সম্প্রতি গ্যালারি ৮৮-তে যে প্রদর্শনীটি হয়ে গেল, তার নাম ‘রেসিলিয়েন্স রেভারি অ্যান্ড রিটার্ন’। প্রার্থনা হাজরা, পোর্শিয়া রায় এবং মৌসুমী রায়ের শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল এই প্রদর্শনী।
শিল্পী মৌসুমী রায়ের দেখা মানুষ, পশু, স্মৃতি ও স্বপ্নচারণ... সমস্ত যেন একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছে তাঁর সব ভাস্কর্য। লোকসাহিত্যের নানা গল্প এবং ঐতিহ্যের সাহায্যে, সাধারণ ঘটনার চেয়ে গভীর দার্শনিক কথাকে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তিনি। যেমন, তাঁর একটি ভাস্কর্যে বিড়ালের গায়ে এক মাকড়সার উপস্থিতি। বাস্তবে একটা ছোট পোকাকে ঝেড়ে ফেললেই হয়, কিন্তু বিড়ালের মানসিক জগতে মাকড়সা যে ভয়ের সঞ্চার করেছে, শিল্পী সেটি তুলে ধরেছেন। ওই প্রাণীটির চোখ বিস্ফারিত, ভয়ে সন্ত্রস্ত। এই মাকড়সা প্রতীকী। শিল্পীর মতে, অতি সাধারণ ঘটনা যদি মনে ভয় সঞ্চার করে, আবেগের দুর্বলতায় মর্মে প্রবেশ করে, তা হলে সেটি তাকে অচল-অনড় করে দিতে পারে।
আর একটি ভাস্কর্যে দেখা গেল বরাহের স্ত্রী-শক্তির আবির্ভাব। এই স্ত্রী-বরাহের কোলে একটি শঙ্খ। মূর্তিটি ভয়ের উদ্ভব করে না, এ যেন মানসিক শক্তি এবং শান্তির প্রতীক। এঁরই অধিস্থাপনে শঙ্খ রেখে এই মূর্তিটিকে আধ্যাত্মিকতায় নিমজ্জিত করেছেন মৌসুমী।
অপর একটি মূর্তি বেশ আকর্ষক। একটি মানবশরীর কামাসক্তিতে জর্জরিত হয়ে প্রাপ্ত হয়েছে টিয়াপাখির মস্তক-সমৃদ্ধ কামদেবের শরীর। নাম রাখা হয়েছে কামদেব। তাঁর বাহন টিয়াপাখি। আর এই ভাস্কর্যটি প্রেমের বাহক, যিনি কবিতা বলেন। ভালবাসার বীজ বপন করেন মানুষের মনে। প্রণয়লীলায় মত্ত থাকেন।
প্রতিমূর্তি: গ্যালারি ৮৮-এ আয়োজিত তিন শিল্পীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
মৌসুমী রায়ের কাজগুলি মানুষ, পশু-পাখি, স্বপ্ন, স্মৃতি ও পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে একসূত্রে গাঁথা এক মনস্তাত্ত্বিক রূপকথা যেন! রাল্ফ এমারসনের ‘ফেব্ল’-এর মতো অনেকটা। তাঁর কাজের মাধ্যম সীসা-মুক্ত স্টোনওয়্যার অথবা পাথর, সেরামিকের কাজ। প্রথমেই ভাস্কর্যগুলিকে ১২০০ ডিগ্ৰি সেন্টিগ্ৰেডে পোড়ানো হয়েছে। তার পর রং বসিয়ে সেগুলিকে গ্লেজ় করে সোনার প্রলেপ দিয়ে আবার গ্লেজ়িংয়ের মাধ্যমে রূপ দিয়েছেন।
পোর্শিয়া রায় চেন্নাইয়ে থাকাকালীন এক অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করেছিলেন, যা তাঁর কাজে প্রতীয়মান। গভীর ভাবে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে ভালবেসে সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। সেই মানুষেরা, বিশেষত সেই মহিলাদের এক বর্ণময় উপস্থিতি লক্ষ করা যায় চেন্নাই-এর রাস্তাঘাটে। এঁরা বাজারে সবজি, মাছ বিক্রি করেন, ফুলের মালা গাঁথেন ফুটপাতে বসে, স্কুটারের পিছনে বসিয়ে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যান... এই নারীজগৎ যেন সংসার-সমুদ্রে একরাশ পালছেঁড়া নৌকার মতো। কিন্তু এঁদেরই রূপে, রঙে পোর্শিয়া দেখিয়েছেন সূর্যের ঠিকানা।
দশ-বারোটি বড় বড় ছবিতে প্লাইউডের উপরে এনগ্ৰেভিং করে, তার উপরে উজ্জ্বল অ্যাক্রিলিক রঙে অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি করেছেন শিল্পী। ‘বিনিথ দ্য টাওয়ার’ সিরিজ়ের একটি ছবিতে এক শ্রমিক-মা তাঁর মেয়েসন্তান কোলে অবাক চোখে দর্শকের দিকে তাকিয়ে। শাড়ির রং সিঁদুরে লাল। ‘বিনিথ দ্য টাওয়ার’-এর অন্য একটি ছবিতে দূরে বিত্তবান মানুষের প্রাসাদ, তার পাশে এই রমণী যেন শক্তির প্রতিমূর্তি। সেই নারী বেলুন বিক্রি করছেন, গায়ে গাঢ় গোলাপি কামিজ়, নীচে হলুদ সালোয়ার, হাতে একগোছা আকাশছোঁয়া বেলুন। মিনারের মতো ব্যক্তিত্বময়ী, আপন গরিমায় উচ্চশির এই নারী।
আর একটি ‘বিনিথ দ্য টাওয়ার’-এ শিশুসহ এক জননী পোঁটলা কোমরে বেঁধে, মাথার ঝুড়িতে মিনিয়েচার টাওয়ার নিয়ে চলেছেন। কী অসম্ভব মানসিক শক্তি ও সামর্থ্যেরচিত্র এটি!
প্রতিমূর্তি: গ্যালারি ৮৮-এ আয়োজিত তিন শিল্পীর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।
‘টু চেন্নাই উইথ লাভ’ সিরিজ়ে চেন্নাইয়ের সাধারণ মানুষের সাজে চড়া রং ব্যবহার শিল্পীর। এঁদের পোশাক তো বটেই, ব্যক্তিত্বও বড় রঙিন। এগুলো ১৯২৪-এর ছবি। এক ডাববিক্রেতা মহিলার হাতে বৃহৎ একটি খাঁড়া যেন আদ্যাশক্তির রূপক। দেবী চামুণ্ডার মতো এক হাতে খাঁড়া এবং অন্য হাতে ডাব নিয়ে দাঁড়িয়ে সেই নারী। খেটে-খাওয়া মানুষের মধ্যে দেবীতুল্য ব্যক্তিত্ব ফুটিয়েছেন শিল্পী।
এই সিরিজ়ের একটি ছবিতে দেখা যায় এক পুরোহিতকে, যে ছবির শিরোনাম, ‘আ রিভার্সাল অব গেজ়’। এক উগ্ৰধর্মী পূজারি ডান হাতে জ্ঞানমুদ্রা ধারণ করে, বাম হাতে জপমালা নিয়ে যেন চ্যালেঞ্জ করছেন ভিন্নধর্মী মানুষকে। এই ছবিতে খানিক বিদ্রুপের ছোঁয়া লেগেছে।
তবে পোর্শিয়া রায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি ‘হোম ইজ় হোয়্যার আই প্রেফার টু ডাই’। একটি পুরুষমূর্তি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে দীর্ঘায়িত তার দেহ, মুখে মাস্ক, দুই হাতে মালপত্র নিয়ে সে ঘরমুখী। যেন বলতে চাইছে, অনেক দিন ধরে, বহু পথ হাঁটার পরে একটি মুখ আমায় টানে— সেটাই আমার দেশ।
ছাপচিত্রের থেকে কিছু দিন বিরতি নেওয়ার পরে শিল্পী প্রার্থনা হাজরা সম্পূর্ণ অন্য ভাষায় ইংরেজি বর্ণমালার ২৬টি বর্ণ নিয়ে দারুণ কাজ করলেন। এঁর কোনও কাজই ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যে করা নয়। ইংরেজি ‘এ’ অর্থে চেষ্টা, ‘বি’ অর্থে ভারসাম্য, ‘সি’ অর্থে যোগাযোগ— এই ভাবে প্রত্যেকটি বর্ণ নিয়ে কাজ করেছেন শিল্পী। এ যেন সহজ পাঠের শিক্ষাগত মর্ম থেকে সরল সব আঁকা।
প্রার্থনার কাজের প্রথম কথা একটি রেখা। রেখাটি সুতো, কিংবা রাস্তা অথবা সীমানা। এই রেখা তাঁর কাছে জীবনের এক চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাস্বরূপ। মননশীল শিল্পী প্রত্যেকটি প্রিন্টেই রেখেছেন রেখা, যার ভিন্ন অর্থ রয়েছে। রেখা তাঁর কাছে জীবনের এক চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। শিল্পীর মতে, শিল্পপ্রচেষ্টা মানে শুধুই সাফল্য নয়। তাতে থাকে আত্মবিশ্বাসের অভাব, ব্যর্থতা, পর্যবেক্ষণ, বিলম্ব, অধ্যবসায় এবং নতুন করে গড়া।
প্রার্থনার কাজের বৈশিষ্ট্য হল, তিনি সাধারণ ছাপাইচিত্র ব্যবহার করে, তার উপরে এমবসিং করেন। যাতে চিত্রটি কাগজ ছাপিয়ে মাথা উঁচু করে থাকে। তখন বোঝা যায় যে, শিল্পী দেখিয়েছেন বর্তমানের অবস্থা এবং এমবসিংয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে বর্তমানের উপরে অতীতের প্রভাব। শিল্পীর তিনটি শিল্পকর্ম উল্লেখযোগ্য— ‘অবজ়ার্ভ’, ‘প্রোক্র্যাস্টিনেট’ এবং ‘এক্স’। ‘অবজ়ার্ভ’ শিল্পীকে নিজের যাত্রা সম্পর্কে চিন্তাশীল রাখে। ‘প্রোক্র্যাস্টিনেট’-এ শিল্পী বলতে চেয়েছেন যে, অসম্পূর্ণ শৈল্পিক প্রচেষ্টাও প্রয়োজনীয়। কারণ, এগুলিই ভবিষ্যৎ শিল্পকর্মের বীজ ধারণ করে। প্রার্থনার কাজ যেন তাঁর সৃজনশীলতার প্রক্রিয়ায় উপরে একটি শান্ত, সমাহিত ধ্যানপ্রক্রিয়া, যা তাঁর দক্ষতার প্রচারস্বরূপ নয়।
পরিশেষে বলা যায়, তিন শিল্পীর স্বতন্ত্র সম্মিলনে এই প্রদর্শনী সব অর্থেই হয়ে উঠেছিল সার্থক।