া খাবারের থালা। কখনও পথে যেতে যেতেই মায়ের চোখের আড়ালে একটা দুটো নাড়ু তুলে মুখে পুরে দিতাম। তার পর সেই বয়সও একদিন অতিক্রম করলাম। দেখলাম পাড়ায় বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠান। হঠাৎ আবৃত্তি প্র্যাকটিস, সঙ্গীত চর্চা, নাটকের মহড়া, চারিদিকে ট্যালেন্টের বন্যা! পুজোর প্যান্ডেলের পাশেই একটা স্টেজ বাঁধা এবং সেই স্টেজটিকে ঘিরে গোটা পাড়ার উত্তেজনা। বিজয়া সম্মিলনীর সন্ধেবেলা সবাই সেখানে উপস্থিত। কমিউনিটি বিল্ডিং বলা যেতে পারে। বিজয়া উপলক্ষে নাচ-গান-আবৃত্তি-নাটক, বাঙালির কালচার করে ফাটিয়ে দেওয়া বুঝতে শিখলাম।

ওই পাড়াতেই একবার এক দাদু ধরেছিল আমাকে। শুধু আমাকে নয়, আমাদের বেশ কয়েকজন ছেলে ছোকরাকে। বিজয়ায় স্টেজে উঠে গাইতে হবে। তিনিই মূল গাইবেন হারমোনিয়াম নিয়ে আর আমরা পিছনে লাইন দিয়ে কোরাস গাইব। ব্যাপারটা সুবিধের লাগেনি। প্রথম কারণ, একটা গান গাওয়ার জন্য দশ-বারো দিন রিহার্সাল। আর প্রতিটি রিহার্সাল বিকেলবেলা, খেলার সময়। খেলা বাদ দিয়ে গান? অসম্ভব। দ্বিতীয় কারণ ছিল, বিজয়ার দিন কলিং বেল বাজানোর প্রতিযোগিতা। বিজয়ার সময় গোটা পাড়া ওই মঞ্চের সামনে বসে কালচার কালচার খেলছে আর বাড়িগুলো রয়েছে প্রায় ফাঁকা। একজন-দু’জন হয়তো রয়ে গিয়েছে। অন্য দিকে আমাদের ছোটদের দল কিছুতেই বিজয়া সম্মিলনীতে বসে ও সব দেখবে না, শুনবেও না। তাই একদল উচ্চিংড়ে গোটা পাড়া ছুটে বেড়াব আর লোকের বাড়ি কলিং বেল বাজিয়ে বেড়াব। কেউ একজন দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখবে কেউ কোথাও নেই। সেটা আমরা লুকিয়ে দেখব। আমাদের এতেই মজা। পাড়াতুতো দাদু চোঙায় গাইতে থাকুক— “নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়”।

এর পর আর একটু বড় হয়ে যেতেই কী বিজয়া, কী কালীপুজো, কী ক্রিসমাস, খালি অঙ্ক আর অঙ্ক! বাকিটা পুরো ঝাপসা। শুধু মনে আছে টিউশন স্যরের বাড়ির বিজয়ার ঘুগনি। এর পর কলেজ পেরিয়ে সোজা পরবাস। বেঙ্গালুরু। সেখানে গিয়ে হঠাৎ আমার বাঙালিপনা জেগে উঠল। পয়লা বৈশাখ, বিজয়া, পিঠে উৎসব যেখানে ডাক পাই, ছুটে যাই। কী করে আর একটু বাঙালি হয়ে ওঠা যায়! তখন তেড়ে গান লিখি, গাই, স্টেজ খুঁজি কিন্তু পাই না। বিজয়া উপলক্ষে ঘরোয়া আড্ডাতেই গিটার বাজিয়ে একের পর এক গান গেয়ে গিয়েছি। গান শেষ হলে খাওয়াদাওয়া। বেঙ্গালুরুর দাদা-দিদিরা অসাধারণ সব খাবারের আয়োজন করত। সে স্বাদ এখনও জিভে লেগে।

তার পর একদিন বিখ্যাত হয়ে যাই। ২০১০-এর বিজয়ায় কলকাতায় প্রথম মঞ্চ পেলাম। নিউ আলিপুর। ভেবে দেখলাম, বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে বোধহয় সেই প্রথম আমি স্টেজে উঠলাম। ভুল বলছি, এর আগে কলেজে পড়ার সময় বাবার মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশনের বিজয়া সম্মিলনীতে একবার গিটার বাজিয়ে গেয়েছিলাম একটি ইংরেজি গান। বেরোনোর আগে সন্ধেবেলা বাড়িতে তুমুল ঝগড়া। মা এবং বাবা দু’জনেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, বিজয়ায় ইংরেজি গাইছি সে না হয় তা-ও মেনে নেওয়া গেল কিন্তু গানটি যেন একটু উজ্জ্বল হয়। তখন আমি ভীষণ এঁড়ে। উজ্জ্বল কিছু আমার ভাল লাগত না। সমাজের সব কিছু খারাপ লাগত। সব কিছু ভেঙে ফেলতে চাইতাম। ভিতরে ভিতরে ছিলাম ‘আ রেবেল উইদাউট আ কজ়’। মনে মনে চাইছি বিপ্লব করতে কিন্তু কেন এবং কী ভাবে করব ঠিক জানি না। তার পর মা বলল, আচ্ছা, “ইংরেজি গা, দুঃখের গানই গা, কিন্তু একটু পরিচিত গান গা।” কিন্তু আমার জেদ, একটা অখ্যাত স্কটিশ ব্যান্ডের একটা অজ্ঞাত গানই আমি শোনাব। শেষমেশ বাড়িতে হাল ছেড়ে দিল। আমি গিয়ে গিটার বাজিয়ে ঝাপসা একটা গান শোনালাম। একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে কী যে গেয়ে চলে গেল, বাঙালি ডাক্তারেরা এবং তাদের পরিবারের সকলে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। হাততালি দেওয়া ভদ্রতা, তাই হয়তো দিয়েছিল। কাট টু ২০১০, আনুমানিক দশ বছর বাদে। সমস্যা তখনও সেই গান সিলেকশন নিয়েই। আমার দুটো গানমাত্র মানুষ জানে, বাকি দেড় ঘণ্টা কী গাইব? ওই খাতা ভর্তি নিজের লেখা গান যেগুলো হয়তো একদিন আলো দেখবে, সেগুলোই শোনালাম। কী ভাগ্যিস! তখন ইংরেজি গানের ভূতটা ঘাড় থেকে নেমেছে। নিশ্চয়ই ভালই লাগল মানুষের। কারণ তার পরের মাসেই আবার অন্য পাড়ায় ডাক পেলাম। তবে বাঙালিকে অনেক ধন্যবাদ যে প্রথম দিকে বেশ কিছু বছর আমি মঞ্চে আমার প্রচুর অপ্রকাশিত গান গেয়ে বেরিয়েছি এবং সবাই সেটা প্রশ্রয় দিয়েছে। আমি হিট-ফ্লপ কিছু বুঝতামও না, গোঁয়ার গোবিন্দর মতো যা ভাল লাগত গেয়েছি।

তার পর কত বিজয়া সম্মিলনীতে যে গান শুনিয়ে বেড়াই তার ঠিক নেই। ভালই লাগে। প্রতিদিন নিজেকে বোঝার চেষ্টা করি। মনে হয় বিজয়ায় আছি, প্রণাম-কোলাকুলিতে আছি, গানে-কবিতায় আছি, আড্ডায় আছি, মিষ্টিতে-নিমকিতে আছি। কিন্তু ভাসানে নেই, ম্যাটাডোরে নেই, সিঁদুরখেলায় নেই। বিজয়া মানে হেমন্তের শুরু, বেলা ছোট হয়ে আসা। বিজয়ার সুর একটা বিরহের সুর। সেই সুর এখনও বুকের ভেতরে হালকা মন খারাপ ছড়িয়ে দিয়ে যায়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy