রথযাত্রায় জগন্নাথদেবের ৫৬ ভোগের রাজকীয় মেনুতে মালপোয়া-পায়েস-খাজা-পোলাও যা-ই থাক না কেন, পাঁপড়ভাজার কোনও অস্তিত্ব কস্মিনকালেও পাওয়া যায়নি। রথের দিনে শ্রীক্ষেত্রে পাঁপড় খাওয়ার চল আছে বলেও জানা যায় না। অথচ বাঙালির রথযাত্রার সঙ্গে পাঁপড়ভাজা সেই কবে থেকেই জুড়ে গিয়েছে। দেবতার ভোগে ব্রাত্য হলেও, বাঙালির রথযাত্রার সংস্কৃতির সঙ্গে পাঁপড়ভাজা যেন এক অবিচ্ছেদ্য এবং চিরন্তন আত্মিক বন্ধনে বাঁধা। আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ, ঝিরঝিরে বৃষ্টির সঙ্গে গরম গরম পাঁপড়ভাজার চেনা সুবাস ছাড়া বাঙালির রথযাত্রা যেন একেবারেই অসম্পূর্ণ।
কালের নিয়মে কত কিছুই তো বদলেছে! বাঙালি মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে মিষ্টি ভুট্টার দানা ও নাচোস খেতেও শিখে গিয়েছে। কিন্তু রথযাত্রা আর পাঁপড়ভাজাকে আলাদা করা যায়নি। ছানা, ঘি, রাজকীয় মিষ্টি দেবতার পাতে প্রাধান্য পেলেও, সাধারণ মানুষ পাঁপড়ভাজাতেই আনন্দ খুঁজে নেন। মেলার সাদামাঠা পাঁপড়ভাজাও যেন অমৃত। আর পাঁপড়েরও তো বৈচিত্র কম নয়! শুধুই কি মুগ বা বিউলির ডালের পাঁপড়, আরও নানা স্বাদের পাঁপড় খাওয়ার চল রয়েছে রথের দিনে।
ছোলার ডালের পাঁপড়
উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এই পাঁপড়ের চল বেশি হলেও রথের দিনে বাঙালি বাড়িতেও এই পাঁপড়ভাজা খাওয়া যায়। ছোলার ডালের পাঁপড় অন্যান্য ডালের চেয়ে কিছুটা শক্ত এবং অনেক বেশি মুচমুচে হয়। এর স্বাদ বেশ নোনতা ও কড়া। এই পাঁপড়ে সাধারণত জোয়ান, হিং এবং লঙ্কার গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়। ফলে ভাজার পর হিং ও জোয়ানের সুন্দর সুবাসে খিদে আরও বেড়ে যায়।
পাঁপড়ভাজা ছাড়া বাঙালির রথযাত্রার মেজাজই অসম্পূর্ণ।
মশলা পাঁপড়
বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির সঙ্গে মশলা পাঁপড়ের যুগলবন্দি অনবদ্য। সাধারণত বিউলি ও মুগ ডাল মিশিয়ে তৈরি হয়। স্বাদে বেশ ঝাল, নোনতা এবং মশলাদার হয়। গোলমরিচ, লঙ্কাকুচি ও ভাজা জিরে মাখানো এমন পাঁপড় খেলে অরুচি কাটবে নিঃসন্দেহে।
আলুর পাঁপড়
বৃষ্টি নামার ঢের আগে থেকেই আলুর পাঁপড় তৈরি শুরু হয়ে যায়। সেদ্ধ আলু চটকে মশলা দিয়ে পাতলা করে কেটে রোদে শুকিয়ে এটি তৈরি হয়। আলুর পাঁপড়ে সাধারণত কোনও মশলা মেশানো হয় না, তবে এখন চিলিফ্লেক্স ও জিরে মিশিয়েও আলুর পাঁপড় পাওয়া যায় বাজারে। অনেকেই বলেন, ভাজার চেয়ে আগুনে পুড়িয়ে বা সেঁকে খেতে তা বেশি সুস্বাদু লাগে।
শ্রীক্ষেত্রে দেবভোগে পাঁপড় ভাজার অস্তিত্ব নেই, তবে বাঙালির পাতে রথের দিনে তা থাকবেই।
চালের পাঁপড়
চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি এমন পাঁপড়ও রথের দিনে খাওয়ার জন্য বেশ ভাল। এমন পাঁপড় আড়েবহরে বড় হয় না, সাবুর পাঁপড়ের মতো ফুলেফেঁপেও ওঠে না। এগুলি হালকা, পাতলা, আকারে ছোট। তবে খেতে বেশ মুচমুচে হয়।
সুজির পাঁপড়
খুব কম সময়ে এবং সহজে তৈরি করা যায় বলে ঘরোয়া আড্ডায় সুজির পাঁপড় বেশ জনপ্রিয়। সুজি জলে ফুটিয়ে মণ্ড তৈরি করে পাতলা সুতির কাপড়ে বা প্লাস্টিকের শিটে গোল গোল করে কেটে রোদে শুকোনো হয়। এই পাঁপড়ে সাধারণত চিলি ফ্লেক্স এবং ধনেপাতাকুচি দেওয়া থাকে, যা ভাজার পর দেখতে খুব লোভনীয় লাগে।
পাঁপড়ের ধরনও অনেক।
টম্যাটোর পাঁপড়
টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদের চটপটা পাঁপড়। চালের গুঁড়ো বা সাবুদানার সঙ্গে টম্যাটোর রস মিশিয়ে তৈরি করা হয়। ভাজার পর এর হালকা লালচে রং দেখলেই জিভে জল চলে আসে। চাটমশলা ও বিটনুন ছড়িয়ে খাওয়া যায় এমন পাঁপড়।
রাগির পাঁপড়
ওজন কমানোর ডায়েটে এখন মিলেট বা রাগির বেশ রমরমা। আটা বা ময়দার বিকল্প হিসেবে বাঙালিও এখন রাগির রুটি বা পরোটা অথবা রাগির দোসা খেতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। রাগির পাঁপড়ও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ডালের পাঁপড়ের চেয়ে এটি অনেক বেশি মুচমুচে। ফাইবার ও ক্যালশিয়ামে ভরপুর। তবে দেখতে মোটেও আকর্ষণীয় নয়। ভাজার পরে এর রং কিছুটা কালচে বা খয়েরি হয়।
পালংশাকের পাঁপড়
চালের গুঁড়ো বা সাবুর সঙ্গে টাটকা পালং শাক বা পুদিনা পাতার রস মিশিয়ে এই পাঁপড় তৈরি করা হয়। সাধারণত অবাঙালিরা এমন পাঁপড় খেলেও এখন বাঙালির হেঁশেলেও তা দিব্যি ঢুকে পড়েছে। সবজেরঙা এমন পাঁপড় দেখতেও লোভনীয়।
কাঁচকলার পাঁপড়
কেরল ও তামিলনাড়ুতে কাঁচকলার পাঁপড় বেশ জনপ্রিয়। কাঁচকলা সেদ্ধর সঙ্গে নুন, গোলমরিচ ও সামান্য নারকেল তেল মিশিয়ে এই পাঁপড় তৈরি হয়। এটি নারকেল তেলে ভাজলে স্বাদ আরও বাড়ে।