অন্দরসাজের অন্যতম উপকরণ যদি হয় কাঠের আসবাব, তা হলে তার আভিজাত্যই আলাদা। তবে কাঠ দিয়ে তৈরি যে কোনও আসবাব, ফ্রেমিং ইত্যাদির যথাযথ যত্ন প্রয়োজন, তবেই তা দীর্ঘস্থায়ী ও দৃষ্টিনন্দন হবে। বাড়িতে কাঠের কাজ করাতে গেলে একেবারে প্রথম ধাপ থেকেই কিছু বিষয় মাথায় রেখে এগোনো ভাল। তৈরি হয়ে গেলে তার যত্ন আবার আলাদা। কাঠের অন্দরসাজের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় মাথায় রাখবেন, জেনে নিন।
গোড়ার কথা
প্লাই বা ইঞ্জিনিয়ারিং উড ব্যবহার করে আসবাব তৈরি করুন কিংবা ভারী সেগুন, শিশু বা পাইন কাঠ ব্যবহার করে ফার্নিচার বানান— তা তৈরি ও ফিট করানোর আগেই কয়েকটি কাজ করিয়ে রাখতে হবে। যে মেঝের উপরে ফার্নিচার রাখা হবে, সেই ফ্লোরের কাটিং ফুটো করে পেস্ট কন্ট্রোলের ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। ছ’ইঞ্চি বা চার ইঞ্চি গ্যাপ রেখে এই ট্রিটমেন্ট করা হয়। এখন বাজারে উই নিরোধক একাধিক ট্রিটমেন্ট পাওয়া যায়, যা ফ্ল্যাট তৈরির সময়েই করিয়ে নিতে হয়। এই টার্মাইট কন্ট্রোল ট্রিটমেন্ট করানো থাকলে পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাট থেকে এসেও উই ধরতে পারে না।
প্লাইউড বাছার সময়ে ব্র্যান্ডেড, টার্মাইট প্রুফ ও অয়েল-ওয়াটার প্রুফ নেওয়াই ভাল। অন্ততপক্ষে ১৫-২০ বছর স্বচ্ছন্দে টেকসই থাকে এই ধরনের প্লাই। বিশেষ করে রান্নাঘর, খাওয়ার জায়গা কিংবা ওয়াশরুমে যদি এই ধরনের কাঠ ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে সহজে সমস্যায় পড়তে হয় না। সংলগ্ন দেওয়ালে ড্যাম্প-প্রুফ প্রাইমার কোটিং দিতে হবে।
ঠিক বাছাই
কাঠের মান ও তার পালিশ... এর উপরেই আসবাবের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে। দামি কাঠে ন্যাচারাল পালিশ করালেই ভাল। সেগুন, মেহগনি, শিশু কিংবা রাবারউডের আসবাবের নিজস্ব টেক্সচার থাকে। ডিজ়াইনার ঊর্বশী বসু বললেন, “অনেকে বাড়ির পুরনো ভাল কাঠের আসবাব ফেলে দিয়ে আধুনিক ফার্নিচারের দিকে ঝোঁকেন। ফেলে দেওয়া খুব সহজ, তবে একটু পরিকল্পনা থাকলে পুরনো আসবাবগুলিকেই আবার নতুন করে বানিয়ে নেওয়া যায়। আগেকার দিনের কাঠের মান এখন দাম দিলেও পাওয়া যায় না। তাই সেগুলিকে সংরক্ষণ করা দরকার। পুরনো বাড়ির জানলা, দরজার কাঠও এই ভাবে ব্যবহার করে ক্যাবিনেট তৈরি করা যায়। আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, পুরনো জিনিসের আভিজাত্য আলাদা।”
অনেক সময়ে দামি কাঠ দিয়ে সম্পূর্ণ ফার্নিচার করানো সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে বেসটা মজবুত কাঠের ব্যবহার করে বাকি হেডবোর্ড বা অন্যান্য অংশে ইঞ্জিনিয়ারিং উড ব্যবহার করা যেতে পারে। হাইড্রলিক স্টোরেজ, ক্যাবিনেট, শেলফ ইত্যাদি তৈরির সময়ে হিঞ্জ, স্ক্রু ইত্যাদি ভাল মানের বেছে নিন। সেগুলি যতটা ভার বইতে পারে, ততটাই জিনিস রাখুন। ওয়েট ডিস্ট্রিবিউশনও কিন্তু আসবাব সাজানোর গোড়ার কথা।
আসবাবের যত্ন
সেগুন বা অন্যান্য ভারী কাঠের আসবাব, ফ্রেম, দরজা-জানলা ইত্যাদি বর্ষাকালে আর্দ্রতার কারণে খানিক প্রসারিত হয়, আবার শীতকালে সঙ্কুচিত হয়ে আসে। কাঠের আসবাবে ড্যাম্প বা ঘুণ ধরছে কি না, কিংবা সরাসরি চড়া রোদ এসে পড়ছে কি না, সে দিকে খেয়াল রাখা দরকার। যে দেওয়ালে ড্যাম্প পড়েছে, তার থেকে দূরে রাখতে হবে কাঠের আসবাব। অথবা ভারী পর্দা টেনে রাখতে হবে। যদি ফিক্সড ফার্নিচার না হয়, তা হলে খেয়াল রাখতে হবে, তা যেন দেওয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে না থাকে।
ভিজে কাপড় দিয়ে কখনওই কাঠের জিনিস মুছবেন না। একান্ত দরকার হলে সঙ্গে সঙ্গে আবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হবে। মাইক্রোফাইবার ক্লথ দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করলে কাঠের আসবাবের ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকে। হাই গ্লস ফার্নিচার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এর ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যায়। ইন্টিরিয়র ডিজ়াইনার ঊর্বশী বসু জানালেন, অনেকে নানা ধরনের বাজারচলতি ক্লিনিং কেমিক্যাল ব্যবহার করে কাঠের আসবাব পরিষ্কার করেন। “এতে আদতে কাঠের ক্ষতিই হয়। লিকুইড ক্লিনার ব্যবহার করলেও তা কাঠের উপরে সরাসরি স্প্রে না করে কাপড়ে স্প্রে করে তার পরে মোছা উচিত,” বললেন তিনি। জলের সঙ্গে সামান্য ভিনিগার মিশিয়ে নিয়েও পরিষ্কার করা যায়।
আসবাবে কাঠের কারুকাজ থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কারণ এর খাঁজে ময়লা একবার বসে গেলে পরে তা ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক বছর অন্তর ওয়্যাক্স পলিশ করিয়ে নেওয়া ভাল। এ ছাড়া কাঠের ডাইনিং বা কফি টেবলে সব সময়ে কোস্টার, ম্যাট বা টেবল রানার ব্যবহার করতে হবে। খুব গরম জিনিস সরাসরি রাখা যাবে না। কাচের বাসনও সরাসরি রাখলে দাগ ধরে যাবে। অনেকে কাজের টেবলে কাঠের উপরে কাচের আবরণ করিয়ে নেন, তবে তার চল এখন কমে এসেছে। ঘুণ বা ড্যাম্প ধরা থেকে বাঁচাতে অ্যান্টি মোল্ড স্প্রে করানো দরকার নিয়মিত। যে ঘরে নিয়মিত এসি চলে, সেখানকার কাঠের খাট বা আসবাবের যত্ন বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।