তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাস্কর্য নিয়ে কাজ করছেন সুতনু চট্টোপাধ্যায়। তাঁর শিল্পভাবনায় জ্যামিতি নিছক কোনও নির্মাণ পদ্ধতি নয়। বরং পৃথিবীকে দেখার এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯৯০ সালে কলাভবনে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর শিল্পজীবনের যাত্রা শুরু, তবে তার ভিত তৈরি হয়েছিল আরও অনেক আগে। ছোটবেলা থেকেই মাটির প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। বর্ধমানের মল্লিকপুর গ্রামে কুলদেবতা অন্নপূর্ণার পুজোর জন্য কাটোয়া থেকে আসা নীলকণ্ঠ মিস্ত্রির মূর্তি তৈরির কাজ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। নিজেও হাত লাগিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা প্রথম বার তাঁর মধ্যে ভাস্কর্যের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। সম্প্রতি গ্যালারি ৮৮-র কর্ণধার সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় আয়োজন করেছিলেন ‘এনকোয়্যারিং ফর্মস’ নামে এক প্রদর্শনী, যেখানে দু’টি তল জুড়ে দেখা গেল শিল্পী সুতনুর অভিনব শিল্পকর্ম।
রূপকল্প: শিল্পী সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর ঝলক।
কলাভবনে প্রথম দু’বছর নিয়ম অনুযায়ী নানা মাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তৃতীয় বর্ষে ভাস্কর্য বেছে নেন সুতনু। শর্বরী রায়চৌধুরী, বিপিন গোস্বামী, অজিত চক্রবর্তী, বিকাশ দেবনাথ, সুষেণ ঘোষ প্রমুখ শিক্ষকের সান্নিধ্য তাঁর শিল্পচিন্তাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। তাঁদের অল্প কথায় কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা আজও তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে। সোমনাথ হোরের “খালি কাজ করে যাও। অনেক পথ বাকি” কিংবা সনৎ করের “পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যাও”... এই পরামর্শ তাঁর শিল্পীজীবনের অংশ হয়ে আছে। আর একবার কলকাতায় থাকার সময়ে একটি ঘরের দেওয়ালে কাঠকয়লায় অজস্র লেখা পেয়েছিলেন শিল্পী। তার মধ্যে একটি ছিল— “বসে বসে মরচে পড়ার চেয়ে, ঘষে ঘষে ক্ষয় হয়ে যাওয়া অনেক ভাল।” বাক্যটি তাঁর কাছে আজীবনের মূলমন্ত্র হয়ে যায়।
রূপকল্প: শিল্পী সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর ঝলক।
সুতনুর শিল্পযাত্রার প্রথম দুই দশক ব্রোঞ্জ ও পাথরের মতো ভারী উপাদান ছিল মূল অবলম্বন। ভর, ওজন এবং মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে ভাস্কর্যের যে দীর্ঘকালীন সম্পর্ক, শিল্পী সেই প্রচলিত ধারণাকেই বিমূর্ততার মধ্যে নতুন ভাবে পরীক্ষা করেছেন। ভারী বস্তুর দৃশ্যমান ভরের বিপরীতে এ বার তাঁর আগ্রহ গিয়ে পৌঁছেছে শূন্যতার ভরের কাছে। এই পরিবর্তনই তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাঁর অনুসন্ধান বদলেছে। যেমন পড়ে থাকা প্যাকেজিং উপকরণের ভিতরের ফাঁকা জায়গায় আবিষ্কার করা এক সম্ভাবনাময় অস্তিত্ব। এখানে শিল্পীর ভূমিকা অনেকটা প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো। জ্যামিতিক অনুশীলনকে সমকালীন বর্জ্য সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে প্রতীকী চেতনায় গড়ে তুলেছেন তিনি।
শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের ভাস্কর্য দেখার অভিজ্ঞতাও তাঁর শিল্পীজীবনের এক বড় মোড়। প্রথম দিকে তাঁর কাজে রামকিঙ্করের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। শক্তিশালী ড্রয়িং, জোরালো গঠন এবং বাস্তবের ভিতর থেকে বিমূর্ততার দিকে যাওয়ার যে ক্ষমতা রামকিঙ্করের কাজে রয়েছে, তা তাঁকে গভীর ভাবে আকৃষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে সেই প্রভাব থেকে তিনি নিজের পথ আলাদা করেন। কিন্তু কাজের মধ্যে রয়ে গিয়েছে সেই শক্তির অনুরণন। প্রথম দিকের কাজ ছিল ক্রমশ ভারী, বৃহৎ এবং মনুমেন্টাল। ব্রোঞ্জ ও পাথরের উপকরণে তৈরি ভাস্কর্যে ভর, আয়তন এবং মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের নিরন্তর লড়াই দেখা যায়। তাঁর কাজ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে— নন্দনমেলা, বেঙ্গল অম্বুজা কিংবা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটেও।
রূপকল্প: শিল্পী সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর ঝলক।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কাজের ভাষায় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কাগজের প্যাকিং বক্স, বোতল, থার্মোকলের মতো পরিত্যক্ত বা সাধারণ বস্তুতে তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাদের ‘নেগেটিভ’ অংশের জ্যামিতিক সম্ভাবনা। কোনও প্যাকিংয়ের ভিতরের ফাঁকা জায়গায় তিনি দেখেছেন সিটিস্কেপ, কোনও অচেনা আকৃতিতে অনুভব করেছেন জীবন্ত কোনও সত্তার উপস্থিতি। সেই নেগেটিভ জায়গায় প্লাস্টার ঢেলে কাস্টিং করার পর প্যাকিংয়ের নিজস্ব ছাপও থেকে যাচ্ছে ভাস্কর্যের শরীরে।
এই অনুসন্ধান থেকেই এসেছে তাঁর নতুন কাজ— ‘আরবান’, ‘আনআইডেন্টিফায়েড’, ‘গায়নয়েড’ প্রভৃতি। ‘আরবান’-এ বার্ডস আই ভিউ থেকে দেখা নগরের ইঙ্গিত, আবার ‘গায়নয়েড’-এ নারীর উপস্থিতি সরাসরি নয়, চুলের বিনুনির সামান্য আভাসে যেন একটি মানবিক রূপ তৈরি হয়। এখানে স্থাপত্যধর্মী কাঠামোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘আনআইডেন্টিফায়েড অবজেক্টস’-এ সবুজ পাতিনার মধ্যে চেনা বস্তুর আভাস থাকলেও, নির্দিষ্ট করে চেনা যায় না। বাস্তবকে হুবহু অনুকরণ না করে তার ভিতরের জ্যামিতিকে খুঁজে নেওয়াই তাঁর কাছে শিল্পের অন্যতম অনুসন্ধান।
রূপকল্প: শিল্পী সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর ঝলক।
এই একই অনুসন্ধিৎসা তাঁর ড্রয়িংয়েও। প্রায় নিয়মিতই আঁচড়, রেখা ও বিভিন্ন ছন্দের মধ্য দিয়ে তিনি কাজ করেন। তিন হাজারের মতো ড্রয়িং থেকে নির্বাচিত প্রদর্শিত কাজের মধ্যে দেখা যায়, কোথাও লম্বা ঠোঁটের পাখি, কোথাও ষাঁড়ের মতো আকৃতি এবং মানবদেহের প্রতীক। এ সবই জেল পেন, চাইনিজ় ইঙ্ক ও ব্রাশের মাধ্যমে সঙ্গীতের লয়কারির মতো ড্রয়িংয়ের ছন্দ তৈরি হয়। একটি ড্রয়িং শেষ কাজের প্রস্তুতি না হয়েও পরবর্তী রূপের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষত জ্যামিতিক কাঠামোর ভিতর রেখার অসংখ্য পরস্পরছেদী স্তর কোথাও জীবজগতের ইঙ্গিত, কোথাও কোনও অজানা যন্ত্রের আকৃতি। এগুলিকে স্কেচ না বলে তাঁর সৃষ্টির প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেও দেখা যায়।
রূপকল্প: শিল্পী সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের প্রদর্শনীর ঝলক।
প্রদর্শনীর কাজগুলির দিকে তাকালে তাই বোঝা যায়, সুতনু চট্টোপাধ্যায়ের অনুসন্ধান আসলে ফর্মের ভিতরে ফর্ম খোঁজা। অর্গ্যানিক আকৃতির মধ্যে জ্যামিতি, কঠিন ভরের মধ্যে শূন্যতা, বাস্তবের মধ্যে বিমূর্ততার সম্ভাবনা— এই দ্বন্দ্বই তাঁর শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলি সেই দীর্ঘ যাত্রারই নতুন অধ্যায়, যেখানে ফেলে দেওয়া উপকরণও হয়ে ওঠে নতুন রূপ আবিষ্কারের সূত্র। অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে তোলার এক নিরন্তর যাত্রা।