E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আলফা-রাজত্বে ধৈর্য সহায়

আলফা-প্রজন্ম সামলাতে নাজেহাল মা-বাবারা। একটু ধৈর্যই হতে পারে অভিভাবকদের অবলম্বন

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ০৮ অগস্ট ২০২৬ ০৮:৩০

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।


বাচ্চা কথা শোনে না, মুখে-মুখে কথা বলে, লিখতে চায় না, ধৈর্য নেই, সময়ের আগেই যেন বড় হয়ে যাচ্ছে... এমন অভিযোগ এখন প্রতিনিয়তই অভিভাবকদের মুখে। এই প্রজন্মের বাচ্চাদের বড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবারা। এরা আলফা প্রজন্ম। ২০১০ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে যাদের জন্ম, তারা আলফা। এরা এমন এক পৃথিবীতে এসেছে, যেখানে মোবাইল, আন্তর্জাল রয়েছে। বাইরে খেলা কমেছে, ফোনে খেলা বেড়েছে। ছোট হয়েছে পরিবার। ফলে বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার পরিসরও অনেক কমেছে। এই পরিস্থিতিতে ওদের বড় করতে গেলে মা-বাবাদের পেরেন্টিংয়ের কৌশলও বদলাতে হবে।

কথা না শুনলে

একবার বললে এদের প্রায় কেউই কথা শোনে না। অনেক সময়ে আপনি যে কাজটা করতে বলছেন, সেটা কেন করবে, উল্টে সেই প্রশ্ন করতে পারে। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বললেন, “আসলে সমস্যা লুকিয়ে আমাদের পারিবারিক কাঠামোতে। এখন বেশির ভাগ নিউক্লিয়ার পরিবার। মা-বাবারা কী বলছে, কী করছে, সব দেখছে ওরা। ফলে ওরা মা-বাবাকেও ওদের সমকক্ষ বলে মনে করে। ওদের মতোই সমানাধিকার চায়। এখানেই সীমারেখা টানা দরকার। মা-বাবা যে তার অভিভাবক, সেটা গোড়া থেকে স্পষ্ট করা দরকার। তবে তার মানে কঠোর অনুশাসন ও মারধর করা নয়। আলফা সন্তানরা কিন্তু বড়-ছোট পরোয়া না করে মারে। ফলে তাদের সামনে এমন দৃষ্টান্ত একদম নয়।” বরং ওদের রোজকার জীবনটা ঘড়ি ধরে রুটিন করে দিন। ওরা খুব ভাল রুটিন ফলো করতে পারে। আর ওদের সব প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর দিন। এড়িয়ে যাবেন না।

পড়াশোনায় অনীহা

যেহেতু গোড়া থেকেই ফোনে দেখে, কানে শুনে এরা শিখতে-জানতে অভ্যস্ত, তাই বই পড়া, লেখালিখির প্রতি এদের অনীহা তৈরি হয়। এরা চায়, মা-বাবা পড়া তৈরি করে দিক। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের পড়ুয়ারা আবার সব বিষয়ই যেহেতু ইংরেজিতে পড়ে, তাই বাংলা পড়ায় অনীহা। আবার এরা যদি পরীক্ষায় খারাপ ফল করে, তখন সেটা মেনে নিতে পারে না। রেগে যায়। অনেকে আবার সেটার সঙ্গেই মানিয়ে নেয়। অর্থাৎ পরপর তার খারাপ ফল হলেও সে ভাবে, পড়লেও তার এমনই রেজ়াল্ট হবে। সুতরাং সে এ ভাবেই চলবে। যত বড় হবে, তত এই ধরনের সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। তাই গোড়া থেকেই বাচ্চাকে নিজের পড়া নিজেকে তৈরি করতে দিতে হবে। বিভিন্ন চ্যাপ্টার থেকে প্রশ্নের উত্তর ওকেই লিখতে দিন। এতে ও নিজের মাথা খাটাবে।

সহানুভূতি কম

সম্প্রতি একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয় সমাজমাধ্যমে, সেখানে প্রথম শ্রেণির এক পড়ুয়া তার সহপাঠীকে অনবরত মেরে যাচ্ছে। এগুলোর পিছনে দায়ী মোবাইলের রিলস, গেমস। পায়েল ঘোষ বলছেন, “মা-বাবার অনুপস্থিতিতে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দেওয়া যাবে না। অনেক বাড়িতেই দাদু-ঠাকুমারা বাচ্চাদের সামলাতে না পেরে ওদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। রিলসে ওরা যা দেখছে, সেটাই ঠিক ভাবছে। মা-বাবা তার বিপরীতে কিছু বললে মানতে পারছে না। রিলজগৎই ওদের কাছে সত্যি মনে হচ্ছে। যে রিল ওদের দেখার বয়স হয়নি, তা-ও দেখছে। ফলে সময়ের আগে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। আর এখন অনেকেই গেমে আসক্ত। এই গেমগুলো ভয়ঙ্কর, এখানে খেলা জারি রাখতে খেলোয়াড় ক্রমাগত মেরে চলে। ফলে কাউকে মারার অভিঘাত কতটা গুরুতর তা ওরা বুঝতেই পারে না। আমার কাছে এমন অভিভাবকও এসেছেন, যাঁদের গায়ে বাচ্চারা হাত তুলেছে।” ফলে স্ক্রিনটাইম তখনই দেবেন, যখন সেটা মা-বাবা মনিটর করতে পারবেন। আর বাচ্চারা ফোনে কী দেখছে, সেটা ট্র্যাকার দিয়ে ট্র্যাক করতে পারেন।

আলফাদের এনার্জি বেশি

এরা ভীষণই অ্যাক্টিভ। তাই এদের যদি ঠিক পথে চালনা করা যায়, তা হলে কিন্তু এরা সাফল্য পাবে। এদের ছোট ছোট ক্রাফ্টওয়ার্কে ব্যস্ত রাখুন। আঁকা, উল বোনা, কুইলিং, মডেলিং-এর মতো অজস্র হাতের কাজে ব্যস্ত রাখা যায়। পটারি ওয়ার্কশপ খুব কার্যকর। এদের এনার্জি যাতে ঠিক পথে চালিত হয়, সেই পথটা আপনাকে এঁকে দিতে হবে। দৈনন্দিন কাজও বাচ্চাদের করতে দিন। স্কুলের ব্যাগ গোছানো, বাড়ির বোতলে জল ভরা, নিজের জামা গুছিয়ে রাখা... এমন ছোট ছোট কাজে ব্যস্ত রাখুন।

বিরতিও জরুরি

সপ্তাহের রুটিনটা এমন ভাবে সাজাতে হবে, যাতে ওদের ভাললাগার বিষয়ও সেখানে থাকে। অনেক বাচ্চারই স্কুলের পরে নিয়মিত কোচিং থাকে, অথবা শিক্ষক-শিক্ষিকা পড়াতে আসেন, কিংবা সাঁতারের ক্লাস থাকে। অবসরেও নাচ, গান, আঁকা, অ্যাবাকাস, টেনিস ক্লাস... কিছু না কিছু শিখেই চলেছে তারা। আলফা বাচ্চারা নিজেদের স্পেস সম্পর্কে খুব ওয়াকিবহাল। ফলে ছোটবেলায় কোনও বাচ্চাকে অতিরিক্ত চাপ দিলে একটু বড় হলে ওদের পছন্দের হবি থেকেও মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে। তাই প্রয়োজনে বাচ্চার সঙ্গে কথা বলে দেখুন, ও আসলে কোনটা করতে আনন্দ পাচ্ছে। দরকার হলে নাচ, গান, আবৃত্তি বা আঁকার মধ্যে যে কোনও একটা ক্লাস চালু রাখুন। বাচ্চাকে বিশ্রাম দিন।

রোজ বাচ্চার সঙ্গে মা-বাবাকে ভাল সময় কাটাতে হবে। সে সময়টা নিজেরা নিজেদের কথা ভাগ করে নিন। এতে সন্তানও আপনার সামনে মন খুলে কথা বলবে। আপনি ওর মনের হদিস পাবেন। আলফা বাচ্চারা মানুষজনের সঙ্গে মেশে কম, ফলে এরা মনের কথাও স্পষ্ট বলতে পারে না। এদের কিছু অপছন্দ হলে এরা চেঁচায়, রেগে যায়। কিন্তু কী চায় বলে উঠতে পারে না। তাই ওদের সঙ্গে রোজ কথা বলতে হবে। ওরা যদি মা-বাবার উপরে ভরসা করতে শুরু করে, তখন ওদের সামলানোও সহজ হবে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Parenting Tips Parenting

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy