রক্তাল্পতা যেমন সমস্যার, তেমনই শরীরে যদি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বেড়ে যায়, তা-ও সমস্যার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় পলিসাইথেমিয়া। অ্যানিমিয়ায় যেমন শরীরে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়, তেমনই পলিসাইথেমিয়ায় ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। শরীরে লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তৈরি হয়। জেনারেল ফিজ়িশিয়ান সুবীর মণ্ডল বলছেন, “এর ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিন এবং হেমাটোক্রিটের মাত্রা বেড়ে যায়। স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ তখন ব্যাহত হয়।” পলিসাইথেমিয়া তিন ধরনের—
- প্রাইমারি: একে পলিসাইথেমিয়া বেরা বলে। এ ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা অতিরিক্ত লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে শুরু করে। সঙ্গে শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটলেটও বেড়ে যায়। জিন মিউটেশনের কারণে অধিকাংশ সময়ে এই সমস্যা হয়।
- সেকেন্ডারি: অস্থিমজ্জা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু অক্সিজেনের ঘাটতি-সহ নানা কারণে এরিথ্রোপয়েটিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে শরীরে বেশি লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয়। সিওপিডি, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের সমস্যা, জন্মগত হৃদ্রোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া নানা কারণে তা হতে পারে। দীর্ঘ দিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলে বা উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করলেও এই রোগ হতে পারে। কিছু স্টেরয়েড নিলেও এই সমস্যা হয়।
- রিলেটিভ: এ ক্ষেত্রে শরীরে জলের অভাব রক্তে প্লাজ়মার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে আরবিসির ঘনত্ব বেশি হয়।
উপসর্গ
মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, ক্লান্তি, হাত-পা জ্বালা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি প্রাথমিক উপসর্গ। পলিসাইথেমিয়া বেরায় আক্রান্তদের অনেক সময়েই গরম জলে স্নানের পরে তীব্র চুলকানি হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্লীহা বড় হয়ে পেটে অস্বস্তিও হয়। তবে অধিকাংশ সময়ে প্রথম দিকে এর কোনও উপসর্গ থাকে না। সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট), হিমোগ্লোবিন ইত্যাদি স্বাস্থ্যপরীক্ষায় ধরা পড়ে।
চিকিৎসা
শরীরে রক্ত বেশি আছে ভেবে অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। ডা. মণ্ডল বলছেন, “এর ফলে সমস্যা গুরুতর হতে পারে। রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ায় রক্তনালির মধ্যে তা জমাট বাঁধার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস হতে পারে।” রেটিনায় রক্ত চলাচলেও সমস্যা হয়। এই সমস্যা থেকে লিউকেমিয়াও হয়, তবে তা বিরল। এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণ বা উপসর্গের উপরে। পলিসাইথেমিয়া বেরায় ফ্লেবোটমির মাধ্যমে নিয়মিত শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত বার করে দেওয়া হয়। অনেক সময়ে কম মাত্রায় অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়, তা রক্তের ঘনত্ব কমায়। অক্সিজেন থেরাপিরও পরামর্শ দেওয়া হয়। জীবনযাপনের মানোন্নয়নও প্রয়োজন। ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
পলিসাইথেমিয়া তুলনায় কম হলেও তা অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। বরং সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং কারণভিত্তিক চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ রোগী দীর্ঘ দিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।