সম্প্রতি উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল ধ্রুব ইনস্টিটিউট অব ডান্স ফাউন্ডেশন আয়োজিত নৃত্য ও নাটকের মিশ্রণে নির্মিত অনুষ্ঠান ‘ছকবন্দি’। পরিচালনা, পরিকল্পনা এবং নাটুভঙ্গমে ছিলেন সংস্থার কর্ণধার সায়নী চক্রবর্তী। সঙ্গীতসৃষ্টি এবং নৃত্যনাট্যে রূপ দেওয়ার কাজটি যত্ন সহকারে করেছেন ড. দূর্বা সিংহ রায়চৌধুরী। এই নৃত্যনাট্যে তবলা, সেতার এবং মৃদঙ্গে সহযোগিতা করেছেন যথাক্রমে স্বর্ণাভ সরকার, শৌভিক মুখোপাধ্যায় এবং সন্নিধি বৈদ্যনাথন।
‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্যের বক্তব্যকে প্রথম দর্শনে অসম্ভব, অযৌক্তিক, স্ববিরোধী মনে হয় বটে, কিন্তু গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে তার মধ্যে একটি সত্য বা গভীর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। হাস্যরস, বিদ্রুপ, সরলতা এবং উদ্ভট কৌতুক দ্বারা উন্মোচিত হয়েছে এই নৃত্যনাট্যের সংলাপ, সঙ্গীত ও নৃত্যের ছন্দ। চিরাচরিত রৈখিক আখ্যান, অর্থাৎ যেখানে সূত্রপাত, মধ্যভাগ ও পরিসমাপ্তি আছে— সে ভাবে উপস্থাপনা না করে এমন ভাবে নৃত্যনাট্যকে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে দর্শকের কৌতূহল প্রাধান্য পেয়েছে চিন্তন ও কথোপকথনের মাধ্যমে। ‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্য উত্তরের উপরে জোর না দিয়ে, প্রশ্ন করেছে। প্রশ্নই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। এই নৃত্যনাট্যের গতি যত অগ্রসর হয়েছে, ততই উপলব্ধ হয়েছে যে— আমাদের মনের দরজাগুলি আমরা নিজেরাই বন্ধ করে রেখেছি। অথচ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভ্যন্তরীণ জাগরণের সম্ভাবনাকে উন্মোচন করা উচিত।
রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ নাটিকার সঙ্গে ‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্যের মিল দেখতে পাওয়া যায়। সে কারণে ‘তাসের দেশ’ নাটিকার ‘চলো নিয়মমতে’, ‘আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে’ অথবা ‘কেন নয়ন আপনি ভেসে যায়’ এবং ‘বাঁধ ভেঙে দাও’ গানগুলি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করেছেন ড. দূর্বা সিংহ রায়চৌধুরী। সমবেত নৃত্যের সময়ে অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সঙ্গে নাটুভঙ্গম প্রয়োগ করেছেন সায়নী চক্রবর্তী। নাটুভঙ্গমের সঙ্গে উচ্চারিত বোল যথেষ্ট দৃপ্ত। নৃত্যশিল্পীরা সমবেত নৃত্য উপস্থাপন করার সময়ে অত্যন্ত সুচারু ভাবে, ভরতনাট্যমের তথাকথিত দৃপ্ত ভঙ্গিতে নৃত্য পরিবেশন করেন। দীধিতা সিংহের একই সঙ্গে যথাযথ ভাবে ভারতনাট্যমের বোল বলার সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা খুবই মনোমুগ্ধকর।
‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্যে সায়নী চক্রবর্তী একই সঙ্গে নাটুভঙ্গম, অভিনয় ও দৃপ্ত ভঙ্গিতে ভরতনাট্যম নৃত্যের মাধ্যমে দর্শককে আকৃষ্ট করেন। তাঁর মুদ্রার প্রয়োগ এতটাই সুন্দর এবং নিখুঁত যে, নাটকের অভ্যন্তরীণ ভাবনা সহজেই বোধগম্য হয়। সমবেত নৃত্যে দীধিতা সিংহ, ময়ূরী সোম, শ্রদ্ধাশ্রী ব্রহ্ম, সায়নী পাখিরা, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া সিংহরায় সম্ভাবনাময়। একটি দৃশ্যে প্রথমে সকল শিল্পী চুলের বিনুনি-সহ এবং পরে একসঙ্গে তাদের বেণীবন্ধন খুলে এলোচুলে নৃত্য পরিবেশনা করেন, তা ছিল সত্যিই এক মনোরম উপস্থাপনা। ‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্যের একমাত্র পুরুষ নৃত্যশিল্পী সোহম চক্রবর্তী তাঁর বলিষ্ঠ নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে সকল দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। শিশুশিল্পী সোহানা পাত্রের নৃত্য পরিবেশনাও ছিল সুন্দর। সব মিলিয়ে ‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্য এককথায় অভিনব ও বলিষ্ঠ উপস্থাপনা— যেখানে নৃত্য, সঙ্গীত, সঙ্গত ও যন্ত্রানুষঙ্গ একে অপরের পরিপূরকের কাজ করেছে।
ওই দিন সন্ধ্যায় ‘ছকবন্দি’ শুরু হওয়ার আগে সংস্থার ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশন করেন ভরতনাট্যম আঙ্গিকের তোডিয়ম, মুদ্রা, আলারিপু, যতিস্বরম, শব্দম, পদম এবং তারানা। তারানা নৃত্যের ভাবনা, মুদ্রা প্রয়োগ এবং যতির যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করেন দেবান্বিতা দাস, সোমঋতা সরকার, শুভাঙ্গী দাস এবং শর্মিলী চক্রবর্তী।
ভরতনাট্যমের চিরাচরিত নৃত্যপদ এবং ভরতনাট্যম আঙ্গিকে ‘ছকবন্দি’ নৃত্যনাট্য ছাড়াও ওই দিন আরও একটি উপস্থাপনা ছিল— রবীন্দ্রনাথের ‘নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা’র গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনা। এই পর্বে ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ গানে শিশুশিল্পী রূপাঞ্জনা বসু সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিশেষে বলি, অনুষ্ঠান একটু দীর্ঘায়িত মনে হয়েছে। এ দিকে সজাগ ও সচেতন থাকার অনুরোধ রাখি সংস্থার কাছে।
অনুষ্ঠান
- কৃতী ইভেন্টস অ্যান্ড ফেবল ওয়ার্কস-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সুরের গুরু— আ মিউজ়িক্যাল ট্রিবিউট টু গুরু দত্ত’ ছিল এক স্মরণীয় সঙ্গীতসন্ধ্যা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি গুরু দত্তের সিনেমার কালজয়ী গানগুলিকে ঘিরেই আয়োজিত হয়েছিল এই অনুষ্ঠান। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা ও পরিকল্পনায় নির্মিত এই বিশেষ প্রযোজনায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন জয়তী চক্রবর্তী, শৌনক চট্টোপাধ্যায় এবং শোভন গঙ্গোপাধ্যায়। গুরু দত্তের চলচ্চিত্রের অমর সুরগুলি তাঁদের কণ্ঠে নতুন করে অনুভব করেন দর্শক। ‘বাবুজি ধীরে চলনা’, ‘ওয়ক্ত নে কিয়া’, ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি ফির কহাঁ’, ‘জানে ক্যায় তুনে কহিঁ’, ‘জানে উয়ো ক্যায়সে লোগ থে’র মতো কালজয়ী সব গান পরিবেশিত হয়। সে সময়ে সাহির লুধিয়ানভির মর্মস্পর্শী কথা, শচীন দেব বর্মণের সুর, গীতা দত্ত, হেমন্ত কুমার ও মহম্মদ রফির আইকনিক কণ্ঠ এবং গুরু দত্তের অনন্য গল্প বলার ধরন একসঙ্গে তৈরি করেছিল অবিস্মরণীয় সব সৃষ্টি।
- স্বতন্ত্র সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে দেবজ্যোতি মিশ্রের জার্নিকে কুর্নিশ জানিয়ে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশেষ সঙ্গীত সন্ধ্যা— ‘আলোপাখির গান’, জি ডি বিড়লা সভাঘরে। আয়োজনে বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন। দেবজ্যোতি মিশ্রর গানের এই সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, রূপঙ্কর বাগচী, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্ত, অর্ক মুখোপাধ্যায়, অন্বেষা দত্তগুপ্ত, স্যমন্তক সিনহা, অরিত্র দাশগুপ্ত প্রমুখ। এ দিন গল্পে-কথায় অনুষ্ঠান এগিয়ে নিয়ে গেলেন দেবজ্যোতি এবং অনিন্দ্য। দেবজ্যোতি মিশ্রর গানের মধ্যে ‘আমার দক্ষিণ খোলা জানলা’ (পোর্শিয়া সেন), ‘মেঘের পালক, চাঁদের নোলক’ (অন্বেষা দত্তগুপ্ত), ‘সখী হম’ ও ‘মথুরানগরপতি’ (সোনাক্ষী কর), ‘পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান’, ‘মেঘপিওনের ব্যাগের ভিতর’ (অরিত্র দাশগুপ্ত), ‘তোমায় মনে পড়ছিল’ (রূপঙ্কর বাগচী), ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ (অনিন্দ্য-উপল), জন লেননের ‘ইম্যাজিন’ (স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত), ‘গাছ নাই জীবনে’ (অর্ক মুখোপাধ্যায়), ‘দুই ইশারায় বহু দূরে’ (স্যমন্তক সিনহা), ‘হাউ মেনি রোডস’ (অভিষেক চক্রবর্তী), রাজা দাস আবৃত্তি করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জল বাড়ছে’... সব মিলিয়ে সে দিনের সন্ধ্যার উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি।
- কল্যাণী শহরের ঋত্বিক মঞ্চে সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছিল ‘শ্রাবণী সন্ধ্যা’ শীর্ষক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কল্যাণী নূপুর ডান্স অ্যাকাডেমির উদ্যোগে। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত, নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’ ইত্যাদি। বিশিষ্ট শিল্পী শ্রাবণী সেন, স্বরূপ পাল, স্বাতী পাল, দেবাংশু মুখোপাধ্যায়, বাসবী বাগচী, ঋতুকণা ভৌমিক, শাশ্বতী সাঁতরা, শুভ্রজিত আদক, শঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। যন্ত্রানুষঙ্গে সহযোগী ছিলেন প্রশান্ত রায় চৌধুরী, অরবিন্দ প্রধান, অনিকেত চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. সমীরা কোসার, নৃত্যগুরু মলি রায় প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সৌমেন ঘোষ।