সম্প্রতি গ্যালারি সংস্কৃতি ও কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটির যৌথ আয়োজনে শিপ্রা ভট্টাচার্যের ৫০ বছরের কাজের রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনী হয়ে গেল কেসিসি-তে। প্রদর্শনীর নাম, ‘ইন ব্লুম’। এখানে তাঁর ৮৬টি চিত্রকর্ম ছিল, তিনটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য এবং পাঁচটি ফাইবারগ্লাস ভাস্কর্য। সমকালীন ভারতীয় শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক শিল্পী শিপ্রা ভট্টাচার্য।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানের স্নাতক হওয়ার পরে গভর্নমেন্ট আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট কলেজে শিল্পশিক্ষার সূচনা এবং কলেজ অব ভিসুয়াল আর্টসে সেই শিল্পশিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। তার পরে তাঁর প্রদর্শনীর সূচনা কলকাতায়, ১৯৭৯ সালে। নিজের শহরে এবং বাইরে বহু প্রদর্শনী করেছেন শিপ্রা।
১৯৮১ সালে শিপ্রা ভট্টাচার্যের প্রথম একক প্রদর্শনী আয়োজিত হওয়ার পরে তাঁর শিল্পের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতেই। কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থে কলকাতার এক নিজস্ব শিল্পী। ‘বাগান’ নামে নিজের ভালবাসার এক আবাসে তাঁর স্টুডিয়ো। অ্যাকাডেমিক আর্টে শিক্ষাগ্ৰহণ করার পরে, খুব তাড়াতাড়ি সম্পূর্ণ নিজস্ব এক শিল্পের ভাষা গড়তে পেরেছেন শিপ্রা।
তাঁর ১৯৭৮-’৭৯ এবং ৮০’র দশকের ছবিতে কলকাতার ঘনিষ্ঠ পরিচয় পাওয়া যায়। উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে থাকার কারণে সেখানকার জীবন খুবই কাছ থেকে দেখেছেন। কলেজ স্ট্রিটের বিশাল সব বইয়ের দোকান এবং ফুটপাতের বইয়ের স্টলে যে সব কুলি বই মাথায় করে নিয়ে আসতেন, তাঁদের জীবনের ছবি এঁকেছেন। পাশের বাড়ির উঠোনে পাড়ার মুটে সম্প্রদায় নিজেদের খাবার বানাতেন, রাতে সেখানেই শুয়ে পড়তেন। ওঁদের ঘুমোনোর ভঙ্গি, পোশাকের ডিজ়াইন ও টেক্সচার সব দেখেছেন অবাক বিস্ময়ে এবং স্মৃতিপটে ধরে রেখে সেই সব মানুষের জীবনযাত্রার অপরূপ সব ছবি এঁকেছেন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ছবি প্রচুর করেছেন শিপ্রা সেই সময়ে। এক ধরনের রাজনৈতিক চেতনাও কাজ করত তাঁর মনে। নকশাল আন্দোলন, বোমাবাজি, ক্লাস বন্ধ... ইত্যাদির ভিতর দিয়ে যখন হেঁটেছেন তরুণ শিল্পী, তার ছবিও তোলা ছিল মনের আয়নায়।
শিল্পীর ’৭৯ সালের কিছু ল্যান্ডস্কেপ আছে, যেগুলো বোর্ডের উপরে তেলরঙে করা। চরম এক শান্তি ধরা পড়েছে ওই কাজগুলিতে। কোথাও গ্ৰামীণ কুটিরের রংচটা দেওয়ালের গায়ে নির্জনতার প্রলেপ, আবার কোথাও পাথরের স্তরে স্তরে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে একটি মন্দির ছাড়িয়ে আরও উপরে। সূর্যের আলো এসে পড়েছে তেরছা ভাবে এবং দর্শকের দৃষ্টি টেনে নিচ্ছে উপর দিকে। এটি মোনোক্রোম্যাটিক ভার্টিকাল সুন্দর একটি ছবি। আশির দশকের ‘পিপল’ সিরিজ়ে সাধারণ মানুষের ছবি দেখা গেল কাগজে প্যাস্টেল পেনসিলের কাজে, যেখানে হাইলাইটগুলি কাগজ ছেড়ে করা। খুব সূক্ষ্ম, নিয়ন্ত্রিত ও ধৈর্যশীল রেখার কাজ। নব্বইয়ের দশকের কাজে এসেছে রং। কোথাও ক্যানভাসে তেলরঙের ছবি। আবার এই সিরিজ়েই কাগজে কালি এবং চারকোলে মহিলাদের অসহায়তা এবং সামান্য প্রতিবাদও দেখিয়েছেন শিল্পী তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরে। ’৮৪ সালের ‘পিপল' নামের কাজে কাতারে কাতারে স্ত্রী-পুরুষ অপর্যাপ্ত জলের জন্য হাঁড়ি-কলসি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে জলের অপেক্ষায়, যেন স্থবিরতার প্রতীক।
এর পরের পর্যায়ে শিল্পীর ছবিতে সম্পূর্ণ অন্য জিনিস এসেছে। এখানে আগত তাঁর ‘ডিজ়ায়ার’ সিরিজ়। সুডৌল নারীমূর্তি গড়তে তিনি কার্পণ্য করেননি। সে নারী যেন পৃথিবীকে ধারণ করেছে। নদীর কাছে চলমান জীবনের পটভূমিতে এক নারী। আবার কখনও সে আকাশে উড়ে যেতে চায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোনও ছবিতেই নারীর কোনও উগ্র রূপ নেই। অসম্ভব শান্ত, সমাহিত এক পৃথিবীর ধারক এই নারী। এখানে শিপ্রা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। জলের সঙ্গে কামনা-বাসনা জড়িয়ে আছে তাঁর আঁকা রমণীর। জলের প্রবহমানতা, তার সঙ্গে দীর্ঘ চুল এলিয়ে, গভীর কামনায় ভরা, সমাহিত এক মেয়ে। কখনও ফুল বা হাঁস দেখিয়েছেন লিঙ্গের প্রতীক হিসেবে।
এই ছবিগুলি সবই ক্যানভাসের উপরে অ্যাক্রিলিক এবং তেলরঙে করা। তাঁর ছবির জায়গার বিন্যাস অর্থাৎ পজ়িটিভ ও নেগেটিভ স্পেস বিভাজন অনবদ্য। রূপ, রেখা ও রঙের বিন্যাসে সম্পূর্ণ রূপে নিজস্বতা বিরাজমান। ছবিতে অস্বস্তি, নিঃসঙ্গতা, বিস্ময় থাকলেও শিপ্রার ছবি শেষ পর্যন্ত আনন্দময়।
এখানে ‘হি’ নামের একটি ছবিতে এক মধ্যবয়সি পুরুষকে দেখা যায়, যার জীবনের বেশ কিছু বছর কেটে গিয়েছে আপাত-সুখে কিন্তু মন চলে যায় দূরের এক কাল্পনিক দ্বীপে, যেখানে হয়তো আরও সুখ, আরও আনন্দের সন্ধান আছে। কোথাও যেন অসন্তোষের কথা বলছেন।
ছবিতে অসংখ্য খুঁটিনাটি নকশা চোখে পড়ে। সেই ভাবে দেখতে গেলে ম্যাক্সিমালিস্ট কাজ তাঁর। রমণীর অন্তর্দর্শন, ভাবনা, প্রতিফলন এবং পর্যবেক্ষণ ফুটে ওঠে। প্রচুর সাহসের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ছবিতে। তাঁর আঁকা মেয়েরা সুন্দর, অনুভূতিপ্রবণ, সঙ্কোচহীন, স্বপ্ন ও কামনায় পূর্ণ, কিন্তু আশাবাদী।
প্রদর্শনীতে ঢুকেই যে কাগজের নৌকাগুলি দেখা গেল, সেগুলিতে ফাইবার গ্লাসের উপরে অ্যাক্রিলিক রঙে করা অপূর্ব এক শিল্পচিন্তার পরিচয়। কাগজের কাজের ওজন এখানে অপরিসীম। তাঁর ছবির ভাষা বদলায় না ভাস্কর্যেও। এখানেও ছবির মতোই নীরবতা। কিন্তু নৌকাগুলি একটি করে গল্প বলে। ওরা দর্শককে নিজের জীবনের স্মৃতি মাখিয়ে শৈশবের দিকে নিয়ে যায়, সময়ের প্রবাহের কথা বলে, আবার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের এবং ভবিষ্যতের আশায় ভঙ্গুরতারও ইঙ্গিত দেয়। নৌকার নীচে আয়না রেখে কিউরেটর জোনাকি ভট্টাচার্য ভারী সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন এই ইনস্টলেশন। শিপ্রা ভট্টাচার্য সাধারণকে অসাধারণ করেছেন তাঁর এক-একটি ভাস্কর্যে।
সমকালীন শিল্পী অর্পিতা সিংহ তাঁর ছবিতে যুদ্ধ, ইতিহাস, নারীজীবন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বিস্ময়কর চিত্রভাষায় রূপ দিয়েছেন। আর শিল্পী শিপ্রা ভট্টাচার্য যে মানুষের অন্তর্জগতের নীরবতা, প্রকৃতি ও নারীর মনোজগতকে কাব্যিক রূপ দিয়েছেন, তার প্রতিফলন দেখা যায় এই প্রদর্শনীতে।