পঞ্চাশ বছরের শিল্পযাত্রা। সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, এক শিল্পীর সাধনা, আত্মবিশ্বাস, অর্জন এবং নিরন্তর আত্মানুসন্ধানের সাক্ষ্য। কলকাতার নজরুল মঞ্চে বেঙ্গল ওয়েব সলিউশনস আয়োজিত ‘ফিফটি ইয়ার্স অব হরিহরণ’ অনুষ্ঠান সেই অর্থে কোনও ‘হিট সং’-এর সমাবেশ ছিল না। বরং সন্ধ্যাটি যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হল এক শিল্পীর আত্মজীবনী হিসেবে— যেখানে প্রতিটি গান, প্রতিটি আলাপ, প্রতিটি বিরতি হরিহরণের দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনের একটি করে অধ্যায়।
শুরুতেই সুফি তবস্সুমের রচনা ‘বেখেয়ালি মে চলন উসকা’ পরিবেশনের আগে রাগ রাগেশ্রীর আলাপ। প্রথম কয়েক মিনিটেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এ সন্ধ্যার উদ্দেশ্য জনপ্রিয়তার উত্তাপে আঁচ নেওয়া নয়, শুধুই সঙ্গীত। আলাপের বিস্তার ছিল সংযত, আত্মমগ্ন। মন্দ্র সপ্তকের ষড়জ ছুঁতে গিয়ে ক্ষণিকের শ্রুতি বিচ্যুতিতে শিল্পী বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পুনরায় চেষ্টা করে সফল হলেন। যেন শিল্পী কোনও ঘরোয়া মেহফিলে বসেছেন, কলকাতার শ্রোতা যেন তাঁর পরম আপনজন। রাগ থেকে গজ়লে প্রবেশ এমন স্বাভাবিক যে শাস্ত্রীয়-উপশাস্ত্রীয় বিভাজনরেখাই মিলিয়ে গেল।
পরবর্তীতে এক দিকে নক্স লায়েলপুরি রচিত ‘দিল তো কেয়া, রুহ-এ-ফন কো ভি গরমা গয়ি’তে জটিল স্বরবিন্যাস এবং অপর দিকে ড. সাফি হাসানের কথায় ‘মরীজ়-এ-ইশ্ক কা’-র গতিময় দাদরার ছন্দ দু’টি ভিন্ন স্বাদের নজ়মকে আরও বাঙ্ময় করে তোলে। শব্দ, উচ্চারণ, স্বরবিন্যাস এবং আবেগ— এই চারটির এমন সূক্ষ্ম সমন্বয় বিরল। তান, মীড় কিংবা মুরকি কোথাও আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, বরং কবিতার অন্তর্লীন ব্যঞ্জনাকেই উজ্জ্বল করে তোলে।
‘ঝুম লে, হঁস বোল লে’ গজ়লটি নিজেকে উজাড় করে লিখেছেন মুজ়ফ্ফর ওয়ারসি, এবং রূপক তালের সহজ ছন্দে ও ততোধিক সরল সুরে গানটিকে বেঁধে হরিহরণ বুঝিয়ে দিলেন জীবন যত সুন্দর, ঠিক ততটাই ক্ষণস্থায়ী। গানের মাঝে ‘ক্য়ায়া খবর বরসো কি হ্যায়, ইয়া লমহা ভর হ্যায় জ়িন্দেগি’— এই অংশটির মূর্ছনা শ্রোতার মনে আশঙ্কার মেঘ নয়, বরং উপলব্ধির প্রশান্তি এনে দেয়। এরপর অতি পরিচিত ‘কেসরিয়া’ পরিবেশনের সিদ্ধান্ত প্রথমে বিস্মিত করলেও, গানটি হরিহরণের কণ্ঠে একেবারেই নতুন চরিত্র লাভ করে।
সন্ধ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে গালিবের শের ‘দায়ম পড়া হুয়া’। বেগম আখতার থেকে শুরু করে মেহেদি হাসানের মতো কিংবদন্তিরা গানটি গেয়ে যাওয়া সত্ত্বেও হরিহরণ সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে কর্নাটকী রাগ ললিতায় গজ়লটিতে পুনরায় সুর দিলেন। জীবনযুদ্ধে ক্রমাগত পরাভূত এক মানুষের হার না মানার যে জেদ, তা হয়তো রাগ ললিতার কোমল রেখাব ও কোমল ধৈবতে আরও ওজন পেল।
মঞ্চে হরিহরণ।
এর পরে গাইলেন ‘কাশ অ্যায়সা কোই মঞ্জর হোতা’। সারা জীবনে অগণিত বার এই গজ়ল গেয়েও ‘জমা করতা জো ম্যায়’— একই পঙ্ক্তিতে যখন বারবার ফিরে আসছেন, প্রতিবারই নতুন সুর, নতুন ভঙ্গি, নতুন আবেগ সৃষ্টি করছেন। মনে হচ্ছিল, যেন পঞ্চাশ বছরের সঙ্গীতজীবনের বিচ্ছিন্ন স্মৃতিখণ্ডগুলি একে একে কুড়িয়ে নিচ্ছেন। ‘উসনে উলঝা দিয়া’ পঙ্ক্তির সঙ্গেও তাঁর খেলাচ্ছলে সুরবদল ছিল একই সঙ্গে রসিক, কল্পনাপ্রবণ এবং গভীর ভাবে সঙ্গীতময়। তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা কী ভাবে শিল্পের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে, তার এক দুর্লভ উদাহরণ এই পরিবেশনা।
এরপর একে এক গাইলেন বশীর বদর-এর ‘লোগ কহতে হ্যায় অজনবী তুম হো’, গালিবের ‘দিল-এ-নাদান’, তাহির ফরজের লেখা ‘অক্স-এ-চেহরে পে আফতাব কা হ্যায়’, শেহরিয়ারের ‘অজীব সানেহা’, আনন্দ বক্সীর ‘নগমে হ্যায়, শিকওয়ে হ্যায়’, নক্স লায়েলপুরি ও সৈয়দ গুলরেজের লেখা ‘অপনি জ়ুলফে মেরে শানো পে বিখর জানে দো’, জলি মুখোপাধ্যায় ও নিজের লেখা ‘দর্দ কে রিশতে’, আনন্দ বক্সীর ‘মেরে পাস হ্যায় তু’। বিশেষ করে ‘অজীব সানেহা’ শুনতে শুনতে মনে পড়ে যায় ‘গমন’ ছবির সেই তরুণ হরিহরণকে। কয়েক দশকের ব্যবধানে কণ্ঠের ধার হয়তো খানিক কমে এসেছে, কিন্তু আবেগের সততা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।
শেষ পর্বে ‘তু হি রে’ যেন অনিবার্য সমবেত স্মৃতিচারণ। বহু বার শোনা এই গান শিল্পীকে শ্রোতার কাছে নতুন করে পরিবেশন করতে গেলে বার বার সুরের রাস্তা বদলাতে হয় বটে, কিন্তু সেটাই চমক। জনমানসে গেঁথে যাওয়া এই গানকে আবার কী ভাবে শিল্পী নতুন করে তোলেন— সেই নিয়েই এত উদ্গ্রীব প্রত্যাশা। সমাপ্তিতে রাগ পিলুর ঠুমরির মধ্য দিয়ে ‘রোজা জানেমন’-এ প্রবেশ। এ যেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রসঙ্গীতের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতুবন্ধন, যা হরিহরণের শিল্পীজীবনের এক প্রকার সারাংশ। এ দিন সৌম্য সরকারের মঞ্চ ভাবনা অনুষ্ঠানের আমেজ আরও গাঢ় করে তোলে।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বিস্মিত করে, তা হরিহরণের কণ্ঠের অবিশ্বাস্য সংরক্ষণ। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরন্তর সঙ্গীত পরিবেশনের পরেও কণ্ঠের নমনীয়তা, মীড়ের তরলতা, তানের স্বচ্ছতা, দীর্ঘ শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং সূক্ষ্ম শ্রুতির ব্যবহার প্রায় অমলিন। তাই নজরুল মঞ্চের এই সন্ধ্যা নিছক কোনও সুবর্ণজয়ন্তীর আনুষ্ঠানিক উদ্যাপন নয়। এটি ছিল এক শিল্পীর আজীবন সাধনার জীবন্ত দলিল।