অত্যন্ত চেনা সমস্যা। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে অ্যাসিড রিফ্লাক্স। সাবধান হওয়া দরকার আগেই
অ্যাসিডিটির মতো পরিচিত সমস্যা অনেকেই দীর্ঘ দিন ধরে ভোগ করলেও সতর্ক হন না। আপাত দৃষ্টিতে নিরাপদ এই সমস্যা অনেক সময়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অ্যাসিড রিফ্লাক্স যদি রাতে হয়, বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে, তা শ্বাসরোধ করে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। শুধু অ্যান্টাসিড বা সোডা ওয়াটার খেয়ে অ্যাসিডিটির সহজ সমাধান সম্ভব নয়। এর গোড়ার কারণগুলি নির্মূল করা দরকার।
রিফ্লাক্সের মূল কারণ
পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া অ্যাসিড যদি কোনও কারণে ভালভ ভেদ করে খাদ্যনালিতে চলে আসে, তাকেই অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা চলতি কথায় অ্যাসিডিটি বলা হয়। চোঁয়া ঢেঁকুর, অল্প পরিমাণে খাবার গলায় উঠে আসা, বুক জ্বালা, ব্লোটিং বা বমি ভাব, পেট ভার লাগার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ সব ক্ষেত্রে সব সময়ে বমি হয় না। পেট ব্যথাও সাধারণত হয় না অ্যাসিড রিফ্লাক্সে। তবে ঘুমের মধ্যে এই রিফ্লাক্স হলে খাবার গলায় উঠে এসে শ্বাস বন্ধ করে দিতে পারে অজান্তেই।
কেন হয়?
অ্যাসিড রিফ্লাক্সের প্রধান কারণ জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের ধরন। এর সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা, যেমন ওবেসিটি, ডায়াবিটিস ইত্যাদি এই রিফ্লাক্সের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তোলে। এ সব ক্ষেত্রে পাকস্থলী ও খাদ্যনালির মধ্যকার ভালভটি আলগা হয়ে যায়, হজম না হওয়া খাবার সহজেই উপর দিকে উঠে আসতে চায়। অনেক সময়ে কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়ার ফলেও অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত মদ্যপান ও ধূমপান এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। প্রায়ই তেল-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়াও এর আর একটি কারণ। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এই অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা। বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে, তবে তা প্রকাশের ধরন আলাদা।
কী ভাবে সাবধান হবেন
ওজন বেশি থাকলে প্রথমেই তা কমাতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত মদ্যপান, ধূমপানের অভ্যেস থাকলে তা বন্ধ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডা. কালিদাস বিশ্বাস বললেন, “বেশির ভাগ মানুষের অ্যাসিডিটির সমস্যার মূল কারণ দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা। দুটো মিলের মধ্যে গ্যাপ কমাতে হবে। রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে হবে। খাওয়া ও ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যে অন্তত এক ঘণ্টা গ্যাপ রাখুন।” তিনি আরও জানান, মাঝরাতে বা শেষরাতে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে চোকিং হ্যাজ়ার্ড এড়াতে হালকা উঁচু বালিশে মাথা রেখে শুতে হবে। অন্তত ১৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গল উঁচুতে মাথা রাখতে হবে। বর্তমান সময়ে বেশি রাত অবধি জেগে থাকা সামগ্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা এই ধরনের সমস্যা দিনে দিনে আরও বাড়িয়ে তুলছে। রাত জাগা বন্ধ না করলে হজমের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। খাওয়ার পরে একটু হেঁটে আসার অভ্যাস করা ভাল। ডা. বিশ্বাস মনে করিয়ে দিলেন, সকালে ভারী জলখাবার, দুপুরে মাঝারি মাপের খাবার এবং রাতে অল্প খাওয়ার নিয়মের কথা।
চিকিৎসা
অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা মোকাবিলার প্রধান নিরাময় হল জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। ওষুধ খেয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাও সম্ভব। জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এন্ডোস্কোপিক সার্জারির পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তাৎক্ষণিক নিরাময় পেতে অ্যান্টাসিড কিংবা সোডা ওয়াটার খাওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। ডা. বিশ্বাস জানালেন, সোডিয়াম বাই কার্বনেট কিডনিতে চিরস্থায়ী ক্ষতি করে দিতে পারে। মুঠো মুঠো অ্যান্টাসিড খাওয়ার প্রবণতাও খারাপ। “অনেক সময়েই দেখা যায়, বিরিয়ানি কিংবা যে কোনও ভারী খাবারের সঙ্গে কোলা বা সোডা নেওয়া হয়। এতে চট করে ঢেঁকুর ওঠে ঠিকই। কিন্তু আদতে যে কোনও বেভারেজ ফুড টিউবে অ্যাসিড রিল্যাপ্স ত্বরান্বিত করে,” বললেন ডা. বিশ্বাস।
সমস্যা সাধারণ ও পরিচিত বলে অনেকেই অ্যাসিডিটির বিষয়টি অবহেলা করেন। নিজে নিজেও চিকিৎসা করেন। তা না করে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ঠিক উপায়ে প্রতিহত করুন এই সমস্যা।