মিটিং চলছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ যা কথা হল, তা ঝটপট সবার আগে টাইপ করে নিলেন মোবাইলে। কিংবা কারও সঙ্গে জরুরি বিষয়ে কথা বলছেন, মনে হল কিছু কথা না লিখে নিলে ভুলে যাবেন, সেখানেও ত্রাতা হল মোবাইল। নোট প্যাড জাতীয় কোনও অ্যাপের ডিজিটাল খাতায় আঙুলের পেন দিয়ে লিখে নিলেন দরকারি কিছু পয়েন্ট। এমন তো হামেশাই হচ্ছে। প্রযুক্তির দৌলতে আর সঙ্গে খাতা-পেন বইতে হয় না। কিন্তু গবেষণা বলছে, এই যে লেখার পদ্ধতির বদল তা মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলছে ভিন্ন ভাবে।
ডিজিটাল যুগে মিটিং, ক্লাসরুম বা নিত্যদিনের কাজের তালিকায় কাগজ-কলমের জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ। তবে ২০২৪ সালের একটি গবেষণা বলছে, দ্রুত তথ্য লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে টাইপিং বেশি সুবিধাজনক হতেই পারে, তবে কাগজের উপর কলম দিয়ে লিখলে তা অন্যরকম প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কে।
কী বলছে ২০২৪ সালের গবেষণা?
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছিল এ সংক্রান্ত গবেষণালব্ধ একটি প্রতিবেদন। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পড়ুয়ার উপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পড়ুয়াদের প্রত্যেককে কিছু লেখা কলম দিয়ে কাগজে লিখতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে কিবোর্ডেও টাইপ করতে বলা হয়েছিল। আর পড়ুয়াদের মস্তিষ্কের উপর নজর রাখা হয়েছিল উচ্চ প্রযুক্তির ইইজি সেন্সরের মাধ্যমে। ওই সেন্সর মস্তিষ্কের ইলেকট্রিক তরঙ্গ ও মস্তিষ্কের সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করার কাজ করছিল।
ফলাফলে কী দেখা গেল?
গবেষণায় দেখা যায়, হাতে লেখার সময়ে শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় অংশ আর চোখের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলির মধ্যে যোগাযোগ বা নিউরাল কানেক্টিভিটি বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, হাতে লিখলে চোখ, আঙুল এবং মোটর নার্ভের মধ্যে একরকম যোগাযোগ তৈরি হয়। কলম দিয়ে প্রতিটি অক্ষরের আলাদা আকৃতি তৈরি করার সময় সূক্ষ্ম মোটর স্কিল এবং স্পর্শ অনুভূতি এক সঙ্গে কাজ করে, যা স্নায়ুকে বেশি উদ্দীপিত করে।
অন্য দিকে, কি প্যাডে টাইপ করলে মস্তিষ্কের সীমিত অংশ সক্রিয় হয়। তার কারণ, কি-বোর্ডে টাইপ করার সময়ে প্রতিটি বোতামে একই ধরনের চাপ দিতে হয়। আঙুলের নড়াচড়া প্রায় একই রকম থাকে। ফলে কাজ দ্রুত হলেও তা মস্তিষ্কে কোনও নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে না।
হাতে লেখাই মস্তিষ্কের জন্য বেশি উপকারী?
গবেষকদের মতে, কোনও বিষয়ে পড়াশোনা করতে হলে বা বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চাইলে, বিশেষ করে শিশু এবং শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব হাতে লেখার অভ্যাস করানোই ভাল। কারণ, যখন কোনও কিছু হাতে লেখা হয়, তখন শুধুমাত্র একটি শব্দ মাথায় আসে না। হাত ও আঙুলের সূক্ষ্ম সঞ্চালনের মাধ্যমে অক্ষরগুলিও রূপ নেয়। পুরো প্রক্রিয়াটিকে মস্তিষ্ক তথ্য বিশ্লেষণের কাজেও লাগায়।
অন্য দিকে, টাইপ করার সময়ে হাত যান্ত্রিক ভাবে কিবোর্ডে চলে, যার ফলে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গভীরতা কমে যায়। গবেষকদের মতে, পড়া ও বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে শিশুদের এবং শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব হাতে লেখার অভ্যাস বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
দ্রুততার স্বার্থে হয়তো ল্যাপটপ বা মোবাইল ব্যবহার আবশ্যক হয়ে পড়েছে, তবে শেখা, চিন্তাভাবনার ধারাকে স্পষ্ট করা এবং কোনও বিষয় দীর্ঘদিন মনে রাখার জন্য কাগজ-কলমের বিকল্প আজও অধরা।