E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রেক্ষাগৃহকে ছুঁয়ে যায় মহাজাগতিক এক তরঙ্গ

‘তারায় তারায়’ নাটকটিতে ভ্যান গখের চরিত্রে কৌশিক সেন মুগ্ধ করলেন। অভিনয়-ব্রাশের ঝাপটায় রঙ্গমঞ্চের ক্যানভাসে তিনি ভ্যান গখকে আঁকলেন।

সৌভিক গুহসরকার

শেষ আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৬
নাটকের দৃশ্য।

নাটকের দৃশ্য।

সম্প্রতি জ্ঞান মঞ্চে মঞ্চস্থ হল স্বপ্নসন্ধানী নাট্যগোষ্ঠীর নাটক ‘তারায় তারায়’। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘তারাভরা আকাশের নীচে’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই নাটক। নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় কৌশিক সেন। এই নাটকের আখ্যানবস্তুর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’টি চরিত্র। এক, উন্মত্ত দৈবতাড়িত চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গখ। দুই, কলকাতার এক যুবক যে ভ্যান গখকে নিয়ে পাগল, যে ছবি আঁকতে চেয়েও পারেনি, অথচ সারাক্ষণ ভ্যান গখের ছবির ভিতরে বাস করে। এই দুই চরিত্রের জীবন মহাকালের ক্যানভাসে পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়— রঙে, রেখায়, আবেগে, উন্মাদনায়, বোধে।

‘তারায় তারায়’ নাটকটিতে ভ্যান গখের চরিত্রে কৌশিক সেন মুগ্ধ করলেন। অভিনয়-ব্রাশের ঝাপটায় রঙ্গমঞ্চের ক্যানভাসে তিনি ভ্যান গখকে আঁকলেন। শিল্পরসিকেরা বলে থাকেন যে রঙের তাৎপর্য না বুঝলে একজন শিল্পীকে সম্যক ভাবে বোঝা যায় না। ভ্যান গখ নিজেও রং-ব্যবহারের ব্যাপারে খুঁতখুঁতে ছিলেন। নিজের আত্ম-প্রতিকৃতি আঁকতে গিয়ে তিনি যে নানা ধরনের রঙের ব্যবহার করেছেন, সেই ব্যাপারে নিজের বোনকে লিখেছিলেন— ‘এখানে সেই রঙ রয়েছে, যা একে অপরকে উজ্জ্বল করে তুলছে, যা এক দম্পতির মতো, যা স্বামী স্ত্রীর মতো পরস্পরকে পূর্ণ করে তুলছে।’ এমন তীক্ষ্ণ ও ক্ষুরধার শিল্পীকে মূর্ত করে তোলা তো সহজ কথা নয়। কিন্তু, কৌশিক সেনের অভিনয়ে ভ্যান গখের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস, দ্বন্দ্ব, হতাশা, উন্মাদনা প্রভৃতির রং এসে ছিটকে পড়ল প্রেক্ষাগৃহে। হলুদ রং নিয়ে বলতে গিয়ে ভ্যান গখ বলেছিলেন, ‘রৌদ্রকিরণ, এই আলো, ভাল কোনও শব্দ পাচ্ছি না বলে যাকে আমি শুধু হলুদ বলতে পারি— ম্লান সালফার-হলুদ, ম্লান লেবু-হলুদ, সোনালি। হলুদ রং-টা কী অপূর্ব! হাউ বিউটিফুল ইয়েলো ইজ়!’ ঋত্বিকের চরিত্রে ঋদ্ধি সেন ভ্যান গখের প্রিয় এই হলুদ রংটির মতো ছড়িয়ে পড়লেন রঙ্গমঞ্চে। ক্ষিপ্র উদ্দাম চলনের পাশাপাশি তিনি করুণ মুহূর্তগুলিতেও চরিত্রের কোমলতা ও ভঙ্গুরতাকে চিত্রিত করেছেন। তিনি কিন্তু শুধুই ঋত্বিক নন, তিনি ভিনসেন্টের ভাই থিও-ও বটে। সেইখানে তাঁর অভিনয়ে এসে পড়েছে বলিষ্ঠ অরেঞ্জ রঙের আভা। ঋত্বিক থেকে থিও, থিও থেকে ঋত্বিকে তিনি অবলীলায় যাতায়াত করেছেন। কোথাও ছন্দপতন ঘটেনি।

সাইকায়াট্রিস্ট রুখসার আহমেদের চরিত্রটি জটিল। তিনি চিকিৎসক হিসেবে শুরু করেন বটে, কিন্তু তাঁর মানসিকতায় গভীর পরিবর্তন হতে থাকে। ক্রমে তিনিও ঋত্বিকের চিন্তার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে যান। রেশমী সেন এই জটিল চরিত্রটিকে সাবলীল দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষত নাটকের শেষের দিকে তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা মুগ্ধ করে। ভ্যান গখের নীল রং যে চাপা টেনশন ও উদ্বেগ ফুটিয়ে তোলে, সেই গাঢ় নীল রঙের ভিতর প্রবেশ করলেন রেশমী। ঋত্বিকের স্ত্রী শর্মিলা একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি। সে স্বামীকে নিয়ে চিন্তিত। সে চায় যে তার স্বামী মানসিক ভাবে শান্তি পাক। তার চরিত্রের কোমলতা, স্বামীকে নিয়ে তার ভয়, শঙ্কা— সব কিছুকে নানা বর্ণে ও দক্ষ অভিনয়-স্ট্রোকে ফুটিয়ে তুললেন সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে মেটে সবুজ ধূসর রং দিয়ে ভ্যান গখ এঁকেছিলেন চাষিদের জীবনের ছবি, সেই রংটিকে তাঁর অভিনয়ে ধারণ করেছেন তিনি। ভিনসেন্টের পিতা, ঋত্বিকের পিতা, কুটিল ধর্মযাজক, জমিদার ও বর্তমান কালের আর্ট ডিলার— এতগুলো চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়লেন রাজর্ষি নাগ। তাঁর অভিনয় বলিষ্ঠ, কণ্ঠস্বর দৃঢ়। তাঁর অভিনয়ে কখনও কখনও ফুটে উঠেছে রক্তিম।

রেশমী সেনের পোশাক পরিকল্পনা, সুদীপ সান্যালের আলো ও সঞ্চয়ন ঘোষের মঞ্চসজ্জা ভাল লেগেছে। নাটকের শেষের দিকে একটি দৃশ্য মুগ্ধ করল। উন্মত্ত ঋত্বিক কথা বলেন ভিনসেন্ট ভ্যান গখের সঙ্গে। এই কাল্পনিক কথোপকথনের পরে হঠাৎ স্টেজ জুড়ে ফুটে ওঠে ‘স্টারি নাইট’। অন্ধকারে এক মুহূর্তের জন্য প্রেক্ষাগৃহকে ছুঁয়ে যায় মহাজাগতিক এক তরঙ্গ। আর সেই স্টারি নাইট ছবির দিকে হেঁটে চলে ঋত্বিক। এমন একটি দৃশ্য নির্মাণের জন্য কৌশিক সেনকে সাধুবাদ জানাই। নাটকে রুখসার ও শর্মিলার কথোপকথন কখনও কখনও একটু দীর্ঘ মনে হয়েছে। কিন্তু এতদ্ব্যতীত, স্বল্পদৈর্ঘ্যের মেদহীন এই নাটকটি রঙ্গমঞ্চে ছড়িয়ে দিল প্রাণপ্রাচুর্যের সোনালি রং!

অনুষ্ঠান

  • দীর্ঘ দিন পরে নিজের মৌলিক গানের অ্যালবাম প্রকাশ করলেন অনুপম রায়। সম্প্রতি কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটিতে আয়োজিত ‘ব্যথা নেই’ নামে সেই অ্যালবাম প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রূপম ইসলাম, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত আচার্য, শিলাজিৎ মজুমদার, লগ্নজিতা চক্রবর্তী ও আরও অনেকে। ‘ব্যথা নেই’, ‘অবাস্তব প্রেম’-সহ আটটি গানের এই সঙ্কলনের কাজ গত বছর থেকেই শুরু করে দিয়েছিলেন অনুপম। বিগত কয়েক বছরে পরপর চলচ্চিত্রের জন্য গান তৈরি করে গিয়েছেন শিল্পী। সেই একঘেয়েমি কাটাতেই এ বার প্রেম, বিচ্ছেদ ও তা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেনা জ়ঁরের গান নিয়ে প্রত্যাবর্তন অনুপমের। সব ক’টি প্রধান অডিয়ো প্ল্যাটফর্মে শোনা যাচ্ছে ‘ব্যথা নেই’-এর গান।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Gyan Manch

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy