E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সুরস্নাত এক সঙ্গীত-সন্ধ্যা

এর পর শিল্পী বিলম্বিত ঝাঁপতালে একটি গৎ শুরু করেন। সন্তুরবাদনের পরিচিত পথেই লয়কারীকে অবলম্বন করে এবং গায়কির অঙ্গ স্পর্শ করে গৎ-এর রূপরেখা টানা হয়।

গৌরব দত্ত

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৬:৩১
তবলিয়া পণ্ডিত স্বপন চৌধুরী।

তবলিয়া পণ্ডিত স্বপন চৌধুরী।

সম্প্রতি জি ডি বিড়লা সভাঘরে অনুষ্ঠিত হল অখিল ভারতীয় সঙ্গীত কলা রত্ন সভা আয়োজিত সঙ্গীতানুষ্ঠান ‘সম্বাদ’। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের নবীন ও প্রবীণরা মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন অভিজ্ঞতার ধীর অনায়াস এক প্রয়াস, আবার কোথাও মেলে ধরলেন তারুণ্যের গতি ও উচ্ছ্বাস।

সন্তুরবাদক পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্যের পরিবেশনা দিয়ে এ দিন সন্ধ্যার সূচনা হয়। অতি পরিচিত রাগ ইমন, শত-তন্ত্রে প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে হয়ে চলে এর নবনির্মাণ, প্রতিটি ফ্রেজ়ের শেষে সায়াহ্নের নতুন এক-একটি রূপ উন্মোচিত হয়। স্বর এবং অনুরণনের উপর তরুণ ভট্টাচার্যের চারিত্রিক আধিপত্য পুরো আলাপ জুড়ে স্পষ্ট ছিল। পাশাপাশি সংযোজিত হয়েছিল খরজের তারে চাপ দিয়ে মীড়ের কাজ। শব্দপ্রক্ষেপণে মন্দ্র স্বরের ওজন কিঞ্চিৎ বেশি থাকলে এই মীড়ের কাজ ‘সোপোরি বাজ’-এর চেয়ে কম কিছু শোনাত না, আশা করা যায়। আলাপের থেকে অগ্রসর হয়ে শিল্পী জোড় এবং ঝালায় তার অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও লয়কারী প্রদর্শন করেন।

এর পর শিল্পী বিলম্বিত ঝাঁপতালে একটি গৎ শুরু করেন। সন্তুরবাদনের পরিচিত পথেই লয়কারীকে অবলম্বন করে এবং গায়কির অঙ্গ স্পর্শ করে গৎ-এর রূপরেখা টানা হয়। তবে এই অংশে বিশেষ পাওনা, জ্যোতির্ময় রায় চৌধুরীর তবলা সঙ্গত। কেবল অনবদ্য লয়কারীই নয়, সন্তুরের সুরেলা ঝঙ্কারের প্রতিও তার অসাধারণ সংবেদনশীলতা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। সন্তুরে পরবর্তী পরিবেশনা ছিল দ্রুত তিনতালের একটি গৎ। ইমনে স্বরবিন্যাস ও তারের অনুরণন যেন ছিল বৃষ্টিস্নাত সাঁঝতারার মতো স্পষ্ট, সপ্রতিভ। দ্রুত তান, ঝলমলে ছন্দোময় বাদনশৈলী এবং সুর ও তালবাদ্যের মধ্যে গতিশীল আদান-প্রদান দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। শিল্পীদের বোঝাপড়া এতটাই সাবলীল হয়ে উঠেছিল যে, সংক্ষিপ্ত সওয়াল-জবাবের অংশে একবারও ছন্দপতন হয়নি, যেন দুই যন্ত্র একে অপরের প্রাণের দোসর। ক্রমে উচ্চগতির লয়ে পৌঁছে একটি চমকপ্রদ তিহাই দিয়ে দুই শিল্পী তাঁদের বাজনা শেষ করলেন।

সন্তুরবাদনে পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য।

সন্তুরবাদনে পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য।

সন্ধ্যার দ্বিতীয় পর্বে বাজালেন প্রবাদপ্রতিম তবলাবাদক পণ্ডিত স্বপন চৌধুরী। বেছে নিয়েছিলেন তিনতাল। পরিচিত ভঙ্গিতে পুরব অঙ্গের উঠান, পেশকারের প্রতিটি ঝোঁকে, প্রতিটি অনাঘাতে, প্রতিটি আবর্তনে যতটা শোনার ছিল, ততটাই ছিল শেখার। স্মৃতির অতল থেকে অকস্মাৎ কুড়িয়ে এনে বাজালেন মাত্র সাত বছর বয়সে শেখা তীস্রো জাতির একটি কায়দা। দু’গুণ লয়ে নিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন তাঁর বহু দশকের সাধনায় অর্জিত হাতের ওজন, চাঁটির স্পষ্টতা শুনিয়ে। অপেক্ষারত শ্রোতাদের নিরাশ না করে বাজালেন এক অপূর্ব রেলা, যার গতিময়তার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছিল নৃত্যের লাস্য। সঙ্গে অবশ্যই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ‘ধির ধির’ বাণী অতি দ্রুত লয়ে গিয়ে হয়ে উঠছিল ঝরোখার নকশার মতো সূক্ষ্ম। বাজনা মধ্যলয়ে নিয়ে গিয়ে শিল্পী কয়েকটি অনাঘাত গৎ ও পুরনো দিনের গৎ বাজালেন। একই লয়ে এবং পরে দ্রুত লয়ে নিয়ে পেশ করলেন কিছু জটিল ও অল্পশ্রুত পড়ন্ত। দ্রুত লয়ে কিছুটা খেলার ছলেই বাজালেন কয়েকটা টুকরা, যেগুলির সমাপ্তি হচ্ছিল শুধু ডানহাতের বাণীর বিভিন্ন বিন্যাসের তেহাই দিয়ে। দ্রুত লয়ে পরিবেশনার একদম শেষ অংশে এসে শিল্পী বাজালেন তাঁর আর একটি অতিপরিচিত চার বার আবর্তন করে সমে আসা চৌহাই। সবশেষে শিল্পীর নিজের অতিপ্রিয় এবং বহুশ্রুত একটি বেদম চক্রদার দিয়ে একরাশ বিস্ময় ও মুগ্ধতা ছড়িয়ে পরিবেশনা শেষ করলেন। পণ্ডিত স্বপন চৌধুরীর সঙ্গে হারমোনিয়ামে নগমা রেখেছিলেন পণ্ডিত হিরণ্ময় মিত্র।

এই সন্ধ্যার অন্তিম পরিবেশনা উপস্থাপন করেন চতুরঙ্গী বাদক পণ্ডিত দেবাশিস ভট্টাচার্য। তাঁকে তবলায় সঙ্গত করেন পণ্ডিত যোগেশ সামসি। শিল্পী তাঁর প্রথম পরিবেশনার জন্য বেছে নিয়েছিলেন রাগ বেহাগ। শিল্পীর সদ্যপ্রয়াত মায়ের স্মৃতির উদ্দেশেই তাঁর এই রাগ চয়ন। জনপ্রিয় এই রাগকে নতুন ভাবে মনোগ্রাহী করে তুলতে দরকার হয় এক নিবিড় সঙ্গীতবোধ এবং অবাধ কল্পনা। বিলম্বিত তিনতালের গৎটিতে তা ছিল সুস্পষ্ট। সঙ্গে ছিল যোগেশ সামসির অননুকরণীয় সঙ্গত। অবশ্য সময়ের অভাবে শিল্পী তান বিস্তার বেশি দীর্ঘায়িত করলেন না, বরং একটু তাড়াতাড়িই দ্রুত একতালের রচনাটি ধরে ফেললেন। ঠিক জমে ওঠার আগেই ইতি টেনে দ্রুত তিনতালে একটি অতিপরিচিত মাইহার ঘরানার গৎ ধরে ফেললেন এবং কিছু তান বিস্তার করার পরে ঝালার অংশে গিয়ে রাগ বেহাগের পরিবেশনা শেষ করলেন। এর পর শিল্পী তাঁর সৃষ্ট যন্ত্র পুষ্পবীণায় ধরেন রাগ দরবারী কানাড়া। বিলম্বিত ঝাঁপতালে একটি গৎ বাজান এবং সবশেষে দ্রুত তিনতালে একটি গৎ বাজিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন। উপস্থাপনা সংক্ষিপ্ত হলেও পুষ্পবীণার গম্ভীর পরিশীলিত অনুরণন কানাড়ার বিষাদকে আরও বর্ধিত করেছে, শিল্পীরা একাগ্র হয়ে বাজিয়েছেন এবং শ্রোতৃমণ্ডলী মুগ্ধ হয়ে সে সুরে অবগাহন করেছে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
GD Birla School

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy