দক্ষিণ ভারতের খাবার বললেই যেন মনে হয় টক স্বাদের দোসা, ইডলি, সম্বর। কিন্তু চেট্টিনাড, মালাবার, ম্যাঙ্গালোর... দক্ষিণের নানা কুইজ়িনের রান্নার বৈশিষ্ট্য যেমন আলাদা, তেমনই তার স্বাদ।
চেট্টিনাড রান্না
তামিলনাড়ুর চেট্টিনাড অঞ্চলের রান্না বেশ ঝাল আর মশলাদার। এই রন্ধনশৈলী হল তামিলনাড়ু রাজ্যের শিবগঙ্গা জেলার অন্তর্গত চেট্টিনাড অঞ্চলের নাগারাথার সম্প্রদায়ের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস। এই রান্নায় মশলার ব্যবহার বেশি। স্টার অ্যানিস, মৌরি, দারুচিনি, কাল্পাসি (স্থানীয় পাথরফুল), মারাটি মোগ্গু (স্থানীয় শুকনো ফুল) বেটে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। যেহেতু তামিলনাড়ুর আবহাওয়া শুষ্ক প্রকৃতির, তাই এ দিকে মাংস শুকিয়ে সংরক্ষণ করে রান্নায় ব্যবহার করা হয়। আমিষ, নিরামিষ পদের সঙ্গে পরিবেশিত হয় চাল বাটা দিয়ে তৈরি দোসা, আপ্পাম, ইডিয়াপ্পাম আডাই, ইডলি। তৎকালীন বর্মার সঙ্গে চেট্টিনাডে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুবাদে এক ধরনের পায়েস রান্না চলে আসে চেট্টিনাডের স্পাইসি কুইজ়িনেও। আঠালো লাল চাল দিয়ে তৈরি এই পায়েস এই কুইজ়িনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ম্যাঙ্গালোরের হেঁশেলে
ম্যাঙ্গালোর যেহেতু বন্দর শহর, এখানে নানা সময়ে নানা জাতির মানুষের যাতায়াত লেগেই থেকেছে। বাণিজ্য সূত্রে এখানে এক সময়ে যেমন পারস্যের মানুষ এসেছে, পরবর্তীতে পোর্তুগিজ়রাও এসেছে। ষোড়শ ও অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পোর্তুগিজ়দের হাত ধরে পর্কের নানা পদ এখানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু বহিরাগত নয়, ম্যাঙ্গালোরের বাসিন্দাদের মধ্যেও অনেক বৈচিত্র। উদুপি ব্রাহ্মণরা ক্যাথলিক ম্যাঙ্গালোরিয়ান, তার সঙ্গে স্থানীয় ধীবর সম্প্রদায়... প্রত্যেকের রান্নার ধরন আলাদা। এই সবই মিলেমিশে ম্যাঙ্গালোর কুইজ়িনকে বৈচিত্র এনে দিয়েছে।
সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় ম্যাঙ্গালোরের রান্নায় মাছের আধিক্য রয়েছে। ম্যাকারেল কারি এখানে অন্যতম জনপ্রিয় পদ। তা ছাড়া সামুদ্রিক যে কোনও মাছই চিলি পেস্ট দিয়ে ম্যারিনেট করে ফ্রাই করে খাওয়ার চল রয়েছে। চিকেন রোস্টও এই কুইজ়িনে নিত্য অতিথি। তার সঙ্গে পরিবেশিত হয় নীর দোসা, কোরি রোটি বা ম্যাঙ্গালোর বান। কলা, টক দই ও ময়দা মেখে ফার্মেন্ট করে তৈরি মিষ্টি এই বান স্থানীয়দের প্রিয়।
ভাজাই পু বড়া
মালাবার কুইজ়িন
উত্তর কেরলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল মালাবার কুইজ়িন। এখানকার পালাক্কাদ, মালাপ্পুরম, কোঝিকোড়, কান্নুর, ওয়েনাড অঞ্চলের খাবারে বৈচিত্র এসেছে স্থানীয়দের খাদ্যাভ্যাস থেকে। এখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের রন্ধনশৈলীর সঙ্গে মিশেছে টুলু ও তামিলদের রান্না। মালাবারের ভোজন-তালিকায় যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের খাবার। বিরিয়ানি তার অন্যতম উদাহরণ। মালাবারের বাসিন্দারা স্থানীয় উপাদানের সংমিশ্রণে এমন ভাবে বিরিয়ানি রাঁধেন যা দেশের অন্য অঞ্চলের বিরিয়ানির চেয়ে স্বাদে-গন্ধে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বিরিয়ানিতে ব্যবহার হয় জিরাকাসাল ও কাইমা চাল। স্থানীয়দের রন্ধনরীতির সঙ্গে মিশেছে বিদেশি প্রভাব। প্রাচীনকাল থেকেই মালাবার উপকূল মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। এলাচ, দারুচিনি, আদা, হলুদ ও গোলমরিচের মতো অনন্য সম্পদে সমৃদ্ধ কেরল ছিল প্রাচীন বিশ্বের মশলার বাগান। এ কারণেই দূর-দূরান্তের দেশ থেকে বণিকরা সমুদ্রপথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসতেন। আবার তাঁদের হাত ধরে নানা মশলাও চলে আসে এখানে। ফলে মালাবার কুইজ়িনের স্বাদে বিবিধ ফ্লেভার পাওয়া যায়।
সম্প্রতি নভোটেল কলকাতা, দক্ষিণের এমনই বিস্তৃত কুইজ়িন থেকে নানা রকমের পদ নিয়ে একটি খাদ্য উৎসবের আয়োজন করেছিল। শেফ অ্যান্থনি দা সালভার কিউরেটেড সেই মেনুতে ছিল ম্যাঙ্গালোর মাটন ছুক্কা, অন্ধ্র কোডি ভেপুড়ু, মালাবার চেমিন উলথিয়াথু, চিকেন চেট্টিনাড, থালাসেরি চিকেন বিরিয়ানির মতো পদ। মাদুরাই মশলার (ধনে, জিরে, গোলমরিচ, শুকনো লঙ্কা, মৌরি, শুকনো কারিপাতা দিয়ে তৈরি) সঙ্গে পেঁয়াজ-রসুনের রস ও কাজু বাটা দিয়ে তৈরি হয় ঘন গ্রেভির মাটন ছুক্কা। লেবুর রস ও পেঁয়াজ-আদা, রসুনের রসে চিকেন জারিয়ে শুকনো অন্ধ্র মশলা দিয়ে রোস্ট করে তৈরি হয় অন্ধ্র কোডি ভেপুড়ু। আর সব শেষে ড্রাই রোস্ট করে নেওয়া হয় মাংস। এ দিককার বেশির ভাগ আমিষ রান্নাই ড্রাই রোস্ট কায়দায় তৈরি হয়। এই সব রান্নার সঙ্গে পরিবেশিত হয় নানা স্বাদের দোসা, ইডিয়াপ্পাম, মালাবার পরোটা। শেষ পাতে মিষ্টিমুখে পরিবেশন করা হয় এলানির পায়েসম ও মাইসোর পাক।
ফুড ও লোকেশন:নভোটেল, কলকাতা