চারুবাসনার সুনয়নী চিত্রশালায় ডক্টর সুবিমলেন্দু বিকাশ সিংহের একক প্রদর্শনী হয়ে গেল ড্রয়িং ও পেন্টিং-এর। প্রদর্শনীর নাম ‘দ্য ভার্স অব লাইন’। অর্থ— রেখার ছন্দ, পদ্য এবং কবিতা।
শিল্পীর বক্তব্য খুব স্পষ্ট। আমাদের মনের ছোট ছোট ইচ্ছে ও কল্পনা যখন প্রকাশের পথ না পেয়ে মনের গভীরে তিল তিল করে পলি মাটির মতো জমে পাথর হয়ে যায়, তখন তাকে মুক্তি দেওয়ার পথই হচ্ছে শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে ক্যাথারসিস বা আবেগের স্ফূরণ।
সুবিমলেন্দু গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ, ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ এবং ইউজিসি দ্বারা নির্বাচিত একজন অধ্যাপক। যে শিল্পীরা সরকারি আর্ট কলেজে পড়াশোনা করে সেখানেই অধ্যাপনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম পিএইচডি অধ্যাপক তিনি। এ দেশে নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর আর্ট অ্যান্ড এস্থেটিক্স’-এর প্রথম সচিবও তিনিই। দীর্ঘ কাল ধরে সুবিমলেন্দু একাধারে নন্দনতত্ত্বের শিক্ষা, অন্য দিকে ঐতিহ্যময় জয়পুর ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
১৯৮৮ সালে শিল্পীর আঁকা ৪৫ ফুটের মুরাল চিত্র ‘ইভোলিউশন অব ইন্ডিয়ান মিউজ়িক’ কলকাতায় সম্ভবত দীর্ঘতম তৈলচিত্র। সুবিমলেন্দু শিল্প এবং নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে সাতটি বই লিখেছেন। দেশে ও বিদেশে অংশগ্রহণ করেছেন বহু একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে।
চারুবাসনায় প্রদর্শিত তাঁর ছবিগুলি সূক্ষ্ম ভাবে রেখায় প্রকাশিত। শিল্পীর ভাষায়, সমাজ-সংসারের আরোপিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন শিল্পীর আত্মিক মুক্তি খুঁজে নিয়ে শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া প্রয়োজন। সেখানেই শিল্পী পান নির্মল আনন্দ। তাই শিল্পজীবন ও সংসার থেকে আলাদা হয়ে কখনও কখনও শিল্পীরা আধ্যাত্মিকতার পথে মানুষকে আকর্ষণ করেন। এই কারণেই শিল্প নীরবতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে কখনও কখনও।
দর্শক যদি ভাবেন শিল্পী সুবিমলেন্দু কেন প্রধানত নারী-অবয়ব আঁকেন, তা হলে পর্যালোচনা করা দরকার, রমণীকে তিনি কোন আসনে বসিয়েছেন। যে আমাদের পৃথিবীতে এনেছে, শিল্পীর চোখে সেই নারীর রূপ— জননী। যে অসীম স্নেহে, মায়ায়, মমতায় গড়ে তোলে এক-একটি সংসার, সে মাতৃরূপী রমণী। কখনও পুরুষের কল্পনায় সেই নারী হয়ে ওঠে অপার্থিব অপ্সরা, কামিনী। তারই টানে গৃহবাসী হয় গৃহত্যাগী। সে-ই বিজয়া, কিন্তু নিজে ত্যাগের মহিমায় গড়া। এক সংসারে বেড়ে ওঠার পরে নির্দিষ্ট সময়ে তা পিছনে ফেলে এসে নারী গড়ে তোলে আর এক সংসার। এই নির্মোহ ত্যাগ পুরুষের পক্ষে প্রায় অকল্পনীয়। পুরুষের আকাঙ্ক্ষা, সংসার-যজ্ঞে আত্মাহুতি দেয় অনায়াসে, সেই নন্দিনী। তারই কোলে বেড়ে ওঠে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ পৃথিবী।
শিল্পী সুবিমলেন্দু এই ভাবে নারীমূর্তির বিভিন্ন রূপকল্প সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়াও রেখার মাধ্যমে কখনও এঁকেছেন কুকুর, কখনও গাছ-গাছালি, আবার কখনও পাখির চিত্র। রেখার উপর দক্ষতা লক্ষণীয়। তিনি সূক্ষ্মতা থেকে মাঝে মাঝে কঠিন এবং কঠিনতম রেখায়, সাবলীল ভঙ্গিমায় নিজেকে প্রকাশ করেন। রেখাচিত্রগুলি শিল্পীর কলম বা তুলির ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিছুটা যেন কবিতাধর্মী। প্রদর্শনীতে তাঁর তেলরং এবং চারকোলের ছবি ছাড়াও কিছু ভাস্কর্য, ফ্রেস্কো, এনামেলের কাজ, এচিং এবং ছাপচিত্র দেখা গেল।
একটি ছবিতে এক বীণাবাদনরত নারীকে দেখা যায়, যে উড়ে চলেছে পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে, মেঘরাশি ছাপিয়ে অন্য কোথাও। মৃদু তেলরঙে করা সুন্দর কাজ।
অপর একটি ছবিতে চারকোলের টানে করা এক নারী যেন সংসার ফেলে বেরিয়ে এসে আকাশে চন্দ্রগ্ৰহণ দেখছে। আর একটি ছবিতে ছাতার নীচে বসে আছে একটি কুকুর ও এক বিড়াল। বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। এটি তেলরঙের কাজ।
একটি ছবিতে নারীমূর্তি বেহালার সুরে-লয়ে নিমগ্ন, হয়তো কিছুটা ধ্যানরত। পিছনের প্রকৃতির চেহারা হালকা রঙে বিমূর্ত।
আর একটি ছবিতে চারটি হাঁস মুখ তুলে কী যেন মনোযোগ দিয়ে দেখছে। ওদের মধ্যে কোনও চাঞ্চল্য দেখা যায় না। তেলরঙে করা আর একটি রেখাচিত্রের সুন্দর গঠনবিন্যাস।
নিজস্বতার মাধ্যমে, স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে, যাবতীয় প্রতিযোগিতাকে অতিক্রম করা সর্বজনীন এক ভাষাই হল শিল্প। সুবিমলেন্দু বিকাশ সিংহের এই প্রদর্শনী যেন সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।