সম্প্রতি জ্ঞান মঞ্চে রাজা দত্তের পরিচালনায় নিবেদিত হল মঞ্জিমা কলাকেন্দ্রের অনুষ্ঠান ‘লয়-সূত্র’। ঐতিহ্য এবং শৃঙ্খলার দৃষ্টিনন্দন এক অভিনয়যাত্রা— যেখানে ছন্দ খুঁজে পায় গতি ও উন্মোচিত হয় নৃত্য পরম্পরার এক বিশিষ্ট মঞ্চায়ন। অঙ্গশুদ্ধির সারমর্ম গ্রথিত ছিল এই পরিবেশনায়। ‘লয়-সূত্র’ হল সেই ছন্দের অনুরণন, যেখানে নৃত্য ও নৃত্যের সমন্বয়ে বোনা এক শৈল্পিক নকশা। শাস্ত্রীয় নৃত্যের সঙ্গে লোকনৃত্যের মঞ্চায়ন এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনায় দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতের ১৫০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হয় নৃত্যের মাধ্যমে। নৃত্য পরিকল্পনায় রাজা দত্ত। গতানুগতিক উপস্থাপনা। দ্বিতীয়ার্ধে অনুনাদ— জীবনের অনুরণন— এক পরীক্ষামূলক প্রযোজনা, যেখানে শাস্ত্রীয় নৃত্য কেবল পরিবেশনা নয়, গুরু-শিষ্যের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক পরম্পরা, জীবন্ত ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন করেছে। এর পর পুষ্পাঞ্জলি— গুরু ও রসিক দর্শকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। পুষ্পাঞ্জলির নৃত্য পরিকল্পনা গীতা চন্দনের। পরিবেশনা রাজা দত্ত ও চৈতী ঘোষের। সুন্দর নিবেদন। রাগ নাট্যই, আদিতালে নিবদ্ধ সঙ্গীত।
পরবর্তী উপস্থাপনা মঞ্জিষ্ঠা কলাকেন্দ্রের নবাগত শিশুশিল্পীদের, ভরতনাট্যমের প্রাথমিক নৃত্যায়ন আলারিপু। তত্ত্বা আড়াভু নিবেদন করে অন্য একটি দল। নটরাজ বন্দনা ও ভরতনাট্যমের মৌলিক পদচারণার মঞ্চায়ন দর্শকেরা উপভোগ করলেন। জাতিস্মরম— শুদ্ধ নৃত্যছন্দ ও স্বরের মিলনে সঙ্গীতের সঙ্গে শিশুশিল্পীদের নৃত্য নিবেদন সুন্দর হয়েছিল। রাগ কল্যাণী ও তাল রূপকমে আধারিত এই সঙ্গীতের সাথে নৃত্যের উপস্থাপনায় শিল্পী দক্ষতার পরিচয় দেন। এর পর পুষ্পাঞ্জলি, রাগ যোগ ও আদি তালে নিবদ্ধ সঙ্গীতের সঙ্গে রাজা দত্ত ও চৈতী ঘোষেরনিবেদন উপভোগ্য হয়েছিল। পরে বৃন্দাবনী তিল্লানা। রাগ বৃন্দাবনী,তাল আদি। কৃষ্ণের রূপের কাছে রাধার আত্মসমর্পণ— ভাবনায় আধারিত এই তিল্লানাটির রূপকার গীতা চন্দন। মঞ্চে উপস্থাপিতকরেন কৃষ্ণের ভূমিকায় রাজা দত্ত ও রাধিকা চৈতী ঘোষ (অতিথি শিল্পী)। এঁদের নৃত্যাভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে অনুনাদ— এক পরীক্ষামূলক প্রযোজনা। ডমরু, বীণা, বাঁশি, মন্দিরা, নাটুভঙ্গমের উপস্থিতি জীবনের অনুরণনেরকথাই বলে।
অনুষ্ঠানটির রূপকার রাজা দত্ত, চিত্রনাট্য সোমনাথ চৌধুরীর। সঞ্চালনায় অরুণিমা সেনগুপ্ত ও শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপস্থাপনায় মঞ্জিষ্ঠা কলাকেন্দ্রের শিক্ষার্থীশিল্পীরা। এর পর সংবর্ধনা জ্ঞাপনে ছিলেন অলকানন্দা রায়, মোহনা আয়ার, প্রিয়দর্শিনী ঘোষ, রাজীব ভট্টাচার্য, রাজীব সাহা, মৌমিতা চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রাণী ঘোষ, চৈতী ঘোষ-সহ বহু বিশিষ্ট শিল্পী ওশিক্ষক। সংযোজনায় অক্লান্ত মজুমদার, আলোয় সৌম্যেনচক্রবর্তী, শব্দে হাসি পাঞ্চাল। এখন নৃত্যানুষ্ঠানে দু’টি পর্বের মাঝখানে বিশিষ্টজনদের সংবর্ধিত করার প্রচলন হয়েছে। কিন্তু অনুষ্ঠানের মাঝখানে সংবর্ধনা পর্ব মঞ্চস্থ করা হলে অনুষ্ঠানের রেশ কেটে যায়। উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে একটু ভেবে দেখবেন কি?