E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ক্লান্ত শরীরে ধকল নেওয়া কি ঠিক?

ক্লান্ত শরীরেও কাজ করে গেলে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। তাতে ফল হয় বিপরীত।

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৮

বাড়ি হোক বা কর্মক্ষেত্র, সকাল থেকে রাত, দীর্ঘসময় পরিশ্রম চলে। কেরিয়ার, সংসার দুটোই সামলাতেই জেরবার আমরা। অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে কম-বেশি সকলেরই। কিন্তু সমস্যা তারও পরে। এই ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ঘুমোতে যান, তখন হয়তো ঘুমই আসে না। এ দিকে শরীরে অসহ্য কষ্ট হয়। এর জন্য দায়ী যে সমস্যা, তার নাম এইচপিএ অ্যাক্সিস।

আসলে অত্যধিক চাপের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্ক প্রস্তুত হয় শরীরকে সেই চাপের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য তৈরি করতে। মস্তিষ্ক বুঝে যায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করার জন্য পেশির মধ্যে রক্তসঞ্চালন বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এইচপিএ অ্যাক্সিস বা হাইপোথ্যালামিক পিটুইটারি অ্যাড্রিনাল অ্যাক্সিস। এটা শরীরের নিউরো-এন্ডোক্রাইন সিস্টেম। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা। এটি এমন কয়েকটি কোষ নিয়ে তৈরি যা স্নায়ুতন্ত্রের উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে রক্তপ্রবাহে হরমোন নিঃসরণ করে। শারীরিক ও মানসিক ভাবে ভাল থাকা, মন্দ থাকা অনেকটা নির্ভর করে এই ব্যবস্থার উপর।

এইচপিএ অ্যাক্সিসের পরিচয়

এইচপিএ অ্যাক্সিসের কাজ বোঝাতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবীর মুখোপাধ্যায় বললেন, “শরীর ও মনে চাপ বাড়লে তার সঙ্গে মোকাবিলা এবং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস থেকে কর্টিসল রিলিজ়িং হরমোন বা সিআরএইচ নিঃসৃত হয়। সেটা সঙ্কেত পাঠায় পিটুইটারিতে। মস্তিষ্কের গোড়ার দিকে ছোট মটরদানার মতো এই গ্রন্থি, হাইপোথ্যালামাসের নীচে থাকে। সঙ্কেত পেয়ে সেখানে এসিটিএইচ বা অ্যাড্রেনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন তৈরি হয়, যা কিডনির উপরের অংশে ছোট্ট ত্রিভুজাকৃতি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে। তা ক্লান্তি সামলাতে সাহায্য করে। তাই আমাদের শরীর যখন ক্লান্তি বা চাপের সম্মুখীন হয়, তখনই হাইপোথ্যালামাস জাগ্রত হয়ে যায় এবং উপরোক্ত ঘটনাগুলি পর্যায়ক্রমে ঘটে।” সুতরাং চাপের মধ্যে কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতা কোনও ম্যাজিক নয়, এ হল কর্টিসল হরমোনের খেলা, যাকে স্ট্রেস হরমোনও বলে।

কর্টিসলের হ্রাস-বৃদ্ধি

শরীরের পরিস্থিতি বুঝে কর্টিসলের পারদ ওঠে নামে। এই স্বয়ংক্রিয়তা না থাকলে মানুষ বিপদে পড়ত। এই হরমোনের বৃদ্ধি বা হ্রাস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? উত্তরে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. সত্যম চক্রবর্তী বললেন, “ধরুন, আমার দৌড়নোর ক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে প্রাণ বাঁচাতে ১০ কিমি বেগে দৌড়তে হচ্ছে। কোথা থেকে এই শক্তি পেলাম? চাপের মুখোমুখি হওয়ার জন্য অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিল, যাতে রক্তচাপ না নেমে যায়, শরীর জলশূন্য না হয়ে যায়। এই একই কারণে জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়েও কাজ করা যায়। কর্টিসল হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা ৫ থেকে ১৫ মাইক্রোগ্রাম, স্ট্রেসে থাকাকালীন পরীক্ষা করলে দেখা যাবে ২৫ হয়ে গিয়েছে। কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ সামান্য কম হলেই এসিটিএইচ অনেকটা বেড়ে যাবে। আবার শরীর অতিরিক্ত কর্টিসল তৈরি করে ফেললে এসিটিএইচ কমে যাবে। অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির হরমোন যদি হঠাৎ নেমে গেলে অ্যাড্রিনাল ক্রাইসিস হতে পারে। এতে মানুষের জীবন সংশয়ও হতে পারে।” এই জন্য সারভাইভাল গ্রন্থি বলা হয় অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিকে।

যাঁদের পিটুইটারি সার্জারি হয় তাঁদের এসিটিএইচ তৈরি হয় না অর্থাৎ কর্টিসল তৈরি হয় না। সেই সব রোগীকে বাইরে থেকে কর্টিসল সাপ্লিমেন্ট দিতে হয়। “তাঁদের আমরা বলেই দিই সর্দি, জ্বর, পেট খারাপ ইত্যাদি হলে যে ডোজ়ের কর্টিসল ট্যাবলেট খাচ্ছেন, তা দ্বিগুণ করে দেবেন, নচেৎ রক্তচাপ কমে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি হতে পারে,” বললেন ডা. চক্রবর্তী। শুধু শরীর অসুস্থ হলে নয়, অনেকের ক্রনিক স্ট্রেস, অ্যাংজ়াইটি থাকে। বিশেষ করে যাঁরা রাত জেগে কাজ করেন, কাজের জন্য ঠিক সময়ে খাওয়া-ঘুম হয় না, এঁদের কর্টিসল লেভেল বেড়ে থাকে। এই ব্যাপারে ডা. চক্রবর্তী বললেন, “কর্টিসল মানে স্টেরয়েড। কর্টিসল বেড়ে থাকে মানে শরীরে স্টেরয়েড বেড়ে থাকে। বাইরে থেকে অতিরিক্ত স্টেরয়েড ওষুধ খেলে যে ক্ষতি হবে, ক্রমাগত কর্টিসল লেভেল বেড়ে থাকলে একই ক্ষতি হয়। কর্টিসল সব সময়ে শরীরকে স্ট্রেসে রাখার চেষ্টা করে। এর প্রভাব পড়ে হার্টের উপরে। ফলে কম বয়সেই কার্ডিয়োভাসকুলার ডিজ়িজ় হয়। স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেড়ে যায়। অবসাদ বেড়ে যায়। আবার কর্টিসল কম থাকলে শরীর তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে। সামান্য পেট খারাপে চার-পাঁচবার মলত্যাগেই অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে কেউ। অ্যাড্রিনাল ইনসাফিসিয়েন্সি হয়ে যায়।” এ ছাড়া যক্ষ্মা, বেশ কয়েক প্রকার ম্যালিগনেন্ট ক্যানসার ইত্যাদি রোগের জন্যও শরীরে প্রাইমারি অ্যাড্রিনাল ইনসাফিসিয়েন্সি হয় তখন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি কাজ করে না। এই সব রোগের জন্য অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে কর্টিসল তৈরি কমে যায় এসিটিএইচ বেড়ে যায়। এর ফলে ত্বকে পিগমেন্টেশন, সারাক্ষণ শুয়ে বসে থাকার ইচ্ছে, ক্লান্তি বৃদ্ধি, ওজন হ্রাস, মাঝেমধ্যে বমি, খেতে ইচ্ছে না করার মতো একাধিক উপসর্গ দেখা দেবে।

মনের উপরে প্রভাব

কর্টিসল হরমোনের বেশি-কমে মনের উপরে যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। এর ব্যাখা দিয়ে ডা. আবীর মুখোপাধ্যায় বললেন, “কর্টিসল স্ট্রেস সামাল দেয়, এর মানে আমাদের শক্তি জোগায় এবং সর্তক থাকতে সাহায্য করে। তাই স্ট্রেস হরমোন তকমা পাওয়া কর্টিসল মাত্রই খারাপ, এমন নয়। কিন্তু স্ট্রেস দীর্ঘস্থায়ী হলেই ছন্দপতন হয়। এর থেকে অবসাদ, অ্যাংজ়াইটি হতে পারে। অতিরিক্ত স্ট্রেস ঘুম, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, আবেগে বিঘ্ন ঘটায়।” সাধারণত মনে করা হয় শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলে ঘুমও আসে তাড়াতাড়ি, কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, বাড়িতে অনুষ্ঠান থাকলে অতিথিদের অ্যাপায়নে সকাল থেকে রাত অবধি বিস্তর খাটাখাটনি করার পরেও বিছানায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। “এর কারণ, অন্যান্য দিনের চেয়ে ওই দিনে অতিরিক্ত কাজের জন্য কর্টিসল লেভেল বেড়ে থাকে, যা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ঘুমের। তবে অনিদ্রা হলেই ধরে নেবেন না যেন কর্টিসল লেভেল বেড়ে আছে। বহু কারণে অনিদ্রা হতে পারে। কর্টিসল সিক্রেশন দিনের বিভিন্ন সময় বাড়ে কমে। যখন বেশি দরকার তখন বাড়ে, যখন কম দরকার কমে। তাই শরীরে কর্টিসল স্যাম্পেল মাপার সময় সকাল আটটা। ঘুম থেকে ওঠার পরে সকালে শরীরে এর মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। বিভিন্ন কাজের পরে এর লেভেল মাপতে গেলে বিভ্রান্ত হতে হবে,” বললেন ডা. মুখোপাধ্যায়।

চাপ সামলানোর কারিকুরি

হরমোনাল কারণে কর্টিসল বাড়লে তা ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু মানসিক কারণে কর্টিসল বাড়লে সেই নিয়ন্ত্রণটা চিকিৎসা নয়। সে ক্ষেত্রে কী করতে হবে বললেন ডা. মুখোপাধ্যায়। “বাড়ি বা অফিসে যতই কাজ থাকুক না কেন আমাদের নিজেদের জন্য সময় বার করতে হবে। রোজ একটু সময় বার করে প্রাণায়াম, শারীরচর্চা করা জরুরি। বিশ্রাম ও বিনোদনের সময় রাখতে হবে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে।” অঙ্কন, ফোটোগ্রাফি, সেলাই, বই পড়া, গান শোনা ইত্যাদির শখ থাকলে তা চর্চা করতে হবে। রোজ-রোজ জাঙ্ক ফুড নয়, একটা পুষ্টিকর ডায়েট মেনে চলতে হবে। তবে স্ট্রেসের কারণে যদি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তখন মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Tiredness Health care

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy