অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহারের ফলে সেই ওষুধে প্রতিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। এই প্রতিরোধ কিন্তু প্রাণঘাতী হতে পারে।
গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছিল বিশ্ব জুড়ে দ্রুত গতিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজ়িস্ট্যান্স (এএমআর) তৈরি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সঙ্কেত! কয়েক বছর হল অ্যান্টিবায়োটিক রেজ়িস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী কথাটির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে পৃথিবী। অ্যান্টিবায়োটিক এক ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের পরিধি অনেকটা বড়। ব্যাক্টিরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীসহ সব ধরনের অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল। এএমআর বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের জন্য ব্যাক্টিরিয়া বা অন্যান্য জীবাণু ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং তখন প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক রোগ দমনে আর কাজ করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুয়ায়ী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারণ হল যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। সর্বোপরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজ়িস্ট্যান্স নিয়ে সচেতনতার অভাব।
এই বিষয়ে মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. দেবাশিস দাস বললেন, “এই প্রতিরোধ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে। পরিচিত ও কম দামের অ্যান্টিবায়োটিক যেগুলো দেওয়া যেত, সেগুলোয় রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেলে আর দেওয়া যায় না। অ্যান্টিবায়োটিক তাঁদেরই দেওয়া হয়, যাঁদের অবস্থা গম্ভীর। নতুন কোনও ওষুধ তৈরি হলে প্রথমে তার কার্যক্ষমতা বেশ ভাল থাকে। সেটা অতিরিক্ত ব্যবহারে কার্যক্ষমতা হারায়। আবার দেখা গিয়েছে, দীর্ঘসময় ধরে ওষুধটা যদি চালু না থাকে, তা হলে তার সেনসিটিভিটি আবার ফিরে আসে।”
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজ়িস্ট্যান্স সব দেশকে প্রভাবিত করছে। ‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নাল জানাচ্ছে গবেষকেরা বিশ্বের ২০৪টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণেই প্রায় ৩ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে! প্রতি বছর শুধু ভারতেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণে মৃত্যু হয় বহু শিশুর। বিশ্বের প্রায় সব দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রাশ না টানলে এবং এই ব্যাপারে সচেতন না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এমন সময় হয়তো আসবে যখন অ্যান্টিবায়োটিক অকেজো হয়ে যাবে এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে জীবাণুরা!
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজ়িস্ট্যান্সের জন্য একাধিক কারণ আছে বলে মনে করেন ডা. দাস। তিনি বললেন, “ডাক্তারের কারেন্ট প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ দেওয়ার কথা নয়। কোনও ওষুধ বিক্রেতা এই ওষুধ সাজেস্ট করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও একাধিক ওষুধের দোকানে পুরনো প্রেসক্রিপশন দেখে বা শুধু মুখের কথাতেই অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায়।” অনেকেই ওষুধের দোকানে গিয়ে সমস্যা বলে ওষুধ কেনেন। আবার অনেকে ইন্টারনেট দেখে নিজে নিজেই ওষুধ খেয়ে ফেলেন। সাধারণ অসুখের সঙ্গে লড়তেও অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সাধারণ সর্দি-কাশি- জ্বর সারাতেও অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছেন বন্ধুদের কথায়। “পেটের অসুখ হলেই যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে মেট্রোনিডাজোল গোত্রের ওষুধ। এ গুলো কিন্তু সাধারণ পথ্য খেয়েই সারানো যায়। ভাইরাল জ্বরের ক্ষেত্রে একটা কথাই প্রচলিত আছে ওষুধ খেলে সাতদিন, আর না খেলে এক সপ্তাহে সারবে! কিন্তু রোগী ডাক্তারের কাছে এসে বলছেন স্কুল বা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বিশ্রামে থাকা সম্ভব নয়, তখন চিকিৎসকেরা কিছুটা বাধ্য হয়ে সাধারণ সর্দি কাশি জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। ফলে একটা প্রজন্ম, একটা সমাজের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজ়িস্ট্যান্স বাড়ছে।”
অ্যান্টিবায়োটিকের নির্ধারিত কোর্স শেষ না করার প্রবণতা দেখা যায় অনেকের মধ্যে। এটা বড় সমস্যা। এমন অনেক অসুখ আছে যার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল খেতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত কোর্স শেষ না করায় জীবাণুরা সেই সব ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের আরও শক্তিশালী করে ফেলে। যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। এমন অনেকেই আছেন যাঁদের কোনও সমস্যায় একদা চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন, পরে সেই সমস্যা আবার হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে পুরনো প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খেয়ে ফেলেন। এখানেই হয়ে যায় গলদ। প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক সব ওষুধই দেহের প্রতি কেজি ওজন হিসেব করে দেওয়া হয়। ৫০ কেজি ওজনের ব্যক্তির ৫০০ পাওয়ারের ওষুধ যতবার খেতে হবে ৯০ কেজি ওজনের তার চেয়ে বেশি। যাঁর শরীরে যতটা প্রয়োজন সেই পরিমাণ ওষুধ না প্রবেশ করলে জীবাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করে। যাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে নিজেরা ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন তাঁরা এই ডোজ়ের ব্যাপারে সচেতন নন। আবার মানুষভেদে, অঞ্চলভেদে অ্যান্টিবায়োটিকের পার্থক্য আছে। “উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর বেশ কিছু অঞ্চল ম্যালেরিয়ারপ্রবণ। সেই সব জায়গায় ড্রাগ প্রোটোকল আলাদা। সেই সব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া রোগীদের উপশমের জন্য যে ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়, তা ম্যালেরিয়াপ্রবণ নয়, এমন অঞ্চলের ম্যালেরিয়া রোগীকে দেওয়া হয় না।”
শুধু মানুষের অসেচনতা, অজ্ঞতা নয়, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজ়িস্ট্যান্সের সঙ্গে জুড়ে আছে বিশ্বের তাবড় তাবড় উন্নত দেশের বাণিজ্য পদ্ধতি। “শুনলে অবাক হতে হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয় ফিশারিজ়ে! এটা করে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি। মাছ, পোল্ট্রি, আনাজপাতিতে এখন এত বেশি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, যে তা খেয়েও মানুষের শরীরে রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে,” বললেন ডা. দাস।
অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকদেরও একটু সচেতন হতে হবে। সরকার এর জন্য তৎপর হয়েছে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে এএমআর কমিটি তৈরি হচ্ছে। যারা নজর রাখছে, গাইডলাইন তৈরি করে দিচ্ছে। তাই যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে একটু ভাবতে হবে।