E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অ্যাবরা কা ড্যাবরা গিলি গিলি ছু

জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র-এর সাক্ষাতে ইন্দ্রজালের জগতে পত্রিকা

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৫৩

সালটা ১৯৫৬, এপ্রিলের গোড়ার দিক। বিবিসির দফতরে ফোনের পর ফোন। দর্শকরা ভীত-সন্ত্রস্ত। তাঁরা একটি মেয়েকে লাইভ খুন হতে দেখে ফেলেছেন চ্যানেলের পর্দায়। সেই যুবতী বেঁচে আছেন কি না জানতে নাগাড়ে ফোন বিবিসির অফিসে। আসলে ততক্ষণে ব্রিটিশ দর্শকরা পি সি সরকারের ইন্দ্রজালে বাঁধা পড়েছেন। সে দিন পি সি সরকার তাঁর লাইভ ম্যাজিক শোয়ে, এক ১৭ বছরের যুবতীকে করাত দিয়ে অর্ধেক কেটে ফেলেন। তার পরে যখন তিনি সেই যুবতীকে বারবার ডেকে তোলার চেষ্টা করেন, সে সাড়া দেয়নি। এ সবের মাঝেই শোয়ের হোস্ট অনুষ্ঠান শেষ বলে ঘোষণা করেন ও পরবর্তী অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়।

সে দিনের ঘটনা মনে করে হাসতে হাসতে পি সি সরকার জুনিয়র বললেন, “আসলে বাবা এটা পরিকল্পনামাফিকই করেছিলেন। ওই মেয়েটির নাম ছিল দীপ্তি দে। ওকে বলে রেখেছিলেন যে ‘আমি তোকে ডাকলেও উঠবি না। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও উঠবি না।’ আর সেটাই ছিল মাস্টারস্ট্রোক। ততক্ষণে দেশ বিদেশে সেই শো খবর হয়ে গিয়েছে। তার পর যা হল, সেটাই ম্যাজিক, পরের পর শো হাউসফুল। আসলে বাবা জেদ নিয়ে গিয়েছিলেন সে দেশে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয়কে তো সে দেশে অত সহজে হিরো হতে দেবে না কেউ। সেই জায়গাটা আদায় করে নিতে হয়েছিল।”

মার্চেন্ট অব ভ্যানিশ

এমন বাবার যোগ্য পুত্র প্রদীপ চন্দ্র সরকারও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এলেন ইন্দ্রজালের জগতে। বাবার দলের প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে শোয়ে ঢুকলেন সরকার জুনিয়র। কিন্তু তিনি কি পারবেন? সন্দিহান ছিলেন প্রতুল চন্দ্র সরকার। কিন্তু ছেলে আত্মবিশ্বাসী, কারণ সব শো দেখে দেখে তাঁর তখন মুখস্থ, শোয়ে কোনটার পর কোনটা করতে হয়। বন্ধুরা যখন বিকেলে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত, মায়ের আদরের জহর তখন জাদুবিদ্যা অভ্যাসে রত। দিনক্ষণ অনুযায়ী শোয়ের দিন তাক লাগিয়ে দিলেন পি সি সরকার জুনিয়র। তাঁর হাত ধরে বাবার ম্যাজিক শো সফল। কিন্তু প্রশংসা তো দূরস্থান, বাবা তাঁকে কিছুই বললেন না। একরাশ মনখারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। রাতে ঘুমের মাঝে মাথায় স্নেহের পরশ। মা এসে পাশে বসলেন, ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন দশ টাকার নোট। সেই টাকা এখনও সযত্ন রয়েছে প্রদীপের কাছে। শুরু হল একের পর এক ম্যাজিকের মায়া বিস্তার। ক্রমশ বিদেশেও গেলেন শো করতে। টেম্পল অব ইন্ডিয়া, ওয়াটার অব ইন্ডিয়া, গ্লাস বক্স, হেড টুইস্ট, ফাইভ গোস্টসের মতো ম্যাজিক দেখে তাজ্জব দেশবিদেশের দর্শকরা। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি পি সি সরকার জুনিয়র।

খানা জংশনে ট্রেন ভ্যানিশের আগের মুহূর্তে।

খানা জংশনে ট্রেন ভ্যানিশের আগের মুহূর্তে।

মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা, বিজ্ঞান সাধনা জারি রেখেছিলেন পাশাপাশি। নতুন ইন্দ্রজাল তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দর্শককে। হুডিনির এসকেপকে চ্যালেঞ্জ করে বঙ্গোপসাগরে আন্ডারওয়াটার এসকেপ করে দেখালেন। ওয়াটার এসকেপ অ্যাক্টের পরে হ্যারি হুডিনির দাবি ছিল, এমন ম্যাজিক আগামী একশো বছরে কেউ করতে পারবে না। প্রদীপ সেটাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন এবং আরও কঠিন ভাবে সেই আন্ডারওয়াটার এসকেপ করে দেখান। নিজের পারফরম্যান্সের আগে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের সব ছুতারমিস্ত্রী ও লোহার সিন্দুক নির্মাতাদের আহ্বান জানান বাক্স বানানোর জন্য। সেই বাক্সে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের শক্ত তালা লাগানোর জন্য নিজেই পরামর্শ দেন। এর পরে নির্ধারিত দিনে ডায়মন্ড হারবারের নুরপুর ডকে কলকাতার সাংবাদিক, গোয়েন্দা, লেখক, নেতামন্ত্রী, বন্ধুবান্ধব ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেই একটি পোস্টাল ব্যাগে ঢুকে যান তিনি। সেই ব্যাগের মুখ সিল করে দুটো তালা দিয়ে তা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিশাল বাক্সে। দেড় টন ওজনের সেই বাক্সের মুখ তালা দিয়ে বন্ধ করে ওয়েল্ড করে বাক্স সিল করে ফেলে দেওয়া হয় সমুদ্রে। সাগরের গভীর জলে ঘুরপাক খেতে খেতে মুহূর্তেই তা তলিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের তখন উত্তেজনায় শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে আসছে। ক্রমশ হাতের ঘড়ি দেখছেন উপস্থিত সকলে। এক একটা মুহূর্ত তখন নিকটজনের হৃৎস্পন্দনের সমান। সকলের দুশ্চিন্তা ধূলিসাৎ করে মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মাথায় সমুদ্রের জলে ভেসে উঠেছিলেন পি সি সরকার জুনিয়র। পর দিন স্পেন, জার্মানি, জাপান, চিনের পত্রপত্রিকায় সেই খবর ছড়িয়ে পড়ল গোটা বিশ্বে। পরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে এই আন্ডারওয়াটার এসকেপই তিনি আবার করে দেখালেন ভারত মহাসাগরে। সে বার হেলিকপ্টার থেকে প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতা থেকে বাক্সবন্দি জাদুকরকে ফেলা হয়েছিল সমুদ্রের জলে আর তিনি বেরিয়ে আসেন মাত্র ৪০ সেকেন্ডে। তৈরি করেন নতুন রেকর্ড। সেখানেও শেষ নেই। কখনও মুহূর্তের মধ্যে তাজমহল ভ্যানিশ করে দিয়েছেন তো কখনও একটা আস্ত ট্রেন উধাও। ভক্তরা ভালবেসে নাম রাখলেন ‘মার্চেন্ট অব ভ্যানিশ’।

আমাদের দেশ মায়ার দেশ

একের পর এক নতুন ম্যাজিক সৃষ্টি! সেই মায়ায় বুঁদ আট থেকে আশি। ম্যাজিক আসলে কী? কী ভাবে তৈরি হয় এই প্রহেলিকা? ম্যাজিক শব্দটাকে আসলে দু’ভাবে উচ্চারণ করা যায়। ‘জি’-এর উচ্চারণ যখন ‘জ’-এর মতো, ম্যাজিক। আবার ‘জি’ যখন ‘গ’-এর মতো, তখন ম্যাগিক। যাঁরা ম্যাজিক দেখাতেন, তাঁদের পরিচিতি ছিল ম্যাগি নামেও। এই একই বানান আবার উচ্চারিত হত মেজাই নামেও, যার মানে পণ্ডিত ব্যক্তি। পি সি সরকার জুনিয়র বললেন, “‘থ্রি কিংস অব ওরিয়েন্ট’ যা পরিচিত ‘দ্য কোয়েস্ট অব দ্য মেজাই’ নামে, সেখানে তিনজন পণ্ডিত ছুটন্ত নক্ষত্রকে অনুসরণ করে জানতে পারলেন এক মহাপুরুষের জন্ম হচ্ছে, খুঁজে পেলেন জিশুকে। এই মেজাইদের পাণ্ডিত্যও তো ম্যাজিক। সেই তখন থেকেই ম্যাজিক হচ্ছে কিন্তু। আর আমাদের দেশ তো মায়ার দেশ। ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা-র উপরেই তো সব কিছু। এই যে আমরা দুর্গাপুজো করি, মহামায়া, সে-ও তো মায়ারই এক রূপ। আমাদের বই তো অথর্ব বেদ। সেখানেই লেখা রয়েছে জীবনে সব কিছু মায়ায় ভরা। সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশের মাঝে এই যে জীবনপ্রবাহ, সেটাই তো মায়া।” এই মায়ার জগৎই ধরা হয় ম্যাজিকে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, চৌষট্টি কলার অন্যতম এই ইন্দ্রজাল।

অনেকেই জাদুকর হিসেবে অনেক নাম করেছেন। কিন্তু পি সি সরকারের মতে, এ দেশের মাদারিদের মতো ম্যাজিশিয়ান কেউ নয়। “আমরা যখন ম্যাজিক দেখাই, আমরা মঞ্চে, দর্শক থাকে সামনে। অর্থাৎ আমাদের একটা দিক দর্শক দেখতে পান না। কিন্তু মাদারিরা খেলা দেখান রাস্তায়। যেখানে গোল করে মানুষ ঘিরে থাকেন তাঁদের, সার্কাসের গ্যালারির মতো। সেখানে কিন্তু গোপন করার কোনও জায়গাই নেই,” তাঁরা যখন খেলা দেখান, মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মনের সঙ্গে খেলেন। মন অন্য দিকে চালিত করে দেন। ইন্দ্রজালের রহস্য নির্ভর করে মনস্তত্ত্ব, বিজ্ঞানচর্চা আর জাদুকর ও তাঁর দলের পারফরম্যান্সের উপরে। মানুষের মনের অবচেতন, দৃষ্টির মাঝের শূন্যস্থান ধরতে হয় জাদুকরদের।

ঙ্গোপসাগরে ম্যাজিকশেষে পি সি সরকার জুনিয়র।

ঙ্গোপসাগরে ম্যাজিকশেষে পি সি সরকার জুনিয়র।

তার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সঙ্ঘবদ্ধ অভ্যাস। নাটকে যেমন মঞ্চে কে কোথায় দাঁড়াবেন, কোন শিল্পীর পরে কোন শিল্পীর প্রবেশ, প্রস্থান, সংলাপের সময়, ম্যাজিক শোয়েও ঠিক সে ভাবেই মাপা থাকে প্রত্যেক কলাকুশলীর রুটিন। ২০০৩ সালের আমেরিকা সফরে এক ইন্দ্রজাল শোয়ের খসড়া দেখালেন তিনি। সেখানে প্রত্যেকটা ম্যাজিক অনুযায়ী, কোন শিল্পী মঞ্চের কোথায় থাকবেন, কে আলো জ্বালাবেন, কে নেভাবেন, এমনকি ম্যাজিকশেষে কে টেবিল মুছবেন... সে সবই সময় ধরে লেখা রয়েছে। এই হিসেবেই পুরো দল পারফর্ম করে চলে দিনের পর দিন। যেন একটা ছন্দে একই সময়ে পুরো দলের গতিবিধি তৈরি করে রাখা। একজনের বিচ্যুতিতে পুরো পারফরম্যান্স নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এ দেশের মায়ার জগৎ ধরে রাখার মতো জাদুনগরী করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। জলপাইগুড়ির অদূরে একটি জায়গাও কিনেছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। দুঃখ করে বলছিলেন, “আমরা নিজেদের দেশের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি না। এই জাদুজগৎ কিন্তু সকলের দরকার। অনেকে ভাবেন, ম্যাজিক বাচ্চাদের জন্য। একেবারেই না। ম্যাজিক এমন একটা জিনিস যা বড়দের বাচ্চা বানিয়ে দেয়। মানুষ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে বোকা হতে আসেন আর তাতে আনন্দ পান। অনেকে একাধিক বার একই ম্যাজিক শো দেখতে এসেছেন। পণ্ডিত রবিশঙ্কর আমার একটি ম্যাজিক শো ছ’বার দেখতে এসেছিলেন। মহাজাতি সদনে সে বার আমার শো দেখতে এসে উনি শুধু আমাদের দলের বংশীবাদক বীরবল বাহাদুরকে দেখছিলেন। পরে জানলাম, আসলে আগের শোগুলোয় উনি ম্যাজিক দেখেছেন। বাঁশিটায় মন দেওয়া হয়নি। তাই ওটা শুনতে আবার এসেছেন।” আলো, সঙ্গীত, রং, শব্দ, শিল্পীদের অভিনয়... এমন একাধিক উপঢৌকন দিয়ে মানুষকে অন্য জগতে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কোন ফাঁকে ম্যাজিকটা হয়ে যাচ্ছে, তা ধরতেই পারেন না কেউ। এই ম্যাজিকের অন্যতম সদস্য দর্শক নিজেও।

আসলে এই নশ্বর পৃথিবীতে যেখানে রোজনামচার জীবনে টানাপড়েন মানুষের নিত্যসঙ্গী, সেখানে আমাদের জীবনে একটা ম্যাজিক তো সকলেই চাই। প্রেক্ষাগৃহের আলো নিভে গেলে জাদুকর যখন ‘অ্যাবরা কা ড্যাবরা’ বলে অর্ধেক গ্লাস পূর্ণ করে দেন অথবা কাউকে দু’টুকরো করে আবার জোড়া লাগিয়ে বাঁচিয়ে দেন, তখন আমাদের অপূর্ণ-অর্ধপূর্ণ ইচ্ছেগুলোই যেন পূর্ণ হয়ে ওঠে। হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে খুদে পড়ুয়া থেকে পক্বকেশ বৃদ্ধও, আর ঠিক সেই সময়েই হয়ে যায় আসল ম্যাজিকটা...


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Interview PC Sorcar Junior

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy