E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ছয় স্বরে যেন এক পৃথিবী

প্রত্যেক শিল্পী স্বীয় অভিজ্ঞতায় কোথাও নিসর্গ ও নারীজীবন, কোথাও শহরের নিঃসঙ্গতা, কোথাও বা অন্তর্জগতের বিমূর্ত অনুভব তুলে ধরেছেন। সব মিলিয়ে যেন ছ’টি ভিন্ন ভিন্ন ডায়েরি একত্রে পাঠ।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ অগস্ট ২০২৬ ০৮:২৮
সম্মিলিত: চারুবাসনায় আয়োজিত প্রদর্শনী ‘অভিব্যক্তি’র চিত্রকর্ম।

সম্মিলিত: চারুবাসনায় আয়োজিত প্রদর্শনী ‘অভিব্যক্তি’র চিত্রকর্ম।

কলকাতার চারুবাসনা গ্যালারিতে সম্প্রতি হয়ে গেল ছ’জন মহিলা শিল্পীর সম্মিলিত প্রদর্শনী— ‘অভিব্যক্তি’। সমসাময়িক শিল্পচর্চায় ‘অভিব্যক্তি’ নামটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে শুধুই দৃশ্যের মাধ্যমে নয়, বরং জমে থাকা অনুভূতিকে একটি দৃশ্যমান শরীর দেওয়ার মাধ্যমেও তার প্রকাশ ঘটে। কিউরেটর অঞ্জন সেনের সঙ্গে শিল্পীদের পরিচয়ের সুবাদে এই সম্মিলনীর সূত্রপাত। তাঁর কথায়, নানা ধরনের কাজ করলেও, এই শিল্পীদের মধ্যে যে সহমর্মিতা এবং পরিশ্রমের মানসিকতা তিনি পেয়েছেন, সেটিই তাঁদের এক জায়গায় নিয়ে আসার মূল কারণ। প্রত্যেক শিল্পী স্বীয় অভিজ্ঞতায় কোথাও নিসর্গ ও নারীজীবন, কোথাও শহরের নিঃসঙ্গতা, কোথাও বা অন্তর্জগতের বিমূর্ত অনুভব তুলে ধরেছেন। সব মিলিয়ে যেন ছ’টি ভিন্ন ভিন্ন ডায়েরি একত্রে পাঠ।

প্রদর্শনী কক্ষের বাঁ-দিক ঘেঁষে ছিল অর্চনা ঘোষের ছবি। তাঁর চারটি কাজের কেন্দ্রে রয়েছে নারী। প্রায় এক রঙের পরিসরে নারীমুখকে নিজের মতো করে নির্মাণ করেছেন। ইয়েলো অকার, কোবাল্ট ব্লু, বার্ন্ট সায়ানের দীর্ঘায়িত মুখাবয়বে শিল্পীর নিজের প্রতিচ্ছায়াও ফুটে ওঠে। তাঁর ভাবনায়, ছবির রং ও বিন্যাসে ধরা পড়ে নারীর অন্তর্লোকের নীরব শক্তি। গলা ও মুখের সেই টান, চোখের স্থিরতা এবং সংযত অভিব্যক্তি ছবিগুলিকে এক ধরনের আত্মমগ্নতা দেয়।

কুমকুম দাসের শিল্পভাষা আরও অন্তর্মুখী। তাঁর কাজের মধ্যে মানসিক টানাপড়েন এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি পাশাপাশি চলেছে। এক সময়ে প্রকৃতির মধ্যে স্বাধীন ভাবে বেড়ে ওঠা, তার পরে সেই শিকড় থেকে দূরে সরে যাওয়া— এই পরিবর্তন তাঁর ছবির ভিতর সরাসরি দৃশ্য হয়ে আসে না। বরং ধরা দেয় বিমূর্ত ও আধা-বিমূর্তের প্রতীকে। যেমন, ‘টিয়ার্স অব মুন’ কাজটিতে। চাঁদের অশ্রু এখানে কেবল বিষাদের ছবি নয়, এক বৃহত্তর একাকিত্বের স্মারক। তাঁর ভাস্কর্যগুলির মধ্যেও এই অন্তর্গতের মূর্ছনা আরও স্পষ্ট ভাবে বস্তুগত কাঠামোয় রূপ পেয়েছে।

শিল্পী টুম্পা চৌধুরীর ‘টুওয়ার্ডস ডাস্ক’-এ প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে একাকার। ছ’টি ছোট ছবিতে সন্ধ্যা নামার মুহূর্ত পরপর সাজানো। দিনের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, তখন আকাশে জন্ম নেয় গোলাপি ও লালচে আভা। সেই পরিবর্তনই টেম্পারায় তুলে ধরা। প্রতিটি ছবি স্বতন্ত্র কম্পোজ়িশনের হলেও, একটি সময়ের যাত্রা তৈরি হয়। গাছের ডাল, পাতার ছন্দ, রাতের আকাশ কিংবা চাঁদের আলো, রূপক হিসেবে অন্তর্যামী হয়ে ওঠে। পাতার পড়ে থাকা ফর্ম, জলাভূমির বিশালতা, দূরের আবছা গাছ— সব কিছুতেই মানুষের অস্তিত্বের ছায়া। বীরভূমে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর রঙের ভিত তৈরি করেছে। প্রত্যক্ষ ভাবে দেখা আর্থ কালার, মাটি ও সিঁদুরের রং তাঁর ছবিতে তাই বারবার ফিরে এসেছে। এ ছাড়া ক্লথ দিয়ে কিছু টেক্সচার আনা এবং টেম্পারার প্রয়োগ অত্যন্ত আশাবাদী।

বেঙ্গল স্কুলের প্রভাবে শিল্পী প্রীতি রায়ের নিরন্তর চর্চা বাহবা পাওয়ার মতো। তাঁর কাজের সামনে দাঁড়ালে একের পর এক স্তরে রং যেন নিজের ইতিহাস বলতে শুরু করে। ওয়াশের পর ওয়াশ, রঙের স্তরায়িত ভূমিকা, অর্থাৎ পৃষ্ঠটি যতক্ষণ না নিজের মতো করে রং গ্রহণ করছে, ততক্ষণ শিল্পীর অনুসন্ধান থামে না। চারকোল ও সফট প্যাস্টেলের ব্যবহারেও সেই জলরঙের মেজাজ। বারাণসীর ঘাটের ছবিতে একটি শিশুকে স্নান করানোর দৃশ্যে বাৎসল্য রস ফুটে ওঠে। ছবিতে ছক বিন্যাস ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের আবহ তৈরি করে। শিল্পীর ‘হাঙ্গার’ ছবিটি অন্য ছবির তুলনায় বিষয়গত দিক থেকে গভীর ভাবে নাড়া দেয়। একজন মা খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছে। রাত নেমেছে, তবু হাতে কিছুই আসেনি। শেষ আশায় আকাশে ওঠা চাঁদের কাছেই তার আত্মসমর্পণ, যার মধ্যে আছে লজ্জা ও বেঁচে থাকার আকুতি। মুহূর্তটি সামাজিক অসহায়তাকে গভীর ভাবে ফুটিয়ে তোলে।

ট্রেনে যাতায়াতের পথে দেখা দু’ধারের গাছ, শুকিয়ে যাওয়া ডাল, তাদের অদ্ভুত বুনট— এ সবই শিল্পী প্রমা বসুর ছবির জন্মসূত্র। গাছকে আগে থেকে কোনও ফর্মে বন্দি করেন না তিনি, গাছ নিজেই তার আকার নেয়। সেই চলমান তুলি আবার মানুষের শরীরের মতো হয়ে ওঠে ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’ ছবিতে। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে আলাদা কোনও সীমারেখা নেই। মানুষের মতোই সে শত ঝড়েও শিকড় আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাদাকালোর মাঝে সামান্য খয়েরি বা হলুদের ছোঁয়া জীবনের উষ্ণতার বার্তা বয়ে আনে। কোথাও সুতো দিয়ে গাছের ডাল বার করায় সৃষ্টির আনন্দ জড়ো হয়।

নবীন শিল্পী রিয়া করের ছবিতে আবার সম্পূর্ণ অন্য মেজাজ। পরিচ্ছন্ন পার্সপেক্টিভ, স্বচ্ছ অ্যাক্রিলিকের পাতলা স্তর এবং বারবার ওয়াশের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নির্মাণ। একাধিক টোনের স্তর পেরিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় শিল্পীর সেমি-রিয়্যালিস্টিক জগৎ। চকসি বোর্ডের উপরে করা কাজগুলির পৃষ্ঠতল তার কারিগরি নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দেয়। কিন্তু এই পরিচ্ছন্নতার মধ্যেও থাকে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। গাছ কেটে বহুতল উঠছে। পাখিরা হারাচ্ছে আশ্রয়। অথচ সেই বহুতল সাজাতে আমরা কৃত্রিম গাছ কিনে আনি। সব মিলিয়ে তাঁর ছবি লাভ-লোকসানের এক নীরব হিসাব।

ছয় শিল্পীকে নিয়ে আয়োজিত ‘অভিব্যক্তি’ এক সফল প্রয়াস। কিছু খামতি থাকলেও আশা করা যায়, তাঁদের আগামীর প্রদর্শনীর ভাষা আরও পরিণত হবে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Exhibiton Art painting

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy