গুরুগ্রাম থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে, গমক্ষেতের মাঝে ১০ একর জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে দুধসাদা এক রাজপ্রাসাদ— নাম পটৌদী প্যালেস। এখন সে বাড়ির মালিকানা অভিনেতা সইফ অলী খানের হাতে। এই প্রাসাদের ভিতরে রয়েছে ১৫০টি ঘর। যার মধ্যে নজর কাড়ে ৭টি শোয়ার ঘর, ৭টি সাজঘর, বিলিয়ার্ড রুম, সুইমিং পুল, আর বিশাল বাগান। প্রাসাদটির বর্তমান মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এই প্রাসাদের সাজসজ্জা যেমন চোখ ধাঁধানো, তেমনই এই প্রাসাদ তৈরির কাহিনিও বেশ অন্য রকম। এর নেপথ্যে রয়েছে এক হবু বৌয়ের মন জয় করার করার গল্প।
প্রাসাদটি বানিয়েছিলেন সইফের ঠাকুরদা, নবাব মহম্মদ ইফতিকার অলী খান পটৌদী। শুধু নবাব নন, তিনি ছিলেন ১৯৪৬ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কও। তিনি বিয়ে করতে চেয়েছিলেন ভোপালের শেষ নবাব হামিদুল্লাহ খানের দ্বিতীয় কন্যা বেগম সাজিদা সুলতানকে। ভোপালের রাজসিক বিলাসিতায় বড় হওয়া সাজিদার জন্য পটৌদীর পুরনো বাড়িটা নাকি যথেষ্ট মনে হয়নি ইফতিকারের। তাই অষ্টম নবাবের অনুরোধে ব্রিটিশ স্থপতি রবার্ট টর রাসেলকে দিয়ে ঔপনিবেশিক কেতায় নকশা করানো হয় এই নতুন প্রাসাদটির। স্থানীয়েরা একে 'ইব্রাহিম কোঠি' নামেও চিনতেন।
পটৌদি প্যালেসের অন্দরমহল। ছবি: সংগৃহীত।
সইফের বাবা, কিংবদন্তি ক্রিকেটার মনসুর অলী খান পটৌদী ওরফে টাইগার পটৌদীর মৃত্যুর পর প্রাসাদটি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল সইফদের। ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর টাইগার পটৌদী মারা যাওয়ার পর প্রাসাদটি নিমরানা হোটেল গ্রুপকে ভাড়া দেওয়া ছিল। ২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে সইফ নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘‘বাবা মারা যাওয়ার পর প্রাসাদটা নিমরানা গ্রুপের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল। ওরা আমাকে বলল, ফেরত পেতে গেলে অনেক টাকা দিতে হবে।’’ অবশেষে ২০১৪ সালে নিজের পৈতৃক প্রাসাদ আবারও কিনতে হয় সইফকে। তাঁর কথায়, ‘‘লোকে ভাবে, পৈতৃক সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। কিন্তু এই বাড়িটাও আমাকে টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে কিছুই পাইনি, শুধু ইতিহাস, কিছু সুন্দর ছবি আর জমি ছাড়া।’’
আজ পটৌদী প্যালেস শুধু নবাব পরিবারের ছুটি কাটানোর জায়গা নয়, বলিউডেরও প্রিয় শুটিং স্পটও বটে। এখানে শুটিং হয়েছে ‘মঙ্গল পাণ্ডে’, ‘বীর-জ়ারা’, ‘রং দে বসন্তী’, ‘গাঁধী মাই ফাদার’, ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহন’, ‘তাণ্ডব’-এর মতো একাধিক সিনেমা ও সিরিজ়ের।
পটৌদী প্যালেসের বাগানে মেয়ের সঙ্গে সোহা অলী খান। ছবি: সংগৃহীত।
প্রাসাদের দরজা ঠেলে ঢুকলেই চোখে পড়বে উঁচু উঁচু সিলিং, যেখান থেকে ঝুলছে বিশাল সাবেক ঝাড়বাতি। দেওয়ালে টাঙানো নবাব পরিবারের পুরনো দিনের হাতে আঁকা ছবি, কোণে কোণে ছড়িয়ে আছে পুরনো দিনের আসবাব, দুষ্প্রাপ্য সব শিল্পকর্ম। প্রতিটা ঘর যেন এক একটা ইতিহাসের পাতা। স্থাপত্যেও নবাবি ছাপ স্পষ্ট। কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ করা খিলান, কোথাও নিখুঁত নকশা কাটা দেওয়াল, মাথার উপর বিশাল গম্বুজ। ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়া আর দেশীয় রাজকীয়তার মিশেল — এই সংমিশ্রণই পটৌদী প্যালেসকে অনন্য করে তুলেছে।
অবসর হলেই স্ত্রী করীনা কপূর আর ছেলেদের নিয়ে ছুটি কাটাতে সেই প্রাসাদে যান সইফ। এই প্রাসাদকে ঘিরে রয়েছে একটা প্রেম আর একটা ফিরে পাওয়ার গল্প — পটৌদী প্যালেস আজও সেই ইতিকথা বয়ে বেড়াচ্ছে।