পুজোর সাজ মানেই নতুন পোশাকের সঙ্গে মানানসই মেকআপ। অষ্টমীর অঞ্জলি থেকে নবমীর রাতের ঠাকুর দেখা কিংবা দশমীর সিঁদুরখেলা— মুখে নানা ধরনের প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবহার চলতেই থাকে। তার উপরে চলে রাত জাগা, অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, রোদ-গরম-ধুলোর মধ্যেই দেদার ঘোরাফেরা। এত কিছুর ফলে পুজোর পরে ত্বক হতে পারে রুক্ষ, অনুজ্জ্বল, প্রাণহীন। তাই পুজোর উৎসব-অনুষ্ঠানের পরেই জরুরি ত্বকের বিশেষ যত্ন নেওয়া, তাকে ‘ডিটক্স’ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তা ছাড়া এই সময় থেকেই বাতাসে শুষ্কতার পরিমাণ বাড়তে থাকে, তাই প্রয়োজন বাড়তি যত্ন।
ত্বকের ডিটক্স সম্ভব?
‘স্কিন ডিটক্স’ এখন রূপচর্চার জগতে বেশ জনপ্রিয়। রূপ বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য বলছেন, শুধু এক বার কোনও দামি সামগ্রী কিংবা বিশেষ ফেশিয়াল করালেই ত্বকের ভিতরে জমে থাকা খারাপ উপাদান বেরিয়ে যাবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ত্বকের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জমে থাকা মেকআপ, অতিরিক্ত তেল, ঘাম ও ধুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা। খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের সময় ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত জল খাওয়া আর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি যদি ত্বকের বিশেষ যত্ন নেওয়া যায়, তা হলে সার্বিক ভাবে তার উন্নতি হবে। রূপবিশেষজ্ঞ মৌসুমী মিত্রর কথায়, “যাঁরা পুজোর সময়ে বহু প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করেন, তাঁরা যদি পুজোর পরে ক’টা দিন মেকআপ না করেন, তা হলে ত্বক বিশ্রাম পাবে, ভাল থাকবে।”
দিন ও রাতে আলাদা যত্ন
ত্বকের যত্নকে দৈনন্দিন কাজেরই একটা অংশ ধরে নিয়ে যদি দিন ও রাতে আলাদা ভাবে যত্ন নেওয়া যায়, তা হলে ত্বকের গুণমান বজায় থাকবে।
দিনের দিকে ক্লেনজ়ার দিয়ে মুখ ধোওয়া এবং হালকা ময়শ্চারাইজ়ার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন মৌসুমী। তবে বারবার মুখ ধোয়া কিংবা জোরে ঘষে ত্বক পরিষ্কার করা ঠিক নয়। এতে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে জ্বালা, লালচে ভাব এবং শুষ্কতা বাড়তে পারে। বাইরে বেরোনোর আগে সানস্ক্রিন ব্যবহারও আবশ্যক।
রাতের দিকে ‘ডাবল ক্লেনজ়িং’-এর উপরে জোর দিচ্ছেন মৌসুমি। ডাবল ক্লেনজ়িংয়ের জন্য প্রথমে হালকা কোনও ক্লেনজ়িং বাম, ক্লেনজ়িং মিল্ক কিংবা মাইসেলার ওয়াটার ব্যবহার করে ত্বক পরিষ্কার করে নিতে হবে। পরে হালকা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলেই ত্বক পরিষ্কার হয়ে যাবে। পাশাপাশি, সপ্তাহে এক দিন করে এক্সফোলিয়েশনও করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে ল্যাকটিক অ্যাসিড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিডের মতো প্রডাক্ট দিয়ে এক্সফোলিয়েশন করার উপরেই জোর দিচ্ছেন মৌসুমী। ব্রণ বাড়লে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বেশি কাজে দেয়। স্বাভাবিক ত্বকে ল্যাকটিক অ্যাসিডই যথেষ্ট।
বাজারচলতি স্ক্রাব ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অবশ্য সাবধান হতে হবে। অ্যাপ্রিকট, ওয়ালনাট স্ক্রাব ত্বকের মৃত কোষ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। কিন্তু কেমিক্যাল পিলিংয়ের মতো কার্যকর নয় কোনও ভাবেই।
স্টিমের ব্যবহার
মাঝেমধ্যে স্টিম নিলে নাকের উপরে থাকা ব্ল্যাকহেডস পরিষ্কার হয়ে যায়। ত্বকের অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাবও নিয়ন্ত্রণে আসে। যদি কম্বিনেশন স্কিন হয় তা হলে পুরো মুখে স্টিম না নিয়ে যেখানে দরকার শুধু সেখানে স্টিম ব্যবহার করা যায়। ব্ল্যাকহেডস তুলে ফেলতে সাকশান যন্ত্র ব্যবহার করা যায়। খুব নরম কোনও কাপড়ের সাহায্যেও পরিষ্কার করে নেওয়া যায়।
মাস্ক-ও উপকারী
বর্তমানে নানা ধরনের মাস্ক পাওয়া যায়। ক্ল্যারিফায়িং মাস্ক, ডি-ট্যান মাস্ক, চারকোল মাস্ক বা এমন কোনও মাস্ক যা ত্বকের অতিরিক্ত তেল, ময়লা পরিষ্কার করে দেয়, তা-ও ব্যবহার করা যেতে পারে পুজোর পরে। তবে যদি কোনও মাস্ক ত্বককে অতিরিক্ত শুষ্ক করে দেয়, তা হলে বিকল্প কিছু ব্যবহার করা যায়। ঘরে তৈরি মাস্কের ক্ষেত্রে মুলতানি মাটির ব্যবহার ভীষণ ভাবে কার্যকর।
সেরাম
সব শেষে ত্বকের চর্চায় অত্যন্ত কার্যকর এক সামগ্রী হল সেরাম। ত্বকের ধরন বুঝে সেরাম বাছাই গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি দিনের বেলা ব্যবহার করলে সানস্ক্রিন আবশ্যক। এই সেরামে সমস্যা হলে নায়সিনামাইড ব্যবহার করা যায়। আবার রেটিনল ত্বকের উজ্জ্বল ভাব ফেরাতে সাহায্য করে। সেরামাইড ত্বকের গুণমান ধরে রাখতে ও কিছু পরিমাণ উন্নত করতে সাহায্য করে। নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী সেরাম বেছে নিন।
খেয়াল রাখতে হবে
- কেমিক্যাল পিলিং হঠাৎ করে শুরু করবেন না। সকলের ত্বকে এই পদ্ধতি সমান কার্যকর নয়। আর পিলিং করলেও অল্প পরিমাণে করতে হয়। না হলে ত্বকে উল্টো প্রভাব পড়ে।
- দীর্ঘক্ষণ স্টিম করলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। রোজ স্টিম নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।
- রূপচর্চা সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি জরুরি পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া।
- এ ছাড়াও জরুরি মুখে মেকআপ নিয়ে ঘুমোতে না যাওয়া। বিশেষত ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা, ‘লং-লাস্টিং’ লিপস্টিক ফাউন্ডেশনের মতো প্রসাধনী ত্বকে দীর্ঘ ক্ষণ থেকে গেলে রোমকূপে তেল ও ময়লা জমতে পারে। ফলে সমস্যা বেড়েই চলে।
আর রোজ ৩-৪ লিটার জল খেতে হবে। তার সঙ্গে ফল। এতে ভিতর থেকে ত্বক ডিটক্স হবে, সুস্থ থাকবে।
ছবি: জয়দীপ মণ্ডল, অমিত দাস; মডেল: নয়নিকা সরকার,শ্রেষ্ঠা চক্রবর্তী