রবীন্দ্রসদনে গত ২৬ জুলাই ‘জগন্নাথ মঙ্গলম’ মঞ্চস্থ করলেন সৃজন চট্টোপাধ্যায় ও সহশিল্পীবৃন্দ। রথযাত্রার এমন এক অভিনব আঙ্গিকে উপস্থাপনা— রসিক দর্শকমণ্ডলীও যেখানে উপস্থাপনার অংশ হয়ে ওঠেন— প্রশংসার দাবি রাখে। দর্শকদের মধ্য দিয়ে কীর্তনিয়ার দল সংকীর্তন করতে করতে মঞ্চে প্রবিষ্ট হন আর তখন থেকেই দর্শকেরা অনুষ্ঠানের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিলেমিশে যান। তাঁরা যেন তখন শুধু দর্শক নন— শ্রীজগন্নাথের ভক্তমণ্ডলী, রথযাত্রা প্রত্যক্ষ করছেন।
বাংলার চিরন্তন সঙ্গীত কীর্তন ও কথকতাকে অনুষ্ঠানে অঙ্গীভূত করেছেন সৃজন। নানা ধরনের কীর্তনে সমৃদ্ধ এই কাহিনির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন সৃজন চট্টোপাধ্যায় ও শুভ জোয়ারদার। উদাত্ত কণ্ঠে সৃজনের নাটকীয় গানের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন শুভমিতা দাশগুপ্ত, রাজশীর্ষ দাস, রূপশীর্ষ দাস ও দেবলীনা সরকার। পালাকীর্তনের রীতি অনুসারে ‘খোলমঙ্গলম’— দুই খোলবাদকের চমৎকার খোলবাদনে বিভিন্ন ঘরানার খোলবাদন শোনা গেল, যা বিশেষ প্রাপ্তি।
অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গীতে ছিলেন— শ্রীখোল ও পাখোয়াজে তুহিন সেনগুপ্ত, তবলায় অর্ক বন্দ্যোপাধ্যায়, কি-বোর্ডে বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী, বাঁশিতে স্বরূপ মুখোপাধ্যায় এবং পারকাশনে পঙ্কজকুমার দাস। ভক্তির এক অনন্য নিবেদন প্রকাশ পেয়েছিল এই সমবেত যন্ত্রসঙ্গীতে। গানের সঙ্গে নৃত্যের পদচারণা— সেও কীর্তন অনুসারী। তাঁকে নৃত্যে সহযোগিতা করেন কুশল সাহা, হৃদয় ভক্ত, রোহিত বসু, রনি চক্রবর্তী, সায়ন নাগ, শুভজিৎ অধিকারী, শুভম হালদার, শুভঙ্কর দাস, অনু বসু, বৃষ্টি দত্ত, দিয়া বসু, পল্লবী বসাক, সাবর্ণ রায়, সম্পূর্ণা সমাদ্দার, তিতলি সরকার, তৃষা ঘোষ, তৃষা সাহু এবং অশ্বিনী রায়।
রথের সামনে নৃত্যটির পরিকল্পনা ঊর্মিলা ভৌমিকের। বাকি নৃত্য পরিকল্পনা সৃজন চট্টোপাধ্যায়ের। মঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক শুভজিৎ দাস। শব্দক্ষেপণে পঙ্কজ দাস। আলোকসজ্জায় সোমেন চক্রবর্তী। মুখোশ নির্মাণে প্রলয় গোস্বামী। রথ নির্মাণে প্রবীর কয়াল, বাসুদেব রায়, প্রলয় দাস, বিশ্বজিৎ গুঁই, তিতান দাস, সুদীপ প্রামাণিক, তুহিন হালদার, অরিজিৎ মল্লিক এবং অপূর্ব ঘোষ। জগন্নাথ নির্মাণ ও রথ নির্মাণে এঁদের মুনশিয়ানার কথা উল্লেখ করতেই হবে। উল্লেখ্য মুহূর্তের মধ্যে শ্রীজগন্নাথ ও রথটির বদল খুবই চমকপ্রদ।
নৃত্য, নাট্য ও সঙ্গীতের নানা আঙ্গিক ব্যবহার করে জগন্নাথের কাহিনি বর্ণনা— যেন মঞ্চে নয়, পুরীতেই রথযাত্রা প্রত্যক্ষ করতে করতে দর্শকেরাও অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে যাচ্ছেন! অবশেষে পুরীর জগন্নাথের প্রসাদ দর্শক ভক্তদের হাতে তুলে দিয়ে, যাত্রা শেষ হল। অভাবনীয় পরিকল্পনা! জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার প্রান্তে ওবেরামাগাও নামে ছোট একটি গ্রামে যিশুর জীবনকাহিনি নিয়ে প্যাশন প্লে-র মঞ্চায়ন দেখেছি— যে প্যাশন প্লে রবীন্দ্রনাথকে ‘শিশুতীর্থ’ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সৃজনের সৃষ্টি ‘জগন্নাথমঙ্গলম’ও তেমনই অভিনব।
অনুষ্ঠান
সম্প্রতি কলাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ পার বাংলা আর ও পার বাংলার সুরে সুরে মেলবন্ধন ঘটল। সে দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী শিল্পী ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, এ পার বাংলার বর্ষীয়ান শিল্পী প্রমিতা মল্লিক, অগ্নিভ বন্দোপাধ্যায়, তানজিনা তমা, শিল্পী দেবাদিত্য। বর্ষীয়ান শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের কণ্ঠে ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’, ‘ভরা বাদর, মাহ ভাদর’ এবং ‘বাদলধারা হল সারা’ মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। প্রবাসী শিল্পী ড. ইমতিয়াজ় আহমেদের গান প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় বন্ধনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর কণ্ঠে ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গান দু’টি অনবদ্য। শিল্পী অগ্নিভ বন্দোপাধ্যায় তাঁর গানের সঙ্গে সঙ্গে যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা শিক্ষণীয়। তানজিনা ও শিল্পী দেবাদিত্যর গান যথাযথ। সে দিন সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সুদীপ্ত ঘোষ।