সম্প্রতি রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত হল কলকাতা ইয়ুথ অঁসম্বল আয়োজিত ‘ওয়েভস অফ ওঁজ়’ শীর্ষক এক সাংস্কৃতিক প্রয়াস। বাংলা গান, হিন্দি চলচ্চিত্রের গান, পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রাল সুর, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও সত্যজিৎ রায়, সলিল চৌধুরী, উত্তমকুমারের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য— সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসর ছিল যথেষ্ট বিস্তীর্ণ।
প্রথমে গাইতে এলেন ইন্দ্রাণী সেন। ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ এবং ‘তোমার হলো শুরু’— দু’টি গানে শিল্পীর পরিচিত স্নিগ্ধতা ও গায়কির স্বকীয়তা স্পষ্ট ছিল। তবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা কিছু জায়গায় প্রকট হয়ে উঠছিল। দীর্ঘ স্বর ধরে রাখা এবং তালের মধ্যে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে চলা কোথাও কঠিন হয়ে পড়ছিল। অর্কেস্ট্রার সুরসাম্যও সর্বত্র নির্ভুল ছিল না। বিশেষত কয়েক জায়গায় বেহালার স্বরচ্যুতি কানে এসেছে।
এর পর দেবব্রত বিশ্বাসের পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলা বর্ষীয়ান গায়িকা বিভা সেনগুপ্তের ‘তবু মনে রেখো’ অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা এনে দিল। এই বয়সে এমন নির্ভুল স্বরক্ষেপণ এবং ভাবের স্থিরতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কণ্ঠের আবেগকে অতিরিক্ত অলঙ্কারে ভারাক্রান্ত না করে তিনি যে সংযত ভঙ্গিতে গানটি পরিবেশন করলেন, তা যেমন শ্রুতিসুখকর, তেমন শিক্ষণীয়।
অমিতাভ ঘোষের পরিচালনায় অঁসম্বলের নিজস্ব পরিবেশনা শুরু হয় ‘কঙ্কোয়েস্ট অব প্যারাডাইস’ দিয়ে। জেরার দেপার্দিয়ু অভিনীত চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটের সঙ্গে অর্কেস্ট্রাল সুরের মেলবন্ধনের ভাবনাটি আকর্ষক হলেও কণ্ঠপর্বে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ছিল না। তুলনায় ‘ডাউন দ্য মেমারি লেন’ অনেক সুশৃঙ্খল। অর্কেস্ট্রার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় ছিল লক্ষণীয়। এই পরিবেশনার একটি অংশে রাগ মালকোষের ব্যবহার এবং তার সঙ্গে কণ্ঠসঞ্চালনা, পরে দ্রুত লয়ের তারানা— অনুষ্ঠানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি আকর্ষক অনুষঙ্গ যোগ করে। তবে শুরুতে তবলার সঙ্গে লয়ের সামঞ্জস্য পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে কিছুটা সময় লেগেছে।
ইন্দ্রাণী সেন
সত্যজিৎ রায়কে স্মরণ করে পরিবেশিত অংশে ‘গুগাবাবা’-র দৃশ্য সংযোজন দর্শনীয় ছিল। কিন্তু এখানেও কণ্ঠের দুর্বলতা অর্কেস্ট্রার সামগ্রিক আবহকে কিছুটা ম্লান করেছে। সলিল চৌধুরীর স্মরণে ‘শোনো কোনও এক দিন’ এবং উত্তমকুমারের প্রতি শ্রদ্ধায় ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে’র পরিবেশনা নস্ট্যালজিক মুহূর্ত তৈরি করে।
এর পর এসেছে ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়’, ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’, ‘কিসিকে মুসকুরাহটো পে হো নিসার’, ‘এক অজনবী হাসিনা সে’ এবং ‘জ়িন্দেগি এক সফর’। ‘এক অজনবী হাসিনা সে’-তে এক কিশোরের হারমোনিকা পরিবেশনা নজর কেড়ে নেয়। সলিল চৌধুরী, আশা ভোঁসলে ও অন্নপূর্ণা দেবীকে নিয়ে নির্মিত পর্বে ‘কী যে করি’, ‘আমি খাতার পাতায় চেয়েছি’ এবং ‘চ্যায়েন সে হমকো কভি’ পরিবেশিত হয়। কিন্তু এই পর্বেও কণ্ঠসঙ্গীত দুর্বল।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অংশে আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। মিয়াঁ-কি-মল্লার একতালে বাঁধা বলে উপস্থাপিত হলেও রচনার চলন শুনে স্বাভাবিক বারো মাত্রার কাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি, বরং প্রচলিত চার বা আট মাত্রার ছন্দচলনের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এগারো মাত্রার ‘চিত্রা’ তুলনায় সুখশ্রাব্য। পরে ‘ইয়ে রাতে ইয়ে মওসম’ এবং ‘ইয়ে লড়কা হায় আল্লা’র মেডলি হালকা মেজাজ ফিরিয়ে আনে। শেষে ‘বন্দে মাতরম্’-এর আবহে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
সব মিলিয়ে এই অনুষ্ঠান ছিল সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার সহাবস্থান। রেপার্টয়ারের ব্যাপ্তি, বিষয় নির্বাচনের অভিনবত্ব এবং তরুণদের নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কাজ প্রশংসনীয়। কিন্তু তা শিল্পের পরিণতিতে পৌঁছে দিতে নিবিড় মহড়া, স্বরশুদ্ধির প্রতি মনোযোগ, কণ্ঠের সুব্যবহার, তালের তালিম এবং অর্কেস্ট্রাল ডিসিপ্লিনের প্রয়োজন।
অনুষ্ঠান
- ঋতছন্দ উৎসব এ বার ওঙ্কারনাথ মিশনের যৌথ প্রচেষ্টায় উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে একই সঙ্গে কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের মেলবন্ধনে প্রথমে ভূপালী এবং পরে খাম্বাজের বন্দিশে আলাপ গৎ ও তানের মাধ্যমে দু’টি অসাধারণ উপস্থাপনা করা হয়। এর পর কণ্ঠসঙ্গীতে কৌশিক ভট্টাচার্যকে তবলায় সঙ্গত করেন উজ্জ্বল ভারতী এবং হারমোনিয়ামে সায়ন চট্টোপাধ্যায়। তিনি বেহাগ রাগে বিলম্বিত মধ্যলয় এবং তারানা গান। পরবর্তী অনুষ্ঠান যন্ত্রসঙ্গীতের বৃন্দবাদন এক অভিনব প্রচেষ্টা। রাগ হেমাবতীতে সন্তুরে সন্দীপ চট্টোপাধ্যায়, তবলায় শুভাশিস ভট্টাচার্য এবং ঘটমে সোমনাথ রায়— তিন শিল্পী দর্শকের মনোরঞ্জন করেন। সর্বশেষ অনুষ্ঠান ভরতনাট্যমে শিল্পী সম্রাট দত্ত ও তাঁর শিষ্য শান্তনু রায় প্রথমে নিবেদন তার পর গণেশ বন্দনা এবং শেষে দক্ষিণ ভারতীয় কীর্তন পরিবেশন করেন।