Advertisement
E-Paper

স্বাধীনতা বনাম নিঃসঙ্গতা! একা ঘর করার একমাত্র অর্থই কি একাকিত্ব? দিশা খুঁজল পাঁচ শিল্পীর পঞ্চ-কথা

স্বাধীনতার ধারণা আছে এক এক জনের এক এক রকম। আবার অন্যকে দেখে কখনও সে ধারণা বদলেছে। কারও কাছে সংসারই হল স্বাধীনতার ঠিকানা। কেউ বলেন, একা থাকলেই জয় করা যায় পরাধীনতা। স্বাধীনচেতা কয়েক জন শিল্পীর খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম। তাঁরা স্বাধীন না কি নিঃসঙ্গ? কে কী মনে করেন?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০২৬ ১০:৩১
(বাঁ দিক থেকে) রাইমা, শ্রীলেখা, রুদ্রনীল, অনির্বাণ এবং ইন্দ্রনীল।

(বাঁ দিক থেকে) রাইমা, শ্রীলেখা, রুদ্রনীল, অনির্বাণ এবং ইন্দ্রনীল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কেউ স্বাধীনতা চান বলে একা থাকেন। কেউ আবার নিঃসঙ্গতাকে ভয় পেয়ে নিজের ইচ্ছের সঙ্গে আপস করে বেছে নেন বিবাহিত জীবন। সমাজের প্রচলিত ধারণা যেন এমনই— একলা থাকলে স্বাধীনতা পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে নাকি জুড়ে থাকে নিঃসঙ্গতা। কিন্তু স্বাধীনতা পেতে গেলে কি সত্যিই নিঃসঙ্গতার মাশুল গুনতে হয়?

সময় বদলেছে। একটা সময়ে অবিবাহিত হয়েও যৌথ পরিবারের অংশ হয়ে থাকতেন অনেকে। তাঁরা স্বাধীন ছিলেন বটে, কিন্তু একলা ছিলেন না। বরং কখনও কখনও সেই পরিবারের মধ্যেই তাঁরা খানিকটা কোণঠাসা হতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে সেই ছবিটা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সময়। বিয়ে না করেও নিজের মতো করে জীবন সাজানো, একা ঘুরে বেড়ানো, পছন্দের কাজ বেছে নেওয়া, নিজের সময় ও ব্যক্তিগত পরিসরকে গুরুত্ব দেওয়া— সবই এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক। তাঁরা দাম্পত্যের বন্ধনে আবদ্ধ নন। কিন্তু তাঁরা স্বাধীন না কি নিঃসঙ্গ? কে কী মনে করেন? এই সময়ের স্বাধীনচেতা কয়েক জন শিল্পীর খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।

রাইমা সেন

আমি জীবন নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। এই স্বাধীনতাকে আমি খুবই গুরুত্ব দিই। ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা, কাজ করার স্বাধীনতা, পছন্দমতো বাঁচার স্বাধীনতা। আমার কাছে কোনও দিনও সম্পর্ক সুখের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়নি। আমি মনে করি, প্রত্যেকটা নারীর তাঁর জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। যে জীবনে তিনি সবচেয়ে বেশি সুখী। আমি নিজের জন্য এই জীবনটাকেই বেছে নিয়েছি। আর নিঃসঙ্গতা? সেই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য পুরুষের দরকার পড়ে বা বিবাহের বন্ধনে নিজেকে আটকে ফেলার দরকার পড়ে বলে মনে করি না।

এমন নয় যে, বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত খুব সচেতন ভাবে নিয়েছি। জীবনের মোড় ঘুরেছে সে ভাবে। আর আমি তাতে বড়ই সুখী। আসলে সব সময়েই বড় স্বাধীনচেতা ছিলাম। অনেকে মনে করেন, বিয়েই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। আমার মনে হয় না, সেই রাস্তা সকলের জন্য উপযুক্ত। যতটুকু শূন্যতা রয়েছে, তা আমার কাজ, পরিবার, পোষ্য, বন্ধুবান্ধবই পূরণ করে দেয়। ফলে আপসের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

রুদ্রনীল ঘোষ

বলব না যে, আমি নিঃসঙ্গ। এই শব্দটা উচ্চারণ করলেই কেমন জানি দুঃখের বেহালা বেজে ওঠে। তা কিন্তু নয়। প্রত্যেকটি সময়ের আলাদা আলাদা দাবি রয়েছে। আমি সময়ের থেকে সেই বন্ধুত্ব চাইছি, যেখানে আমি ‘পরাধীন’ হতে পারব। তখন অত্যন্ত স্বাধীন ভাবে আমি পরাধীনতাকে বেছে নেব।

দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়। ফলে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে নানা কিছু আমদানি করছি আমরা।অন্যান্য দেশে স্বাধীনতার যে অর্থ, সেটাকে নিজেদের ভেবে ফেলছি। ফলে তাদের দেশের বিষয়গুলি না বুঝেই আমাদের ‘স্বাধীনতা ভাবনা’-র তালিকায় জায়গা দিয়ে ফেলছি অবচেতনে। অন্য দেশের আদবকায়দা আয়ত্ত করে ফেলছি। তাতেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কিন্তু নিয়মকানুন মেনে চলার মধ্যেও তো স্বাধীনতা রয়েছে! বিবাহ প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও স্বাধীনতা রয়েছে। এটি অত্যন্ত সম্মানজনক একটা সম্পর্ক। আমি যদি সেই সম্পর্ককে সম্মান দেওয়ার যোগ্যতা না রাখি, তা হলে বিয়ে করা উচিত নয়। অবশ্যই এটা ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমার তো মনে হয়, স্ত্রীর বকুনি খাওয়ার মধ্যে স্বাধীনতা রয়েছে। বিবাহের তথাকথিত পরাধীনতার মধ্যেও স্বাধীনতা রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করবেন, তা হলে আমি কেন বিয়ে করিনি। আমি সময়ের অপেক্ষায় রয়েছি। এখন আমার কাঁধে অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ। আর সেই কাজের ভারে ন্যুব্জ হয়ে, কপালে ভাঁজ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই না সঙ্গিনীর কাছে। আমার কাজের চাপ, আমার অস্থিরতা তাঁর উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। যে দিন কাজগুলি গুছিয়ে আনতে পারব, সে দিন আমি ওই স্বাধীনতার পথে হাঁটব। আমি সম্পূর্ণ ভাবে বিবাহ নামক এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। সংসার করার স্বাধীনতার দিকে আমি মুখিয়ে রয়েছি।

ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী

একা থাকার সঙ্গে একাকিত্বের সম্পর্ক আছে কি না, জানি না। বিবাহিত জীবনেও মানুষ ভয়ানক একা থাকতে পারে, আবার একলা জীবনেও খুব পরিপূর্ণ থাকতে পারে। মানুষের একা থাকা বা সংসারে থাকা সব সময়ে সচেতন সিদ্ধান্তের কারণে ঘটে না, বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতেও ঘটে। এ বার এই বাস্তবটার সঙ্গে কী ভাবে তারা মানিয়ে নিচ্ছে, সেটাই দেখার। আমার মনে হয় না একা থাকলে বিশেষ কোনও একাকিত্ব তৈরি হয়, যদি না তার সম্ভাবনাগুলি বোঝা যায়। আসলে একা থাকা হোক বা বিবাহিত থাকা হোক, মানুষ একটা ছোট্ট দ্বীপের মধ্যেই থাকে।

পারিবারিক জীবনে না থাকলে এক প্রকার স্বাধীনতা তো থাকেই। তবে স্বাধীনতা সব সময়ের আনন্দের না-ও হতে পারে। স্বাধীনতা তখনই আনন্দের, যখন তা একটা বন্দিদশার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। যে জীবন পারিবারিক নয়, সেখানে স্বাধীনতা কখনও কখনও বিপজ্জনক হয়ে যায়। সেই স্বাধীনতাকে সামলানোর ক্ষমতা সবার এক নয়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনেককে দেখেছি, যাঁরা ওই স্বাধীনতা নিয়ে কী করতে হয়, সে বিষয়ে অবহিত নন। সেটা তখন যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়ায়। আসলে কোনও কিছুই অবিমিশ্র অবস্থার সৃষ্টি করে না।

শ্রীলেখা মিত্র

নিঃসঙ্গতা আর স্বাধীনতা, এই দুই বিষয়ই আসলে প্রেক্ষিত-নির্ভর। আমার মনে আছে, ১৫ অগস্ট, স্বাধীনতা দিবসের দিনই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে শুধু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সে দিন আমি স্বাধীন হব— এই ভাবনা থেকে। কারণ, সম্পর্কে থেকে আমি নিঃসঙ্গ ছিলাম। আজ আমার যে একা থাকা, দ্বিতীয় বার বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত, তা আসলে পরিপার্শ্বকে দেখেই নেওয়া। এমন অনেককে দেখেছি, যাঁরা একটা বিয়ে ভাঙার পর অন্য বিয়ে করেছেন, কিন্তু তাতেও যখন সুখ আসে না, তখন হয়তো সমাজের ভয়ে তাঁরা বোঝাপড়া করে নিয়েছেন। সেটা আমি চাইনি। বরং স্বাধীনতা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেবল সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, সব দিকে। বলার স্বাধীনতা, চলার স্বাধীনতা বড্ড দরকারি আমার জন্য।

মানুষ পরাধীন থেকেও নিজেকে স্বাধীন বলে মনে করেন, তা আমি চাই না। আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীন হতে চাই, তাই দ্বিতীয় বার বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হইনি। তবে নিঃসঙ্গতাটা তার একটা মাশুল বলতে পারি। সেই মাশুল আমি দিচ্ছি। কিন্তু অনেকে হয়তো সম্পর্কে থেকেই সেই মাশুল গুনছেন। ফলে তাঁরা স্বাধীনও নন, আবার নিঃসঙ্গও। আমি স্বাধীন হয়ে নিঃসঙ্গ। এই জীবনটা আমি নিজে বেছে নিয়েছি।

অনির্বাণ চক্রবর্তী

বিয়ে করেছিলাম আনন্দ করেই। সঙ্গীর সঙ্গে সংসার পাতব বলেই। কিন্তু বিচ্ছেদের পর আর বিয়ে করিনি। ইচ্ছে হয়নি আর। সম্ভবত এই জীবনটার সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। এই জীবনটাই সঙ্গী হয়ে গিয়েছে। ফলে নিঃসঙ্গতার আসেনি। যদি একা থাকাটা পীড়াদায়ক হয়ে উঠত, তা হলে নিশ্চয়ই বিয়ে করতাম। বাধা তো ছিল না কোনও। এখনও নেই। কিন্তু কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই আমি ভাল আছি। স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাধীন আছি। নিঃসঙ্গ নই। একলা মনে হয়নি নিজেকে। আসলে আমার বন্ধুভাগ্য বড়ই ভাল। তাঁরাই আমার পরিবার। মনের কথা বলার মানুষ আছে আমার জীবনে। আর তার বাইরে?

ওইটুকু সময়ের দাবিদার খোদ আমি। বই পড়া, ঘুরতে যাওয়া, গান শোনা— এগুলো করার জন্যও তো সময় চাই। আর যে পেশার সঙ্গে আমি যুক্ত, তার চর্চার জন্যও তো একা থাকাটা দরকার পড়ে। আমি বলছি না, এটাই আদর্শ। কত শত মানুষই তো দোকা থেকে ভাল আছেন, সংসার পেতে আনন্দে আছেন। তাঁদের স্বাধীনতা সেটাতেই। তাঁদের সুখ সেটাতেই। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টোটা। বন্ধনে না থেকে আমি স্বাধীন, আমি সুখী। আমি নিজেকে একা গুছিয়ে নিতে পেরেছি।

Independence Day Raima Sen Rudranil Ghosh Sreelekha Mitra Anirban Chakrabarti Aniruddha Roy Chowdhury

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy