E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

শতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রথম জীবনে ডায়াসেশন স্কুলে এবং পরে দিল্লির এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন রেবা। পরবর্তী কালে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪২
শতপুষ্প: রেবা হোরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেবভাষায় আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

শতপুষ্প: রেবা হোরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেবভাষায় আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

রেবা হোরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল দেবভাষা: বই ও শিল্পের আবাস। শিল্পীর এক শতকের বেশি ছবিতে সাজানো হয়েছিল প্রদর্শনী, যা সম্পূর্ণতা পেয়েছিল শিল্পীকন্যা চন্দনা হোরের সাহচর্যে।

সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিসের মেয়ে ছিলেন রেবা। পরবর্তী জীবনে বামপন্থী শিল্পী সোমনাথ হোরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় এক সাধিকার জীবন বরণ করেছিলেন। স্বামীর সঙ্গে নিজেও শিল্পচর্চা করেছেন সারা জীবন।

প্রথম জীবনে ডায়াসেশন স্কুলে এবং পরে দিল্লির এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন রেবা। পরবর্তী কালে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন শিল্পী। তবে পুরস্কার নিয়ে কোনও দিনই বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না তাঁর। শুধু কাজ করে গিয়েছেন প্রাণের আনন্দে। তাঁর দৈনন্দিন জীবনে শুধু আশপাশের মানুষ নয়, কুকুর, পাখি, নানা ধরনের গাছপালা... সকলেই ছিল। তা ছাড়াও এক অদ্ভুত একাকিত্বকে নিজের আত্মার সম্বল করে অনন্য এক শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন রেবা।

‘আমার কথা কিছুমিছু’তে তিনি লিখেছেন যে, তিনি খুব স্বতঃস্ফূর্ত এক শিল্পী। যা দেখেন চার দিকে, সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে ব্রাশের খেলায় মেতে ওঠেন। সেই সময়ে তাঁর সচেতন মন, অবচেতনের সঙ্গে মেলামেশায় সৃষ্টি সম্ভব হয়। অত্যন্ত সততার সঙ্গে অসংখ্য সৃষ্টি তিনি করেছেন। এই প্রদর্শনীতে সেই অসাধারণ শিল্পীজীবনেরই উদ‌্‌যাপন করা হয়েছে।

প্রথম দিকে তেলরঙে কাজ করতেন রেবা। পরে অ্যালার্জির কারণে নিজের মতো করে অভিনব এক মাধ্যম সৃষ্টি করেন। এখানে আশির দশকের কিছু ড্রয়িং দর্শক দেখেছেন। কাগজে কালি-তুলির কাজ। এইগুলোয় সব সময়েই কলম ব্যবহার করা হয়নি। কালিতে ডোবানো তুলি বা কখনও শুধু কলমেরই টানে নানা মানুষের বিভিন্ন ভঙ্গিমার স্কেচ করেছেন। অতিসরলীকরণ এনেছেন এখানে, সেটাই তাঁর কাজের বিশেষত্ব।

শতপুষ্প: রেবা হোরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেবভাষায় আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

শতপুষ্প: রেবা হোরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেবভাষায় আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

পরবর্তী দশকের কাজেও নারী, শিশু, প্রাণিজগৎ, গ্রামীণ জীবন এবং পারিবারিক জীবন ছিল তাঁর ছবির প্রধান বিষয়। বাহ্যিক নাটকীয়তার থেকে অন্তর্জগতের আবেগ বেশি চোখে পড়ে। রেবা হোরের ছবি দেখলে অনেক সময়ে মনে হয়, সেগুলো যেন মুহূর্তের আবেগপ্রবণতা। কিন্তু সেই স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যেও অসাধারণ কম্পোজ়িশনের পরিচয় রেখেছেন শিল্পী।

নব্বইয়ের দশকে নানা মানুষের ছবি,‌ যেমন নারী-পুরুষ, সন্তানসহ পুরুষ অথবা জননী, মাঠেঘাটে কর্মরত চাষি, বিষণ্ণ একা রমণী, বারান্দায় দম্পতির প্রেমালাপ, আড্ডামগ্ন একদল পুরুষ, অসংখ্য গায়ক, বাদক, বিভিন্ন ভঙ্গিমায় বহু সারমেয় এবং গবাদি পশুর কম্পোজ়িশনে রঙের ফোয়ারা দেখা যায়। মিশ্র রঙের বাহারে এমন সব ছবি এঁকেছেন, যেগুলো মনে হয় যেন তৎক্ষণাৎ তিনি এঁকেছেন, কিন্তু দর্শকের মনের গভীরে চিরন্তন এক অনুভূতি জাগায়। একই ছবিতে অনেক সময়ে তিনি প্যাস্টেল, কালি, জলরং একসঙ্গে ব্যবহার করতেন, ফলে ছবির পটভূমিতে একটি বৈচিত্রময় টেক্সচার সৃষ্টি হত। নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন রেবা। যেমন জলরং, তেলরং, ড্রাই প্যাস্টেল, মিশ্র মাধ্যম, টেরাকোটা এবং রেখা। তাঁর অঙ্কনে রেখার প্রাধান্যও চোখে পড়ে।

রেবা হোর কোনও দিন সোমনাথ হোরের শিল্পভাষার শৈলী অনুকরণ করেননি। বরং সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং মানবিক এক অভিব্যক্তিপূর্ণ ভাষা গড়ে তুলেছিলেন। ইউরোপীয় এক্সপ্রেশনিজ়মের আবেগপূর্ণ দ্রুত আকারের রেখা এবং আকারের বিকৃতির চিন্তাধারায় মিল হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শিল্প ইতিহাসে কোনও শিল্পীর প্রভাবই তাঁর উপরে পড়েনি। বিদেশ ভ্রমণের সময়ে বিদেশের মিউজ়িয়ামে আধুনিক শিল্পের স্বাধীন চিন্তাধারা, রেখা ও রঙের ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নিশ্চয়ই আত্মস্থ করেছিলেন রেবা, কিছুটা শিল্পী যোগেন চৌধুরীর মতোই। আবার দেশে ফিরে যেমন যোগেন চৌধুরী এক বছর ছবি আঁকতে পারেননি। শুধু নিজের ভাষা খুঁজে বেড়িয়েছিলেন। অনেকটা সেই রকম শিল্পী রেবা হোর তাঁর বিষয়বস্তু খুঁজে পেয়েছিলেন শুধুই বাংলার মানুষ এবং তাঁদের গৃহজীবনে। প্রকৃতি, পশুপাখি এবং নিজের অত্যন্ত গভীর ভাবে চেনা বাঙালি গার্হস্থ্য জীবন, যা তাঁর নিজের মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত, তা-ই এঁকেছেন।

প্রদর্শনীতে রেবা হোরের কিছু ভাস্কর্য ছিল, কিন্তু কোনওটিই খুব বড় ছিল না। টেরাকোটার ছোট ছোট কাজগুলিতে অত্যন্ত ব্যক্তিগত এক ভাব প্রকাশ পেয়েছে। সেগুলিকে কাব্যিক অথচ মানবিক এক ভাষায় গড়েছেন শিল্পী। তাঁর ভাস্কর্য অনুভব করার বস্তু। স্নেহে কোমলতায় ধরে রেখেছেন ঘরোয়া জীবন। প্রাত্যহিক জীবনের সেই সব চিত্রকল্পে রয়েছে চরম সরলীকরণ। মূলত টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ এগুলি। আমাদের লোকশিল্পে পোড়ামাটির বড় ভূমিকা আছে, যেখানে পাথর এক দুষ্প্রাপ্য বস্তু। সেই ঐতিহ্য বহন করে শিল্পী রেবা তাঁর টেরাকোটার কাজে কোনও অলঙ্করণ না রেখে, সহজ-সরল ভঙ্গিতে এক একটি প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যেন মাটি দিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাঁর সব স্বপ্নের ক্যানভাসে রেখায়-তুলিতে আঁকা গোধূলির রং ধরা পড়েছে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Debovasha

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy