E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সৃজনের নিবিড়তা

শিল্পীর বেশিরভাগ ছবি প্রেমেরই আখ্যান, কিন্তু সে প্রেম জাগতিক, সাধারণ প্রেম নয়। ‘শেষ না হওয়া’ একটা বিশেষ জায়গা এখানে রেখেছেন তিনি। ড্রয়িং সব ছবিতেই আছে। তারপর রং যখন ব্যবহার করেন, সেটা কোনও বিশেষ ভাবে নয়, এক অতিপ্রাকৃতিক স্বপ্নিল ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি থেকেই রং বসানো।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৪১
স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনী ‘অ্যালকেমি অফ অ্যাবসলিউট ইন্টিমেসি’ এবং তার সঙ্গে ‘অ্যান এনশিয়েন্ট ব্যালাড’ নামে আরও একটি দলীয় প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল সম্প্রতি। সায়নী তাঁর একক প্রদর্শনীতে এক নতুন চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছেন, যার অন্তর্নিহিত অর্থ— এক প্রাচীন আদি বিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মাধ্যমে অমরত্বের সন্ধান।

শিল্পীর বেশিরভাগ ছবি প্রেমেরই আখ্যান, কিন্তু সে প্রেম জাগতিক, সাধারণ প্রেম নয়। ‘শেষ না হওয়া’ একটা বিশেষ জায়গা এখানে রেখেছেন তিনি। ড্রয়িং সব ছবিতেই আছে। তারপর রং যখন ব্যবহার করেন, সেটা কোনও বিশেষ ভাবে নয়, এক অতিপ্রাকৃতিক স্বপ্নিল ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি থেকেই রং বসানো।

তাত্ত্বিক কাঠামোয় প্রেম ও যৌনতাকে কেবল আবেগের বিষয় হিসেবে না দেখে, অথবা কোনও নির্ভেজাল নিখুঁত অনুভূতি হিসেবে না বিচার করে, মানসিক নৈকট্য ছাপিয়ে প্রেমিকের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মধ্যে ক্রমাগত বোঝাপড়া বা ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ধার করা একটি সিরিজ়ের নাম ‘নাইট বরোড’, অর্থাৎ ‘ধার করা রাত’। হয়তো নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে বলেই ওই নাম দেওয়া। শিল্পীর বহু ছবিতেই পৃথিবী জোড়া নতুন প্রজন্মের ঘনিষ্ঠতা যেমনটি দেখা যায়, আবার সঙ্গে অন্তরঙ্গতার টানাপড়েন বা কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্ব ও মনোমালিন্যের আভাসও থাকে।

আঙ্গিকে অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজ়মের অনুপ্রেরণা লক্ষ করা যায়, যা হয়তো তরুণ শিল্পীর পক্ষে স্বাভাবিক। সায়নীর কাজ, সে ক্যানভাস, কাগজ বা কাঠের প্যানেলের উপরেই হোক না কেন, স্বচ্ছ রঙের ওয়াশের দ্বারা (প্রলেপ দিয়ে) এবং স্তরীভূত রঙের শেডে করা। মূলত চারুকলা, জলরং এবং ডিজিটাল আর্টের ক্ষেত্রে যে রকম করা হয়।

স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

শিল্পীর চিত্রগুলি বিমূর্ত নয়, আবার পুরোপুরি আলঙ্কারিকও নয়। ওঁর ‘স্টেইন্ড’ সিরিজ়ে অ্যাক্রিলিক ছাড়াও রজক পদার্থ, যা দিয়ে রং তৈরি হয় এবং মডেলিং পেস্টের ব্যবহার রয়েছে। এর সাহায্যে ক্যানভাসে টেক্সচার এনে লেয়ারে কাজ করতে করতে, অবচেতন বাসনাগুলি স্বপ্নের মত ক্যানভাসের আঙিনায় ধরা পড়েছ। অতি সূক্ষ্ম ভাবে হালকা হাতে পজ়িটিভ ও নেগেটিভ জায়গা সৃষ্টি করেছেন তরুণ শিল্পী। তাঁর ফর্মগুলো পরিপূর্ণতা পায় না। প্রেমের অপূর্ণতা বা টুকরো টুকরো খণ্ডিত মূর্তি হয়তো চরিত্রগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনে, অথবা সেটাকে মানসিক ভ্রম বলেও ভাবা যায়।

বিভিন্ন উপায়ে সায়নী সরকার সীমিত রঙে এবং ডিটেলবর্জিত বয়ানে সম্পর্কের জটিলতা, সততার অভাব এবং কৃত্রিমতা সুন্দর ভাবে ধরেছেন।

অন্য দিকে, দলীয় প্রদর্শনীটিতে পরিণত মনের ছবির সঙ্গে নতুন শিল্পীদের ছবিও সাজানো ছিল। এটির নাম ‘অ্যান এনশিয়েন্ট ব্যালাড’, অর্থাৎ প্রাচীন গীতিকাব্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত যেন একটি সুর বা প্রতিধ্বনি, যা অপূর্ব।

প্রদর্শনী শুরু করা হয়েছে ললিতমোহন সেনের ভূদৃশ্য দিয়ে। তারপর অরুণিমা চৌধুরীর কাজের ভিতর দিয়ে কার্তিক পাইন, অজিত কুমার দাস, অলকানন্দা সেনগুপ্ত, চন্দ্র ভট্টাচার্য, পার্থ দাশগুপ্ত, রাজা বোরো, সন্দীপ কংসবণিক, সুব্রত বিশ্বাস, তাপস বিশ্বাস এবং রাহুল সরকারের কাজ দিয়ে শেষ করা হয়েছে।

অরুণিমা চৌধুরী বহু মাধ্যমে কাজ করেন। এখানে তাঁর কাজ হ্যান্ডমেড কাগজে প্রাকৃতিক রঙে করা। প্রকৃতি এবং নারীর মন ও অবয়ব যেন অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। ছোটবেলায় প্রকৃতির কোলে মানুষ হওয়া এই শিল্পী প্রকৃতিকে যেন ছাড়তে পারেন না। মানুষের সঙ্গে পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরতার ছবিগুলি মূর্ত হয়ে দেখা দেয়।

স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

স্বপ্নিল: ইমামি আর্টে সায়নী সরকারের একক প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

অলকানন্দা সেনগুপ্তর ‘প্রত্যেক নারীর আছে একটি গল্প’ সিরিজ়ের ‘আমেজ়ড’ মূর্তিগুলি টেরাকোটা এবং এনগোবে— যা সেরামিক ভাস্কর্য বানানোর সময়ে ব্যবহার করা হয়, তাই দিয়ে সেরামিকের যে কাজগুলো দেখিয়েছেন, সুন্দর সেই সব মূর্তি যেন নারীদের গুপ্তকথা। এরা সকলেই যেন স্তম্ভিত, নিজেদের জীবনের অপার অসহায়তা এবং তা পরিবর্তন করার ক্ষমতার অভাবে।

চন্দ্র ভট্টাচার্যের ছবিতে শিল্পী যেন প্রকৃতিকে এক নতুন চোখে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মানুষ নিজের অজ্ঞানতার বশে যুগে যুগে প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে আর নিজেকে ভেবেছে অবিনশ্বর। চন্দ্রর ছবি যেন মানুষকে জমি, জল এবং আকাশবাতাসের সঙ্গে লড়াই ছেড়ে প্রকৃতিকে ভালবাসার কথা বলে।

কার্তিক চন্দ্র পাইন নিজস্ব একটি স্টাইলে স্মৃতিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শৈলীগত অনন্যতা প্রত্যাখ্যান করে নানা ধরনের আধুনিক ছবি এঁকেছেন।

পার্থ দাশগুপ্তের সেরামিক ভাস্কর্যে মনুষ্যসভ্যতার সঙ্গে মাটির সম্পর্কের কথা বলেছেন। এঁর ‘দেশের মাটি’ কাজটিতে মাটি নিজেই যেন অন্তর ও বহিরঙ্গ পরিবর্তন করেও, সম্পূর্ণ নিজস্বতা বজায় রেখে একটি ভাস্কর্যে পরিণত হতে চেয়েছে। জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন হয় এই ভাবে।

রাহুল সরকার প্লাইউডের উপরে এনগ্রেভ করে তার উপরে অ‍্যাক্রিলিক এবং কাচের মার্কার কলমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছেন। আত্মানুসন্ধান থেকে এঁর শিল্পের জন্ম। শিল্পী তাঁর যৌন পরিচয়ের কারণে জীবনে যত অপমান, অসম্মান, প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন, সেই জায়গা থেকে একান্ত আন্তরিকতা দিয়ে নিজের শিল্পরচনা করেছেন। সেখানে এক একটি মানুষের মুখ শুকনো গাছের ডালে আবৃত। রাহুলের কাজ বহু জায়গায় সময় স্মৃতি এবং নশ্বরতা দিয়ে অলঙ্কৃত। অন্তরঙ্গতা এখানে শুধুই যেন স্মৃতির অংশ আর সেই স্মৃতি তাঁর ছবিতে প্রায়ই শুকনো ফুল হয়ে ঝরে পড়ে।

এ ছাড়াও সুব্রত বিশ্বাস এবং তাপস বিশ্বাসের কাজ দেখা গেল,যাঁরা দু’জনেই ভাস্কর। সুব্রত কাজ করেন ব্রোঞ্জ, মজবুত ধরনের টেরাকোটা এবং কাঠে। তাপস ব্রোঞ্জ, লোহা এবং মিশ্র মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরের গণশিল্প-স্রষ্টা।

সব মিলিয়ে সমৃদ্ধ হওয়ার মতো দু’টি প্রদর্শনী উপহার পেলেন শহরের শিল্পরসিকেরা।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Emami Art Gallery artist

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy