Advertisement
E-Paper

ব্রিটিশদের তাড়ায় ভিটেমাটি হারান, ‘হালবা’ তাঁতিদের রাঁধা খাসির কষা মাংস এখন গোটা দেশেই জনপ্রিয়

গাঢ় লাল রঙের রগরগে ঝোল যা প্রচণ্ড ঝাল, মুখে দিলেই নরম তুলতুলের মাংসের সঙ্গে মশলার তীব্র ঝাঁঝ ও মাংসের উপর ভেসে থাকা তেলের পুরু আস্তরণ— এই হল সাওজি মটনের চেনা রূপ। শাহি রান্না নয়, তাঁতিদের হেঁশেলে তৈরি কষা খাসির মাংস গোটা দেশেই জনপ্রিয়।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৪ অগস্ট ২০২৬ ১০:৪৭
Born from Hardship, how a Migrant Weaver Community Created Nagpur’s Iconic Saoji Mutton

রেঁধেছিলেন তাঁতিরা, এখন দেশের সেরা কষা মাংসের একটি ‘সাওজি মটন’। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা নয়। শাহি খাবারও নয়। এ খাবারে মিশে রয়েছে শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি ও পরিশ্রমের পরশ। দেশের রন্ধনশিল্পের ইতিহাসে এমন কিছু খাবারের নাম রয়েছে যা কেবল রসনাতৃপ্তি করে না, বরং এর সঙ্গে পরতে পরতে মিশে থাকে কোনও হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তেমনই একটি খাবার হল ‘সাওজি মটন’। খাসির কষা মাংস। তবে বিশেষত্ব আছে। গাঢ় লাল রঙের রগরগে ঝোল যা প্রচণ্ড ঝাল, মুখে দিলেই নরম তুলতুলের মাংসের সঙ্গে মশলার তীব্র ঝাঁঝ ও মাংসের উপর ভেসে থাকা তেলের পুরু আস্তরণ— এই হল সাওজি মটনের চেনা রূপ। দেখলে মনে হবে, কোনও শাহি দরবারের বাবুর্চির হাতে তৈরি রাজকীয় কোনও পদ। আসলে রান্নাটি ‘হালবা কোষ্টি’ নামে এক তন্তুবায় সম্প্রদায়ের। কী ভাবে তাঁদের রাঁধা মাংস গোটা দেশে জনপ্রিয় হল, সে ইতিহাসও বিচিত্র।

‘হালবা কোষ্টি’ মূলত মধ্যভারতের এক আদিবাসী সম্প্রদায়। এদের শিকড় একসময়ে ছড়িয়ে ছিল ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশের বক্সার, মালব মালভূমি ও ওড়িশার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। ‘হালবা’ বা ‘হলবা’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত ‘হাল’ থেকে এই নামটি এসেছে। আবার কেউ মনে করেন এরা গোড়া থেকেই ছিল তাঁতি। মরাঠি ভাষায় ‘কোষ্টি’ শব্দের অর্থ হল তাঁতি বা বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যাঁরা জড়িত। ১৭ ও ১৮ শতকে, এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তাঁতশিল্প ও সুতো কাটার পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। এঁরা ছিলেন উচ্চমানের সুতি ও সিল্কের কাপড় বুননে অত্যন্ত দক্ষ।

হালবাদের তাঁতশিল্পের পসার ছিল একসময়ে। তাতে ভাটা পড়ে ব্রিটিশ আমলে এসে। ইংরেজদের যন্ত্রচালিত সস্তা কাপড়ের তুলনায় হাতের বুননে তৈরি তাঁদের কাপড় প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। ফলে হাজার হাজার হালবা কোষ্টির মানুষজন বেকার হয়ে ভিটেমাটি বেচে জীবিকার খোঁজে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে্ন। এঁদের একটা অংশ মধ্যপ্রদেশ ছেড়ে নাগপুরে এসে বসতি স্থাপন করে। নাগপুরে সে সময়ে ধীরে ধীরে বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটছিল। এই হালবা তাঁতিরা কারখানার শ্রমিক হিসেবে নতুন করে জীবিকা শুরু করেন। দিনভর কঠিন কায়িক পরিশ্রম, কারখানার ধোঁয়া আর দারিদ্রের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াইতে শক্তি জোগাতে প্রয়োজন ছিল পুষ্টিকর ও মশলাদার খাবারের। সে সময়েই হালবাদের হেঁশেলে তৈরি হয় সাওজি মটন।

লাল ঝোল, ভেসে ওঠা তেলের পরতই সাওজি মটনের বৈশিষ্ট্য।

লাল ঝোল, ভেসে ওঠা তেলের পরতই সাওজি মটনের বৈশিষ্ট্য।

শুরুতে এটি ছিল তাঁদের ঘরের খাবার। কিন্তু ঘোরতর আর্থিক অনটনের দিনে হালবা কোষ্টির মহিলারা এই খাবারই নাগপুরের রাস্তার মোড়ে, ছোট ছোট খুপরি ঘরে বিক্রি করতে শুরু করেন। একজন শ্রমিক যাতে কম খরচে পেটভরে প্রচুর ভাত বা রুটি খেতে পারেন, সে জন্যেই ঝোল ঝোল খাসির মাংস রাঁধা হত। তাতে মাংসের টুকরো একটি হলেও প্রচুর পরিমাণে মশলা দেওয়া ঝোল থাকত, যা ভাত বা রুটি দিয়ে সাপটে খাওয়া যেত। সাওজি মটনের বিশেষত্বই হল এর মশলাদার রগরগে ঝোল। এই মাংস রাঁধতে হালবা মহিলারা বিশেষ এক রকম গুঁড়ো মশলা ব্যবহার করতেন, যার নাম ‘সাওজি মশলা’। এটি প্রায় ২৪ থেকে ৩২টি মশলা পিষে তৈরি হয়েছিল। তাতে পোস্ত, তিল, জায়ফল, জয়িত্রী, নারকেলকোরা, শাহি জিরে, গোটা গরমমশলা-সহ আরও নানা ধরনের মশলা থাকত। এখনও সাওজি মটন রাঁধতে এই বিশেষ মশলাই দেওয়া হয়। পেতলের হাঁড়ি বা কড়ায় ঢাকা দিয়ে ঢিমে আঁচে মাংস রান্না হয়। ঝাল এই মাংস দেখলে অম্বলের রোগীদের ভয় করতে পারে ঠিকই, তবে এতে কোনও রকম কৃত্রিম রং মেশানো হয় না। সম্পূর্ণ ভাবে দেশিয় মশলা দিয়েই রাঁধা হয় মাংসের পদটি।

সাধারণ রান্না নয়, হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

সাধারণ রান্না নয়, হারিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

সাওজি মটন তৈরির রেসিপি

উপকরণ:

১ কেজি (হাড় ও চর্বিসহ) খাসির মাংস

৪টি বড় পেঁয়াজ

৩ চামচ আদা-রসুন বাটা

সাওজি বিশেষ মশলা

২-৩ চামচ শুকনো লাল লঙ্কার গুঁড়ো

১ চামচ হলুদগুঁড়ো

আধকাপ সর্ষের তেল

স্বাদমতো নুন

পরিমাণমতো জল

ধনেপাতাকুচি

প্রস্তুত প্রণালী:

প্রথমে ধুয়ে রাখা মাংসের টুকরোগুলোতে হলুদ, সামান্য নুন এবং আদা-রসুন বাটা ভাল করে মেখে ৩০-৪০ মিনিট রেখে দিতে হবে। পেতলের কড়া হলে ভাল হয়, না হলে যে কড়ায় রাঁধেন, সেটিতেই করতে পারেন। সর্ষের তেল গরম করে তাতে পেঁয়াজকুচি সোনালি হওয়া অবধি ভেজে নিতে হবে। পেঁয়াজ ভাজা হলে বাকি আদা-রসুন বাটা দিয়ে কষান। এ বার এতে লাল লঙ্কার গুঁড়ো এবং বিশেষ সাওজি মশলা মিশিয়ে আঁচ কমিয়ে কষাতে থাকুন। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে সামান্য গরম জলের ছিটে দিন, যাতে মশলা পুড়ে না যায়।

এ বার ম্যারিনেট করা মাংস কড়ায় দিয়ে তীব্র আঁচে ১০-১৫ মিনিট খুব ভাল করে কষাতে থাকুন, যাতে মশলা মাংসের গায়ে পুরোপুরি লেগে যায়। মাংস ভাল ভাবে কষে এলে পরিমাণ মতো ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিন। পাত্রটির মুখ ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন। অন্তত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট ধীরে ধীরে সেদ্ধ হতে দিন। মাংস নরম এলে এবং উপরে লালচে তেলের আস্তরণ ভেসে উঠলে ধনেপাতাকুচি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।

Mutton Recipes Nagpur

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy