একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাওয়া, সিঁড়ি ভাঙার সময়ে পায়ে জোর না পাওয়া, ভারী জিনিস তুলতে না পারা— এগুলো বয়স বাড়ার স্বাভাবিক লক্ষণ বলে মনে করা হয়। আবার যাঁরা জিমে যাচ্ছেন, ঘাম ঝরাচ্ছেন, তাঁরা ওজন কমছে দেখে ধরেই নেন মেদ ঝরছে। কিন্তু অনেক সময়েই মেদের বদলে মাসল লস হয়, পেশির শক্তি কমে যায়, যার ফলে ওজন কমে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সারকোপেনিয়া অর্থাৎ পেশিশক্তি কমে যাওয়া।
সারকোপেনিয়া কী?
এতে কঙ্কালপেশি অর্থাৎ যে পেশি হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে হাঁটাচলা, ওঠা-বসা, জিনিস তোলা... শরীরের বিভিন্ন নড়াচড়ায় সাহায্য করে, তার শক্তি কমে যায়। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি হয়। তবে বার্ধক্য এর একমাত্র কারণ নয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অপর্যাপ্ত পুষ্টি, অসুস্থতা কিংবা শয্যাশায়ী থাকার কারণেও পেশির শক্তি কমতে পারে। প্রসঙ্গত, এ দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে সারকোপেনিয়ার প্রবণতা। জেনারেল ফিজ়িশিয়ান সুবীর মণ্ডল বলছেন, “তিরিশ বছরের বয়সের পর থেকে এমনিই মাসল মাস কমতে শুরু করে। প্রতি দশ বছরে অন্তত ৩-৫ শতাংশ পেশির ভর কমে। এর প্রধান কারণ লাইফস্টাইল। অধিকাংশই আজকাল একটানা দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করে। বাচ্চারা আগের মতো মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে না। ক্রমশ ট্রেন, বাসের ব্যবহার কমিয়ে মানুষ গাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তার সঙ্গে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং চটজলদি ওজন কমানোর জন্য ডায়েট ও অতিরিক্ত শারীরচর্চার প্রবণতা। এ সবের ফলেই বাড়ছে সারকোপেনিয়া।”
চেহারার গড়ন দেখে পেশিশক্তি বোঝা যায় না। ফিটনেস প্রশিক্ষক অরিজিৎ ঘোষাল বলছেন, “শুধু রোগা চেহারা দেখেই সারকোপেনিয়া ধরে নেওয়া যেমন ঠিক না, তেমনই শরীরে মেদ বেশি থাকলেই যে পেশি শক্তিশালী হবে, এমনও নয়।” সাধারণত হাতের মুঠির জোর, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, হাঁটার গতি ইত্যাদির দ্বারা পেশিশক্তি নির্ধারণ করা হয়। প্রয়োজনে হ্যান্ড-গ্রিপ ডায়নামোনিটারের সাহায্যে পেশির জোর, গুণমান মূল্যায়ন করা হয়।
সমস্যার কারণ
বয়স, জীবনযাত্রার ধরন, হরমোনের পরিবর্তন... এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। পেশি গঠন ও তা মেরামতের জন্য প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। রোজকার খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে পেশি ক্ষয় হতে পারে। অরিজিৎ বলছেন, “নিরামিষাশীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি। দীর্ঘ দিন অপুষ্টিতে ভোগা, খাবারে বৈচিত্রের অভাব, ক্ষুধামান্দ্যর ফলে কম খাওয়াদাওয়া করলে এর ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য ক্র্যাশ ডায়েট করলেও পেশির ক্ষয় হয়।” রক্তাল্পতা, থাইরয়েড, স্নায়ুজনিত রোগ, ভিটামিনের ঘাটতির কারণেও এই সমস্যা হয়। জেরেন্টোলজিস্ট ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী বলছেন, “দীর্ঘ দিন হার্ট, কিডনি, ফুসফুসের সমস্যা থাকলে পেশির শক্তি কমে যায় অনেকটা। ডায়াবিটিস বা অতিরিক্ত ওজন কমাতে জিএলপি-ওয়ান জাতীয় যে ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও মাসল লস হয়, যা থেকে সারকোপেনিয়া হতে পারে।” মেয়েদের মেনোপজ় এবং ছেলেদের অ্যান্ড্রোপজ়ের সময়ে ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া পেশির স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া, পেশিকে নিয়মিত কাজে না লাগালে তার শক্তি ও আকার কমে। বয়স বাড়লে নতুন পেশি তৈরি, শারীরচর্চার পরে তার পুনর্গঠনের ক্ষমতা কমে আসে। দীর্ঘ দিন শয্যাশায়ী বা হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সমাধানের উপায়
সারকোপেনিয়ার ফলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পড়ে যাওয়া ও হাড় ভাঙার মতো আশঙ্কা থাকে। তবে পেশির শক্তি কমে গেলে তা ফের বাড়ানো সম্ভব। তার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় পুষ্টি, পর্যাপ্ত শারীরচর্চা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
- শারীরচর্চা: এ ক্ষেত্রে স্ট্রেংথ ট্রেনিং জরুরি। অরিজিৎ বলছেন, “রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড এক্সারসাইজ় পেশির শক্তি বাড়াতে পারে। হালকা ওজনের ডাম্বেল তোলা, স্কোয়াট, লাঞ্জেস, পুশ আপ, পুল আপ, টুইস্ট, স্টেপ আপ ইত্যাদি করা যেতে পারে। আইসোমেট্রিক হোল্ড এক্সারসাইজ় উপকারী। মেনোপজ় বা অ্যান্ড্রোপজ় শুরু হওয়ার আগে থেকেই স্ট্রেংথ ট্রেনিং শুরু করা ভাল।” তবে সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিশেষজ্ঞের নজরদারি ছাড়া বাড়িতে বা জিমে একা শারীরচর্চা করবেন না। এতে পেশির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
- খাদ্যাভ্যাস: খাবারে প্রোটিনের মাত্রা বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যক্তির শরীরের যা ওজন, তার সমপরিমাণ প্রোটিন নেওয়া জরুরি। তবে একবারে নয়, সারা দিনে অল্প অল্প করে প্রোটিন খেতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যায়। সঙ্গে দরকার ভিটামিনস ও খনিজের মাত্রা ঠিক রাখা।
- স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ান, হাঁটাচলা করুন। সঙ্গে দরকার পর্যাপ্ত ঘুম। স্ট্রেস বাড়লে মাসল লস হতে পারে। তাই স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তিন সপ্তাহ অন্তর ভিটামিন ডি, বি ১২ এবং রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করাতে হবে। পেশি বাড়াতে পারে এমন ওয়েলনেস ওষুধ এখন সহজলভ্য। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিতে পারেন।
শারীরচর্চা অপরিহার্য হলেও, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস বা অস্থিসন্ধির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে সারকোপেনিয়া থাকা সত্ত্বেও সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব।