পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে চোখে পড়ে আনাচকানাচে গজিয়ে ওঠা নানা ধরনের ফার্ন। কখনও পাকদণ্ডীর বাঁকে, কখনও আবার প্রাচীন কোনও গাছের শাখায় ফার্নের সবুজ পাতা জাল বোনে। ফার্নের সৌন্দর্য পাহাড়ি সবুজ ল্যান্ডস্কেপকে আরও মনোরম করে তোলে নিঃসন্দেহে। এমন সৌন্দর্য যদি নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের পরিসরে করা যায়? এই ইচ্ছে পূরণ অসম্ভব নয়। ছোট্ট একটা ফার্নারি তৈরি করা যায় নিজের বাড়িতেই। কারণ ফার্নের খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত রোদ না হলেও চলে। বরং ছায়াঘন স্যাঁতসেঁতে জায়গা ফার্নের জন্য আদর্শ।
ফার্নকে অনেকেই বুনো গাছের তকমা দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি রাজ্য সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য জুড়ে একাধিক ‘ফার্ন বায়োডায়ভার্সিটি পার্ক’ গড়ে তোলার! ফার্নের ভেষজ গুণ রয়েছে, তাই এই ধরনের গাছ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে চলেছে সরকার। সুতরাং বাগানপ্রেমীরা ভাবতেই পারেন বাড়িতে ছোট পরিসরে সাজিয়েগুছিয়ে ফার্নারি তৈরির কথা।
ফার্নারি তৈরির পরিবেশ
বাড়ির উত্তর বা পূর্ব দিকে যেখানে সকালের রোদ আসে, কিন্তু দুপুরের কড়া রোদ পড়ে না, আবার বাগানে বড় গাছের নীচে ছায়াঘন হয়ে থাকে— এই জায়গাগুলো বেশ উপযুক্ত ফার্নারির জন্য। বারান্দায় যেখানে কম রোদ আসে বা শেড দেওয়া সেখানে ফার্ন শোভাবর্ধন করতে পারে। যাঁদের সে ভাবে ছায়াঘন বা রোদহীন জায়গা নেই, তাঁরা বাগানের কোনও একটা অংশ বাঁশ-খড় বা রঙিন কাচ দিয়ে ঘিরে নিতে পারেন। এ ছাড়া ইনডোর প্লান্ট হিসেবেও ফার্নের কদর ভাল। ফার্ন স্যাঁতসেতে ভাব পছন্দ করে ঠিকই, কিন্তু গাছের গোড়ায় জল জমতে দেওয়া যাবে না। ফার্ন গাছের গোড়া সব সময় হালকা ভেজা বা আর্দ্র রাখতে হবে। এই গাছের জন্য নরম, ঝুরঝুরে এবং জলনিকাশির সুব্যবস্থা আছে, এমন মাটির প্রয়োজন। বাগানের মাটির সঙ্গে পাতা পচা সার, কোকোপিট এবং অল্প পরিমাণে বালি মিশিয়ে মাটি তৈরি করতে হবে। খুব বেশি সারের প্রয়োজন হয় না। বছরে দুই থেকে তিনবার হালকা তরল জৈব সার বা কম্পোস্ট দিলেই হবে।
বর্ষায় সার-জল দেওয়ার দরকার নেই, বৃষ্টির জলে তা ধুয়ে যাবে। কিন্তু গরমে ও শীতে মাটি শুকনো হলেই স্প্রেয়ার দিয়ে জল দেবেন। শুধু মাটিতে নয়, পাতাতেও জল ছিটিয়ে দিতে হবে। তার সঙ্গে সারও দিতে হবে। আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য টবের মাটির উপরে শুকনো পাতা বা খড়কুচি বা কাঠের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে মাটির উপরের অংশ ঢেকে দিলে ভিজে ভাবটা বজায় থাকবে। সাধারণত ভাল ফার্ন পরিণত গাছের নীচেই ভাল হয়।
নানা রকমের ফার্ন
এ দেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বস্টন ফার্ন। অনেকেই এই ফার্ন ঝুলন্ত টবে রাখেন। বার্ডস নেস্ট ফার্নের পাতাগুলি আকারে বেশ বড় হয়, যার জন্য দেখতেও সুন্দর লাগে। বার্ডস নেস্ট ফার্নের আর একটি প্রজাতি কোবরা ফার্ন। সাপের ফণার মতো পাতাগুলো দেখতে। মেডেনহেয়ার ফার্নের পাতাগুলো খুব নরম ও সূক্ষ্ম হয়। স্ট্যাগহর্ন ফার্ন এদের চেয়ে একটু আলাদা। কাঠের তক্তার সঙ্গে বা বাঁশ বা কোনও পরিণত গাছের বড় ডালের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলে সুন্দর বাড়বে এই ধরনের ফার্ন। হালকাআলো এবং সেমি-শেড দেওয়া জায়গায় এই গাছ ভাল বাড়ে। ফার্নের প্রজাতি না হয়েও ফার্ন সাম্রাজ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় অ্যাসপারাগাস প্রজাতির ফক্সটেল ফার্ন।
সাজাব যতনে
ফার্নারি একটা বন্য বা প্রাকৃতিক রূপ দিলে দেখতে ভাল লাগে। মাটিতে রোপণ করলে গাছের চারপাশে কিছু ছোট-বড় পাথর, পুরনো গাছের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরো মাটির উপরে সাজিয়ে দিন। জায়গা থাকলে ছোট একটা জলাধার তৈরি করে নিতে পারেন। তার চারপাশ ঘিরে নানা ধরনের ফার্ন লাগাতে পারেন। টব হলে নানা আকারের টব নিতে পারেন। কিছু জায়গায় কোকো কয়ার বাস্কেটে ফার্ন রোপণ করে ঝুলিয়ে দিতে পারেন। এ ছাড়া সাজানোর সময়ে বড় ফার্ন পিছনে রেখে ছোটগুলো সামনে রাখুন। টবগুলো একটু উপর নীচ করে দিলে দেখতে ভাল লাগবে। ছোট ফ্ল্যাটে মিনিয়েচার ফার্নারিও গড়ে তুলতে পারেন। তার জন্য টেরারিয়ামের মধ্যে বা কাঠের ব্লকের উপরে নানা রকমের ফার্ন দিয়ে একটা ছোট ফার্নারি বানিয়ে নেওয়া যায়।