কলকাতার বি আর পানেসর গ্যালারিতে প্রবেশ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল একই ছাদের নীচে বহু প্রজন্মের সহাবস্থান। সেই যুগবাহিত প্রজন্মের নাম সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্ট’স গ্রুপ। এই শিল্পীসমাজের দীর্ঘ পথচলার মধ্য দিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় শিল্পের নানা বাঁক প্রতিফলিত হয়েছে। এ বারের প্রদর্শনীতে সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে রয়েছে নতুন মাধ্যম এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার শিল্প-অনুবাদ।
দীর্ঘ শিল্পজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আসা অসাধারণ সংযমের স্রষ্টা গণেশ হালুই। প্রদর্শনীতে ছিল ২০২৫ সালে তাঁর করা কাগজের উপরে গোয়াশের দু’টি শিরোনামহীন ছবি। সাদা পরিসরে অল্প কয়েকটি জ্যামিতিক চিহ্ন, কালো রেখা এবং ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ফর্মেই স্বল্প উপকরণে ছবির নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়ে ওঠে। তাঁর রচনায় ফাঁকা স্পেসও ছবির একপ্রকার সক্রিয় অংশ। তাই শুধু বিমূর্ত ছবি বলে ছেড়ে দিলে এই সূক্ষ্ম অনুভবের যথার্থতা হারিয়ে যায়। ২০০৯-এ করা লালুপ্রসাদ সাউয়ের এচিংটিও ছিল শিরোনামহীন। জ্যামিতিক কালো আকৃতি, চারপাশের রেখার জাল এবং ছোট মাপ— সব মিলিয়ে একটি সঙ্কুচিত সময়বোধের নিদর্শন।
বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মনু পারেখ পুরনো পরিচিতির পুনরুক্তি না করে এ বারে বেশি সক্রিয়তার সুযোগ রেখেছেন। কাগজের উপরে চলমান রেখা, চিহ্ন এবং স্তর যথেষ্ট শক্তিশালী। কালো, সাদা, ধূসর এবং সামান্য রঙের মিশ্রণে অবয়ব তৈরির সঙ্গে ভাঙার প্রক্রিয়াও লক্ষ করা যায়। মনোজ মিত্রের ছিল ছোট দু’টি মিশ্র মাধ্যমের কাজ। বিশেষ করে ডিম্বাকার ফর্মের ভিতর ঘন রেখা ও চিহ্ন এক প্রাচীন মাটির কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সম্মিলনী: সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টস্টস দলের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।
বিশিষ্ট ভাস্কর নিরঞ্জন প্রধানের কাজে মানুষের অবয়ব সরাসরি অনুকৃতি না হয়েও কী ভাবে ভর, ফর্ম ও নীরব আবেগ তৈরি করা যায়, তা দৃশ্যত অবাক হওয়ার মতো। ব্রোঞ্জের ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’-এ সম্পর্ক ও ভারসাম্য খুব সংক্ষিপ্ত ফর্মে ধরা। অন্য কাজটিতেও একটি অচেনা যন্ত্র, স্থাপত্য এবং মানবিকতা একসঙ্গে জড়ো হয়।
সিনিয়র শিল্পী আদিত্য বসাকের দু’টি মিশ্র মাধ্যমের কাজে মানুষ ও প্রাণিজগতের সম্পর্কের নিবিড় আবেদন অনুভব করা যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি মানবমুখ এবং চারপাশে উড়ন্ত পাখির ডানায় মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। আলো-আঁধারির নাটকীয় ফোকাসে দৃশ্যটি বাস্তবের চেয়েও বেশি মানসিক হয়ে ওঠে। অখিল চন্দ্র দাসের ব্রোঞ্জের ‘ফ্রগ’ এবং ‘বোর’-এর শারীরিক গঠনে গতিশীলতা সুন্দর ধরা পড়ে। কাঠের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বোর’-এর ভাঁজ ও লোমের ইঙ্গিত নিছক প্রাণীর অবয়ব থেকেও কিছুটা আলাদা করে।
চিত্রকর প্রদীপ মৈত্র জলরঙের একজন নামী শিল্পী। সেই রঙের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং টেম্পারার ঘনত্বে ‘নেচার’ ও ‘ন্যাচারাল’ ছবিতে প্রকৃতির নতুন রূপ তিনি অনায়াসে দেখিয়েছেন। সৌমেন খামুরাইয়ের বোর্ডের উপরে টেম্পারার বিমূর্ত দৃশ্য স্মৃতি ও বাস্তবের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আর এক জলরঙের শিল্পী ভোলানাথ রুদ্রর কাজে অন্ধকার পরিবেশে মৃদু আলো ফোটার মধ্য দিয়ে বিষয় উদ্ভাসিত হয়। ‘এক্সপ্রেশন’ সিরিজ়ে পেন ও কালির গাঢ় রঙে শ্রীকান্ত পাল মানুষের অন্তর্গত অস্থিরতা তুলে ধরেন। রাজেন মণ্ডলের ‘ইন্ট্রোস্পেকশন’ নামাঙ্কিত দু’টি কাজে এচিংয়ের আবহ মন্দ লাগে না।
সম্মিলনী: সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টস্টস দলের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।
অতনু ভট্টাচার্যের ‘মাইন্ড স্পেস’ স্মৃতির ভিতর ক্রমশ বিলীন হওয়ার গল্প। অস্পষ্ট স্থাপত্যসদৃশ কাঠামো, ম্লান রং এবং কেন্দ্রাভিমুখী বিন্যাস দর্শককে কোনও নির্দিষ্ট দৃশ্যের দিকে নিয়ে যায় না। বরং মনের অচেনা গহ্বরে পৌঁছে দেয়। গাঢ় নীল-ধূসর স্তব্ধতা এবং রক্তিম উষ্ণতার দু’টি কাজই যেন অন্তর্জগতের ডুবুরি। বিশিষ্ট ছাপচিত্র নির্মাতা অতীন বসাকের ‘ক্রাই’ সিরিজ়ে হাতের প্রতীকটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসারিত হাত যেমন প্রতিবাদী, তেমনই আকুতি ও নিজের অস্তিত্ব প্রকাশের রূপকও হয়ে ওঠে। রেখা ও ছাপচিত্রের উপরে গোয়াশের ঘনত্ব বাস্তব শরীরকে অতিক্রম করে একটি সামাজিক সঙ্কেত দেয়।
ভাস্কর বিমল কুণ্ডুর নির্মিত ব্রোঞ্জের প্রাণী এবং বাদ্যযন্ত্র হাতে বসে থাকা দু’টি ফর্মে রয়েছে সরল প্রাণের গঠন। পপ ভাস্কর্যে রসিকতা ও কল্পনার গাম্ভীর্যে খানিকটা ভিন্ন স্বর আনেন শিল্পী পঙ্কজ পানওয়ার। তবে উদীয়মান ভাস্কর আশিস চৌধুরীর সেরামিক কাজগুলি প্রদর্শনীতে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। পুরনো টেলিফোনের আকৃতিকে অবলম্বন করা কাজটিতে সময়ের পরিবর্তন এবং ব্যবহার্য বস্তুর শিল্প-নির্মাণ একসঙ্গে সংগঠিত। দ্বিতীয়টিতে কাঠের ফ্রেম, সংখ্যা, চিত্রচিহ্ন এবং পুরনো মুদ্রণে নির্মিত হয়েছে এক স্মৃতিবাহী বস্তু। প্রদর্শনীর অন্য বিমূর্ত বা সংক্ষিপ্ত কাজের পাশে তরুণ শিল্পী ডেভিড মালাকার একটি আলাদা গল্প তৈরি করেন। মিশ্র মাধ্যমে গড়ে ওঠা গাঢ় বাদামি, কাঠের মতো টেক্সচার, পুরনো মঞ্চের ভিতরে চরিত্রচিত্রণ— ‘বহুরূপী’ নামাঙ্কিত এ দু’টি কাজেই লোকজ ভাবনা ও নাট্য-ছায়া মূর্ত হয়ে ওঠে।
প্রদর্শনীটির বড় শক্তি তার বৈচিত্র এবং যুগবাহিত ঐতিহ্য। স্বাভাবিক ভাবেই অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি প্রবীণ কয়েকজন শিল্পীর কাজও রয়েছে। বরিষ্ঠ শিল্পীরা দীর্ঘ দিনের চর্চায় নিজস্ব পরিচিতি অর্জন করেছেন। ফলে তাঁদের কাজে বিষয় বা নির্মাণভঙ্গির কিছু পুনরাবৃত্তি থাকলেও, সেটিকে স্থবিরতা বলা যায় না।
আসলে দীর্ঘ শিল্পচর্চার কঠিন জায়গা এখানেই—নিজস্ব স্বাক্ষর ধরে রেখেও তাকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করা। দলের ৬৭তম প্রদর্শনী সেই দুই প্রবণতাকেই পাশাপাশি দেখায়।