গোটা জগৎটাই এখন মুঠোফোনে বন্দি। যোগাযোগ, বাজারহাট, বিনোদন, ব্যাঙ্কিং, পড়াশোনা... সব কিছু এখন একটা যন্ত্রের মাধ্যমেই হয়ে যাচ্ছে। দেড় দশক আগেও এতটা ‘স্মার্ট’ হইনি আমরা। গ্যাজেটসের ব্যবহারে আগামী প্রজন্ম আরও আধুনিক। কিন্তু সম্প্রতি উলটপুরাণও চোখে পড়ছে। আধুনিক প্রজন্মের কাছে কদর বাড়ছে পুরনো গ্যাজেটসের, বিশেষ করে অ্যানালগ যন্ত্রপাতির। ব্লুটুথের বদলে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন পুরনো ইয়ারফোনে। অবহেলায় পড়ে থাকা সিডি প্লেয়ারের ধুলো ঝেড়ে সারিয়ে নিচ্ছেন অনেকে।
হলিউড-বলিউডের অনেক তারকাকেই দেখা যায় ব্লুটুথ ইয়ারপ্লাগের বদলে তারের ইয়ারফোন ব্যবহার করছেন। জেন জ়ি হার্টথ্রব জ়েন্ডেয়া তাঁর জট পাকিয়ে যাওয়া তারের ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মডেল বেলা হাদিদ ডিজ়াইনার পোশাকের সঙ্গে ব্যবহার করছেন পুরনো ইয়ারপ্লাগ। পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান ‘দি ওডিসি’ মুক্তির সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। যোগাযোগ করার জন্য তাঁর একটি ফ্লিপ ফোন আছে। ব্যস, সেই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের অ্যানালগ ফোন কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছে জেন জ়ি-দের মধ্যে।
সময়ের সারিতে পিছনে হাঁটা কি নেহাতই হুজুগ নাকি সুস্পষ্ট কারণও রয়েছে? জেন জ়ি-রা এর ব্যাখ্যাও দিয়েছে। স্মার্টফোন ও তার আনুষঙ্গিক গ্যাজেটসে চার্জ দেওয়া বেশ ঝকমারি। বিজ়নেস ম্যানেজমেন্টের প্রথম বর্ষের ছাত্র আদিত্য রাস্তায় বেরোনোর সময়ে অ্যানালগ ফোন ব্যবহার করেন। তাঁর কথায়, “ফোন, পাওয়ারব্যাঙ্ক, ব্লুটুথ সব ক’টাতেই চার্জ দিতে হয় ও প্রতিটির চার্জার আলাদা। ক্লাসের মাঝে ফোন দেখার সময় হয় না আর রাস্তাঘাটে যোগাযোগের জন্য বোতামটেপা ফোনই যথেষ্ট।”
আগ্রহ বাড়ছে সিডি-ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে। শুধু জেন জ়ি নয়, মিলেনিয়ালরাও নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছেন। বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকা ক্যাসেট প্লেয়ার, ক্যাসেটস ফের বেরোচ্ছে। চাঁদনী মার্কেটের এক ইলেকট্রনিক্স দোকানের বিক্রেতা জানালেন, পোর্টেবল সিডি প্লেয়ার, ওয়াকম্যান কিনতে আসছেন কেউ কেউ। অনেকে পুরনো মিউজ়িক স্টিস্টেম সারিয়ে নিতেও আসছেন।
চিত্রগ্রাহকদের কাছে ফিল্ম ক্যামেরা বরাবরই ভীষণ প্রিয়। ডিজিট্যাল ক্যামেরা, স্মার্টফোনের মধ্যেও ফিল্ম ক্যামেরা নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। প্রিন্ট করা ছবিও নতুন প্রজন্ম পছন্দ করছে। ফোন, ল্যাপটপে ছবি বন্দি করে রাখার চেয়ে অ্যালবামে সাজাতে পছন্দ করে তারা। নতুন করে বেড়েছে রেকর্ড প্লেয়ার কেনার আগ্রহ। অনলাইনে নানা ব্র্যান্ডের রেকর্ড প্লেয়ার বিক্রি হচ্ছে। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় ভাইনাল রেকর্ড সংগ্রহ করেন। রীতিমতো খুঁজে খুঁজে পুরনো দিনের রেকর্ড কিনে নিয়ে আসেন। নব্বইয়ের দশকের হিন্দি গানের দুর্দান্ত অ্যালবাম রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এটা তাঁর শখ বলা যায়। রেডিয়ো যেমন প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। অনেক সংস্থা নির্দিষ্ট গানের সম্ভার নিয়ে মিউজ়িক গ্যাজেটস নিয়ে এসেছে, যেগুলোর বিক্রি বেশ ভালই।
মিলেনিয়ালদের কাছে যেটা নস্ট্যালজিয়া, সেটাই নতুন প্রজন্মের কাছে ‘ফ্যাসিনেটিং’। নানা ধরনের সিডি, ক্যাসেট প্লেয়ার বা মিউজ়িক স্টিস্টেমের ডিজ়াইন তাদের আকর্ষণ করে। ছোট থেকেই যারা এআই-এর ব্যবহারে সড়গড়, তাদের কাছে এ সব গ্যাজেটস‘রেট্রো কুল’।
আর একটি বিষয় হল আধুনিক প্রজন্ম পরিবেশ সচেতন। স্মার্ট গ্যাজেটসের অপকারিতা তারা বিলক্ষণ জানে। রেডিয়েশনের ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে তারা ওয়াকিবহাল। রাতের বেলা ঘড়ি দেখা বা অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য বেড সাইড টেবিল ক্লক আবার জনপ্রিয় হচ্ছে। ফোন থাকছে দূরত্বে। হাত ঘড়ি, দেওয়াল ঘড়ির চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফোনেই তো সময় দেখা নেওয়া যায়— এই যুক্তিতে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল হাতঘড়ি। কিন্তু অ্যাকসেসরি হিসেবে ফের ট্রেন্ডিং সেটি। রিস্ট ওয়াচ এখন অন্যতম লাক্সারি গ্যাজেটস।
ঘর সাজানোর জন্য রেট্রো গ্যাজেটস এখন জনপ্রিয়। পুরনো দিনের বড় রেডিয়ো থাকলে, সেটি বার করে বসার ঘর কিংবা প্যাসেজের কোনও অংশে টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখতে পারেন। একই ভাবে পুরনো দিনের মিউজ়িক স্টিস্টেম কিংবা ডায়াল ফোন, ফিল্ম ক্যামেরাও সাজিয়ে রাখা যায়। না-ই ব্যবহার করা গেল সেগুলো, পুরনো স্মৃতি হিসেবেই সাজানো থাক। নতুনরাও দেখুক, কতটা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে।