ইয়ে জেন জ়ি জেন জ়ি ক্যায়া হ্যায়, ইয়ে জেন জ়ি জেন জ়ি…
নব্বইয়ের দশকের বিখ্যাত হিন্দি গানের সুরটা রাখলাম। ভাষাটা কিঞ্চিৎ বদলালাম। এ বার এমন করেই যদি উপরের কথাগুলো গেয়ে উঠি, এই সময়ের আবেগ ঠিকঠাক বোঝা যাবে। চারিদিকে এখন শুধুই ‘জেন জ়ি’ শব্দবন্ধের জয়-জয়কার! আমাদের অভ্যেসের আবহে কিন্তু এই পরিচিতিটি ভাসমান ছিল, আমরা অনেকেই যা আগে খতিয়ে দেখিনি। এখন ভারতের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দুর্দমনীয় আবেগ এবং অদম্য লড়াকু মনোবৃত্তির পরিচয় দিয়ে সাঙ্ঘাতিক এবং ঐতিহাসিক একটা রাজনৈতিক আন্দোলন সফল করে ফেলার পর সবাই নড়েচড়ে বসেছি।
অনেককেই বলতে শুনছি— ‘জেন জ়ি এমন কিছু অ্যাচিভ করতে পেরেছে, যা আগের প্রজন্মগুলো পারেনি।’ কেন এমন হল? এটা কি নেহাত কাকতালীয় বা সমাপতন? নাকি সত্যিই ইংরেজি জ়েড অক্ষরে চিহ্নিত করা হচ্ছে যে প্রজন্মকে, তাদের বিশেষ কোনও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা এ রকম দুরূহ লক্ষ্য অর্জনে তাঁদের পৃথক ক্ষমতাসম্পন্ন করে তুলেছে? আমি যখন থেকে নিজের গান প্রকাশ শুরু করেছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত টানা, আমার শ্রোতামণ্ডলী নবীন প্রজন্মই থেকেছে। এখনই যদি স্পটিফাইয়ে কোন বয়সের শ্রোতা বাংলা রক শুনছেন খোঁজ নিই, দেখব সেখানে ১৮-১৯দের প্রাধান্য। এ হিসেব সারপ্রাইজ়িং নয় কারণ রক কনসার্টগুলি নিয়মিত হাউজ়ফুল করে দিচ্ছেন তো এরাই। আপাতত এই বয়সি মানুষেরা ‘জেন জ়ি’ নামেই পরিচিত।
সালের হিসেবে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ অবধি যাঁরা জন্মেছেন, তাঁরাই জেন জ়ি। অর্থাৎ এই মুহূর্তে যাদের বয়স ১৪ থেকে ২৯। আমরা ঠিক এ ভাবে জন্মসালের নিরিখে ভাগাভাগিতে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমরা ভাগ করতাম বয়স অনুযায়ী। ভাবতাম বয়সেরই নিজস্ব ধর্ম থাকে। এখন বয়সের ধর্মের পাশাপাশি কোন সময়কালে জন্ম— সেটাও মেপে দেখা হচ্ছে। ফলে প্রতিটি প্রজন্মের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সবেমাত্র বিপুল সাফল্য অর্জন করা ছাত্র আন্দোলনটির দিকে তাকিয়ে কেউ যদি জেন জ়ি-র তত্ত্ব-তালাশ করতে চান, তিনি এদের কেয়ার না করা সারাক্ষণ বিন্দাস থাকা চরিত্রটি সর্বাগ্রে দেখতে পাবেন। এখন চরিত্র-চিত্রণে এই যে ভাষার প্রয়োগ করলাম, সেটি দিয়ে এই মেজাজ ঠিক করে ফোটানো যাবে না, কারণ এদের ভোকাবুলারিই আলাদা। যে অভিব্যক্তি এদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে, বা শরীরী বিভঙ্গের ছোট-ছোট মোচড়ে বা আঙুলের ইশারায় যে রকম বার্তা-বিনিময়ে এরা অভ্যস্ত— সেগুলি ওদের ব্যবহার করা শব্দ এবং বাচনভঙ্গির সঙ্গে এতটাই সম্পৃক্ত যে আলাদা করে সে মেজাজ ফুটিয়ে তোলা দুষ্কর। পুরনো মূল্যবোধে এ সবের অনেক কিছুই অশালীন ঠেকতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্লীল-অশ্লীলের সংজ্ঞাও তো বদলায়। মন যত মুক্ত হয়, সব কিছু নিয়েই কৌতুক করার ক্ষমতা বা হাসাহাসির অভ্যেস তত বাড়ে। জেন জ়ি কোনও একটি নির্দিষ্ট সমাজের প্রচলিত সংস্কারগুলোকে নিছকই আবদ্ধতা মনে করে গোটা বিশ্বের দিকে তাকায়। এদের ব্যবহারিক সংস্কৃতিতে তাই কোনও পাসপোর্টের বালাই নেই। এরা কতটা সূক্ষ্ম বা কতটা স্থূল, সেটা আমরা ঘরের মধ্যে তাকিয়ে মাপতে পারব না। জেন জ়ি-কে বুঝতে গেলে প্রথমেই খুলে দিতে হবে মনের জানালা, ত্যাগ করতে হবে প্রথাগত ধ্যান-ধারণা।
খামখেয়ালি, কিছুরই না তোয়াক্কা করা সত্তাদের নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে অসুবিধে তো হওয়ারই কথা। বন্ধুবান্ধবের কাছে জেন-জ়ি সহকর্মীদের নিয়ে কাজের বিড়ম্বনা কানে আসত। একজন বন্ধু এই সে দিনই বলছিলেন— ‘সব কিছু নিয়েই খিল্লি করার মারাত্মক প্রবণতা এদের!’ কিন্তু এর পর একটা আন্দোলন ঘটে গিয়েছে। সেই বন্ধুই এখন বলছেন, ‘ওদের ইচ্ছেশক্তিকে নম্বর না দিয়ে উপায় নেই!’ আমি দুইয়ে-দুইয়ে চার করার চেষ্টা করছি। সব কিছু নিয়েই রসিকতা করতে পারে যারা, তাদের রসিকতার বর্মেই কি সহনশীল হয়ে গেল মিছিলের মধ্যে গায়ে এসে পড়া পুলিশি লাঠির বাড়ি বা কাঁদানে গ্যাসের উৎপাত? কোথাও লাঠি হাতে এগোনো বাহিনীকে স্তব্ধ-অচল করে দিতে তারা সমস্বরে গেয়ে উঠেছে জাতীয় সঙ্গীত। কখনও আবার ব্যারিকেড উঠিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছে। কখনও মিছিলের অগ্রগমন রুখতে লাগিয়ে দেওয়া মোটা রশিকে দু’দিক থেকে টেনে ‘টাগ অফ ওয়র’ খেলেছে। কখনও বা জল কামানের জলে ‘রেন ডান্স’ করতে দেখা গিয়েছে তাদের।
বেশির ভাগ সময়েই ওদের হাতে ধরা সেলফোনকে ওরা অস্ত্র বানিয়েছে। মুম্বইয়ে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হুডি পরা যে মেয়েটি গ্রেফতারির মেমো দেখতে চেয়ে অপহৃতদের ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া পুলিশ ভ্যান থামিয়ে দিল, সে একহাত ভ্যানের সামনে অবলীলায় ঠেকিয়ে অন্য হাতে ধরে ছিল মোবাইল। তার সাক্ষাৎকারে জানলাম— ‘সমানে ইনস্টাগ্রামে স্টোরি আপলোড করাও একটা স্ট্র্যাটেজি হতে পারে।’ কতক্ষণ তার এই অবরোধ চলছে, তার হিসেবও যেমন সে রাখতে পেরেছে একের পর এক ছবি তুলে (ঠিক টাইমফ্রেম), তেমনই আটকে দিতে পেরেছে নিজের উপরেও সম্ভাব্য পুলিশি জোর-জবরদস্তিকে। কারণ ক্যামেরা তাক করা থাকলে গ্রেফতারির মেমো যাদের কাছে মজুত নেই, তারা আর কতটা বেআইনি কাজের সাহস পাবে! এ সব দেখেশুনে স্পষ্ট বুঝলাম, শুধু নতুন ভাবভঙ্গি আর ভাষা নয়, জ়েড প্রজন্ম প্রবল জেদে প্রযুক্তির হাত ধরে আমদানি করে ফেলেছে পৃথিবীর পথে একলা হাঁটার নতুন ফর্মুলাও।
আগের বাক্যের ‘একলা’ শব্দটিকে একটু গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে। ইনস্টাগ্রাম অচিরেই হয়ে উঠেছে জেন জ়ি-র হেড কোয়ার্টার। সেখানে তারা নিজেদের একাকিত্ব ভাগ করে নিচ্ছে সমমনস্কদের সঙ্গে। কিন্তু অনলাইন সামাজিকতার সীমাবদ্ধতা তো থাকবেই। সেই দিক থেকে এরা একা। তবে সেই একাকিত্ব কতটা ক্রিয়েটিভ আর প্রোডাক্টিভ করে তোলা যায় সে বিষয়েও মননশীল। এ ব্যাপারে অকাতরে ওদের সাহায্য করছে ইন্টারনেট।
আজকের দুনিয়ায় নিজের পছন্দসই বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ইন্টারনেট এমন পর্যায় অবধি দরজা খুলে দিতে পারে, যার ব্যাপকতা অতুলনীয়। জেন জ়ি-দের সঙ্গে মিশে দেখুন। সময়-সময় ওদের জ্ঞান বা বোধের গভীরতা আপনাকে চমকে দেবে। যেমন আমায় বারবার চমকে দিয়েছে আমার ১৫ বছরের পুত্র রূপ আরোহণ প্রমিথিয়াস। কোথাও না থেমে পছন্দের বিষয় সম্পর্কে সব কিছু জেনে নেওয়ার একটা প্রবণতা দেখেছি ওর মধ্যে। ছোটবেলায় ওকে একটা ডাইনোসর পুতুল কিনে দিয়েছিলাম। জিনিসটা ওর এত পছন্দ হয়ে যায় যে মোটামুটি দশ বছর বয়সের মধ্যেই ডাইনোসর-বিষয়ক জ্ঞানগম্যিতে সে এমন জায়গায় পৌঁছল, যে সব রকম ডাইনো প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম গড়গড়িয়ে বলতে লাগল। এর সঙ্গেই তাল মিলিয়ে আর-একটা জিনিস দেখেছি। রূপ খুব পরিবেশবান্ধব। কী করলে পার্থিব আবহাওয়ার লাভ হয়, কীসে ক্ষতি— এ সব ব্যাপারে একেবারে টনটনে জ্ঞান। ওকে জিজ্ঞেস করতে জানাল— এটাও নাকি জেন জ়ি-দেরই স্পেশ্যালিটি। পৃথিবী বা প্রকৃতির আয়ু কী ভাবে আর-একটু দীর্ঘায়িত করা যায়, এ সব নিয়ে ভীষণ কনসার্নড ওরা।
এখন যেহেতু জেন জ়ি নিয়ে চর্চার পরিধি বেড়েছে, ওদের ভাল দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিছু সমালোচনাও যে ধেয়ে আসবে, তা বলাই বাহুল্য। ওদের প্রদর্শিত অ্যাক্টিভিজ়মকে অনেকেই দাগিয়ে দিচ্ছেন ‘পারফর্মেটিভ অ্যাক্টিভিজ়ম’ হিসেবে। সে জিনিসটা কী? মেটা প্ল্যাটফর্মে কিংবা ইউটিউব শর্টস-এর দুনিয়ায় কার কতটা পদচিহ্ন পড়ল, কে কতটা বশ করতে পারল অ্যালগরিদমকে— এটাই নাকি ওদের আসল উদ্দেশ্য, সমাজ সংস্কার নয়। প্রতিবাদের ধরন যদি সব শালীনতা বা বৈধ পদ্ধতিকে কাঁচকলা দেখিয়ে এক ধরনের অ্যানার্কি তৈরি করার দিকেই এগোয়, কতটা এফেক্টিভ থাকবে তা কালের বিচারে— সেই প্রশ্ন উঠছে। আমি বলতে পারব না কী হলে কী হবে, বা কী করা উচিত, কী নয়। তার একটা বড় কারণ, আমি ঔচিত্যে বিশ্বাস করি না। অন্য কারণ, আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের লেখা— ‘আমরা করি ভুল— অগাধ জলে/ ঝাঁপ দিয়ে যুঝিয়ে পাই কূল’ অথবা একই নিঃশ্বাসে মনে পড়ে যায় কাজী নজরুলের কবিতাও— ‘সবাই যখন বুদ্ধি জোগায়/ আমরা করি ভুল!/ সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব/ আমরা ভাঙি কূল।’
তাই সমালোচনা করব না। এটাই আমার সচেতন সিদ্ধান্ত। নজরুলের ‘ছাত্রদলের গান’-এ কবি স্পষ্টতই বলেছেন— এ বয়সের অলক্ষ্মী হওয়ার ব্রতের কথা। রক সঙ্গীতও পুরনো কাউকে পরোয়া করতে শেখায় না। আমি কিছু বললেও তা শোনার প্রয়োজন নেই। পরিবেশবান্ধব, পৃথিবীবান্ধব, মানবতার পূজারি এই ছটফটে প্রজন্ম নিজের আনকোরা নতুন নিয়মেই এগিয়ে চলুক। প্রতিবাদীর তথাকথিত পাঞ্জাবি-পাজামাকে তো বটেই, এমনকি টিশার্ট-জিনসকেও একঘেয়ে প্রতিপন্ন করে ওরা এই যে স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান বা হাল্ক সেজে আজ নেমে পড়তে পারছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে, তার মধ্যে আমি খুঁজে পাচ্ছি অত্যন্ত পরিণত এক আন্তর্জাতিক রসবোধ। কালে কালে জেন জ়ি-রও বয়স বাড়বে। পরবর্তী প্রজন্ম, জেন আলফা হয়তো আরও আধুনিক স্বপ্ন নিয়ে সামনে আসবে। তবুও জেন জ়ি আমাদের ভালবাসায় চিরদিন বেঁচে থাকুক উপকথার গোলিয়াথের সঙ্গে অসম যুদ্ধজয়ী ডেভিডের প্রতীক হয়ে। যদিও বয়সের ব্যাপার নয়, তবুও আমার মনে পড়ে যাবে আঠেরো বছর বয়সের কথা। জেন জ়ি-র এই হার না মানা মানসিকতাকে স্মরণে রেখেই আমি হয়তো গেয়ে উঠব ব্রায়ান অ্যাডামস-এর ‘এইট্টিন টিল আই ডাই’। অথবা পড়ে শোনাব কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই লাইনগুলো— ‘এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়/ পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে/ এ বয়সে তাই নেই কোনও সংশয়/ এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে॥”