সম্প্রতি রবীন্দ্র সদনে ‘রবির আলোয় সত্যজিৎ’ অনুষ্ঠানটি নিবেদিত হল, বেঙ্গল ওয়েব সলিউশনসের ব্যবস্থাপনায় ও শ্যামসুন্দর কোম্পানি জুয়েলার্সের প্রযোজনায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই আয়োজকদের পক্ষ থেকে সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রকে তাঁর সাঙ্গীতিক জীবনের অবদানের জন্য স্বীকৃতি দেওয়া হল। এ দিনের অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়ের সাঙ্গীতিক জীবনে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব এবং সত্যজিৎ কী ভাবে রবীন্দ্রনাথের গানে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, তারই এক প্রতিবেদন। এ ছাড়াও ছিল রবীন্দ্রনাথের গান এবং সত্যজিৎ রায় রচিত ও সুরারোপিত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গান। রবীন্দ্রনাথ যে আলো জ্বালিয়েছিলেন মানবহৃদয়ে, সেই আলোরই উত্তরসূরি ছিলেন সত্যজিৎ।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন দেবজ্যোতি মিশ্র। প্রায় চার দশক ধরে সঙ্গীত জগতে সুরসৃষ্টির সঙ্গে জড়িত এই শিল্পী। মৌলিক শিল্পসৃষ্টি, শিক্ষকতা ছাড়াও বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর স্বপ্নের ফসল ছিল এ দিনের নিবেদন। সারা মঞ্চ জুড়ে ছিলেন বেহালা, পিয়ানো, বাঁশি, সরোদ, এস্রাজ, তালবাদ্যের যন্ত্রশিল্পীরা। সঙ্গে ছিলেন গানের দলের কণ্ঠশিল্পীরাও। এই ধরনের অনুষ্ঠানের নেপথ্য ভাবনা অভিনব। অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও বিন্যাস ছিল মনোগ্রাহী।
মূল অনুষ্ঠান শুরু হল দিগন্ত চৌধুরীর পরিচালনায়, বেল কান্টো স্কুল অব পারফর্মিং আর্টস দ্বারা পরিবেশিত বেঠোফেনের নাইনথ সিম্ফনি থেকে ‘ওড টু জয়’ দিয়ে, যেখানে বলা হয়েছে বন্ধুত্ব ও সংহতির কথা। চমৎকার কয়্যার পরিবেশনা। এর পর ধ্বনিত হল পিয়ানো, ভায়োলিন ও বাঁশি সহযোগে এক অপূর্ব সুরমূর্ছনা এবং সেই সঙ্গে পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে ‘জয় হোক জয় হোক নব অরুণোদয়’। সুন্দর উপস্থাপনা।
জয়তী চক্রবর্তী তাঁর সুললিত কণ্ঠে পরিবেশন করলেন ‘বাজিল কাহার বীণা’ (‘আগন্তুক’), ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ (‘চোখের বালি’), ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ (‘জন অরণ্য’), ‘বাজে করুণ সুরে’ (‘মণিহারা’)। প্রতিটি গানই হৃদয় ছুঁয়ে গেল। বিশেষ উল্লেখযোগ্য শেষের গানটি।
অরিত্র দাশগুপ্ত শোনালেন ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছায়াছবির গান ‘দেখো রে নয়ন মেলে জগতের বাহার’। গানটি সুগীত। অনুষ্ঠানে বৈচিত্র আনতে পরিবেশিত হল শ্রীনন্দা শঙ্করের নেতৃত্বে, তনুশ্রীশঙ্কর ব্যালে ট্রুপের নৃত্য পরিবেশনা। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে এই উপস্থাপনা দৃষ্টিনন্দন। শালিনী মুখোপাধ্যায় ও পোর্শিয়া সেন শোনালেন, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। এই গানের সঙ্গে চার্চের সং-এর মিশ্রণ শুনতেভাল লাগে।
শ্রীকান্ত আচার্য শোনালেন ‘আগন্তুক’ ছবিতে ব্যবহৃত গান ‘অন্ধজনে দেহ আলো মৃতজনে দেহ প্রাণ’, যে গানটি সত্যজিতের স্বকণ্ঠে শোনা গিয়েছিল। গানের আবহে সরোদের আলাপ শুনতে ভাল লাগে। শিল্পী এর পর গাইলেন ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর গান ‘এক যে ছিল রাজা, তার ভারী দুখ’। গানের মাঝে শ্রোতাদের তালে তালে হাততালি গানটির মূল ভাবকে ব্যাহত করছিল। ‘দেবী’ ছায়াছবিতে সত্যজিৎ রচিত রামপ্রসাদী সুরের শ্যামাসঙ্গীতটি শ্রীকান্ত আচার্য সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন।
অন্বেষা দত্তগুপ্ত শোনালেন ‘রক্তকরবী’ নাটকের গান ‘তোমায় গান শোনাব’। মনে রাখার মতো পরিবেশনা। শিল্পীর কণ্ঠে ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ গানের সঙ্গে হারমনির অংশটি শুনতে ভাল লাগে। অভিষেক চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘আর বিলম্ব নয়’ গানটি আশানুরূপ হল না। উপল চট্টোপাধ্যায় শোনালেন ‘হীরক রাজার দেশে’-র বিখ্যাত গান ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’। এক কথায় অনবদ্য। এই গানের সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ মনে রাখার মতো।
জয়তী চক্রবর্তী দ্বিতীয় বার মঞ্চে এসে শোনালেন ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-তে ব্যবহৃত গান ‘বাবুল মোরা নাইহার ছুটো হি যায়’। অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের লেখা এ গান সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছিলেন, নবাবের নির্বাসনের বেদনা প্রকাশ করতে। জয়তীর এই নিবেদন অনেক দিন মনে থাকবে। শিল্পীর কণ্ঠে ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির গান ‘নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী’ ভাল লাগল।
এই ধরনের অনুষ্ঠান উচ্চ মানের, তবে মাঝে মাঝে একটু বেশি ঘরোয়া মেজাজ অনুষ্ঠানটির আবহ ক্ষুণ্ণ করছিল। দীর্ঘায়িত অনুষ্ঠান। পরিচালক অনুষ্ঠানটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত করলে দর্শক, শ্রোতারা পরিপূর্ণ ভাবে আরও উপভোগ করতে পারতেন। এর ফলে শিল্পীরা অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বেশ খানিকটা তাড়াহুড়ো করছিলেন বলে পরিলক্ষিত হল।
সমগ্র অনুষ্ঠানে সঙ্গীতায়োজনের প্রশংসা করতেই হবে। এর জন্য দেবজ্যোতি মিশ্র তো বটেই, পাশাপাশি তাঁর সহকারী সুদীপ্ত কুমার সাহার নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গীতে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন, তাঁরা সকলেই গুণী শিল্পী। তাঁদের সঙ্গত অনুষ্ঠানটিকে বহুলাংশে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। মঞ্চ পরিকল্পনা ও আলোর ব্যবহার প্রশংসনীয়। সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো এক সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠান
- স্বাধীনতা দিবসে রবীন্দ্র সদনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘বন্দেমাতরম্’ রচনার ১৫০তম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন করা হল। অনুষ্ঠানে জাতীয় গানের বিভিন্ন ভার্শন পরিবেশন করলেন শিল্পীরা। প্রমিতা মল্লিকের কণ্ঠে শোনা গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভার্শনটি, সৃজন চট্টোপাধ্যায় গাইলেন দিলীপ কুমার রায়ের রেকর্ডেড ভার্শন। মূল রচনাটি পাঠ করলেন ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্ল গাইলেন পণ্ডিত ভীমসেন জোশী গীত ও হৈমন্তীর স্বরচিত ভার্শন দু’টি। তিমিরবরণের গানটি শোনা গেল রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, লোপামুদ্রা মিত্র গাইলেন ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি’। সাম্য পাঠ করলেন ‘আনন্দমঠ’ থেকে, ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের ভার্শনটি গাইলেন শৌনক। এ আর রহমানের ভার্শন গাইলেন তিমির বিশ্বাস। এ ছাড়াও ছিল অন্য শিল্পীদের পরিবেশনা।
- সম্প্রতি স্যাফরন ডান্স অ্যাকাডেমির ২৮তম বার্ষিক নৃত্যানুষ্ঠান বরাহনগরের রবীন্দ্র ভবনে অনুষ্ঠিত হল। নৃত্যশিল্পী রুনা চৌধুরী অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। অ্যাকাডেমির কর্ণধার তথা নৃত্যগুরু প্রবাল চক্রবর্তী এবং তাঁর সহকর্মী দীপাঞ্জন দাসের পরিচালনায় শিক্ষার্থীরা নৃত্য পরিবেশন করলেন। তাতে অংশগ্রহণ করেছিল চার বছরের শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরাও। উপস্থাপনায় উঠে আসে চৈতন্যদেবের জীবনকথা। এ ছাড়া ‘কালমৃগয়া’ নৃত্যনাট্যটির পরিবেশনাও ছিল মনোগ্রাহী। সঞ্চালনায় সৌরভ সাহা এবং কুমকুম, পায়েল, শ্বেতার সহযোগিতা বিশেষ উল্লেখ্য।