কথার মাধ্যমে প্রকাশ করতে না পারলেও পোষ্যদের মনেও তৈরি হয় নানা অনুভূতি— ভাল এবং খারাপ লাগার। মনখারাপ ওদেরও হয়, অবসাদও। সেটা নজরে পড়বে তখনই, যখন তাদের প্রতি মনোযোগ, ভালবাসা থাকবে যথেষ্ট। এর জন্য ওদের সঙ্গে নির্ভেজাল সময় কাটাতে হবে, পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তার আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না। বাইরের আচরণে পরিবর্তন এলে, হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে গেলে কিংবা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলে তখন সতর্ক হতে হবে। প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মনখারাপের কারণ
- পোষ্যের খুব প্রিয় কোনও ব্যক্তি বা সঙ্গী (অন্য পোষ্য, যার সঙ্গে সে বড় হয়েছে) যদি হঠাৎ চোখের আড়ালে চলে যায় দীর্ঘ দিনের জন্য, এরা একাকিত্বে ভোগে ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
- প্রভুর যদি শরীর খারাপ হয় কিংবা যদি মারা যায়, তার পোষ্যটির উপরে গভীর প্রভাব পড়ে। অনেক সময়ে মৃতপ্রায় ব্যক্তির পোষ্যও প্রভুর আসন্ন পরিণতি আঁচ করতে পেরে অবসাদে চলে যায়।
- বাইরে কোথাও যাওয়ার সময়ে পোষ্যকে ক্রেশে রেখে গেলে সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা। কখন তাকে ফেরত নিতে আসবে, সেই অপেক্ষায় দিন কাটে ওদের।
- বেশির ভাগ প্রাণীর সবচেয়ে বড় শত্রু হল একাকিত্ব। পোষ্যকে স্বল্প পরিসরে আটকে রাখলে, বেশির ভাগ সময়ে বেঁধে রাখলে বা ঘরে বন্ধ করে রাখলে, অন্যদের সঙ্গে মিশতে না দিলে ধীরে ধীরে তাদের স্বভাবে পরিবর্তন এসে যায়। তখন তারা বাইরের কাউকে দেখলেই প্রচণ্ড ডাকাডাকি করে, কামড়াতে যায়, ছেড়ে দিলেই সারা ঘরে ছুটে বেড়ায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে একা থাকতে থাকতে পোষ্যের এমন অভ্যেস হয়ে যায় যে, বাইরের কাউকে দেখলেই তারা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে এক কোণে লুকিয়ে পড়ে। খেলাধুলোর জন্য খোলা জায়গা না পেলে বা অন্যের সঙ্গে না মিশলে এই সমস্যা খুব বেশি করে দেখা যায়।
- শরীর খারাপ হলেও পোষ্যরা নির্জীব হয়ে পড়ে। মেটিংয়ের সিজ়ন এলে সঙ্গী না পেলে এদের মেজাজ খারাপ হয়ে যায় প্রাকৃতিক নিয়মেই। কোনও পোষ্য এ রকম সময়ে খুবই আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ে, আবার কেউ কেউ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে পুরোপুরি। বেড়ালের ক্ষেত্রে সারা ঘরে প্রস্রাব করা, জানলা বা বারান্দায় গিয়ে সমানে ডাকতে থাকা কিংবা প্রভুর গায়ে গা ঘষার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
কী করণীয়?
যদি দেখেন আপনার পোষ্য দিনের পর দিন মনমরা হয়ে বসে রয়েছে, খেলাধুলো কমিয়ে দিয়েছে কিংবা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে— সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিন। পশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গৌতম মুখোপাধ্যায় বললেন, “আগে দেখুন, কোনও শারীরিক অসুবিধে থেকে পোষ্য অবসন্ন হয়ে পড়ছে কি না। সময় মতো মেটিং করানো দরকার। ব্রিডিং করানোর উদ্দেশ্য না থাকলে অপারেশন করিয়ে নেওয়াই ভাল।”
যদি বোঝেন সমস্যা শারীরিক নয়, মানসিক অবসাদ গ্রাস করছে, তা হলে তার মূলের কারণটি খোঁজার চেষ্টা করুন। খোলা জায়গায় বাঁধনহীন ভাবে ছেড়ে দিন কিছুটা সময়। ডা. মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ, অন্যদের সঙ্গে মিশতে দিন পোষ্যকে। “বাড়িতে অতিথি এলেই বেঁধে ফেলার অভ্যেস ধীরে ধীরে পাল্টে ফেলুন, এতে ওরাও অচেনা লোকের সঙ্গে অভ্যস্ত হবে। একটা ঘরে প্রথম থেকেই বন্ধ করে রাখলে, ওদের মিশুকে স্বভাব কোনও দিনই তৈরি হওয়ার সুযোগ পাবে না,” বললেন তিনি।
অনেক পোষ্য চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়। ডাক্তারের সঙ্গে একবার বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেলে সেই ভয় ধীরে ধীরে কেটে যাবে।
কোনও পরিস্থিতিতে ওদের সাময়িক ভাবে ছেড়ে যেতে হলে বা ক্রেশে রাখতে হলে আগে থেকে আশ্বস্ত করুন, যে ক’দিন পরেই ওকে এসে নিয়ে যাওয়া হবে। পোষ্যদের প্রিয়জনের মৃতদেহের সামনে না নিয়ে যাওয়াই ভাল। এই মানসিক ধাক্কা সামলে উঠতে ওদের সময় লাগে। প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় দরজার সামনে বসে থাকে ওরা প্রায় সারা দিন। এই সময়ে ওদের আদর, খেলনা, ট্রিট দিয়ে ভোলাতে হবে, ঠিক শিশুদের মতোই।
উৎসবের মরসুমে শব্দবাজি, আতসবাজির হাত থেকে ওদের দূরে রাখতে হবে। জোরে আওয়াজ ও আগুনে ওরা অসম্ভব ভয় পায়, কষ্ট হয়। এমনকি ভয়ে কাঁপুনি দিয়ে ফিট হয়ে যেতেও দেখা যায় কিছু পোষ্যকে। এই সময়ে ওদের বাইরে বার না করাই ভাল। জানলা-দরজা বন্ধ করে রাখতে পারেন।
ওদের স্বভাবে পরিবর্তন এলে প্রথমেই খোঁজার চেষ্টা করুন, কেন এমন করছে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে। ওদের মনখারাপ প্রকাশ করার উপায় নেই বলে তা অবহেলা করা বা ওদেরই দোষী সাব্যস্ত করা অন্যায়। মনে রাখবেন, মনখারাপের দাওয়াই হিসেবে আদর-যত্নের কোনও বিকল্প নেই।