মফস্সলের মাটি, মানুষের জীবন এবং তার ভিতরে গচ্ছিত থাকা নীরব শক্তি— এই তিনটি বিষয় নিয়ে সম্প্রতি গৌরাঙ্গ বিশাইয়ের প্রদর্শনী হয়ে গেল চিত্রকূট আর্ট গ্যালারিতে। দীর্ঘ বিরতির পরে এটি ছিল তাঁর অষ্টম একক প্রদর্শনী। জলরং, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমে প্রদর্শিত মোট ৩৭টি কাজের শিরোনাম ছিল, ‘আর্দি কুইন’। গ্রামবাংলার সেই নারীরা, যাঁদের প্রাত্যহিক শ্রম, সংসার এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই খুব সাধারণ বলেই হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, সেই শ্রমজীবী নারীদের শ্রদ্ধা জানাতেই এই প্রদর্শনী।
গৌরাঙ্গ প্রথাগত আর্ট কলেজের শিক্ষায় শিক্ষিত শিল্পী নন। স্বশিক্ষার মধ্য দিয়েই তাঁর শিল্পচর্চার বিকাশ। শুরুতে পেয়েছিলেন প্রদ্যুৎ রায়ের সাহচর্য। পরবর্তীতে রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতা। স্বশিক্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাজে এক ধরনের সরলতা এনে দিয়েছে, যেখানে তাত্ত্বিক জটিলতার চেয়ে, মানুষের জীবন সরাসরি সামনে আসে। ‘আর্দি কুইন’ নামের মধ্যেই প্রদর্শনীর ভাবনা অনেকটা স্পষ্ট। এখানে ‘কুইন’ কোনও রাজপ্রাসাদের রানি নন। মাঠে ফসল ফলানো এবং তা বাজারে বিক্রি করে, সংসারের দায়িত্ব সামলে চলা নারী। এই নারীর মধ্যেই শিল্পী খুঁজেছেন আসল রাজকীয় মহিমা। পরনে মলিন পোশাক, হাতে কৃষিকাজের সরঞ্জাম এবং মাথায় বাঁধা গামছাই শিল্পীর চোখে রানির মুকুট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এই মুকুট কোনও অলঙ্কার নয়, শ্রমের মর্যাদার প্রতীক। এই রূপান্তরই সিরিজ়টির মুখ্য শক্তি।
প্রদর্শনীতে মিশ্র মাধ্যমের একটি কাজে নারীর এক হাতে ধরা মাছ এবং অন্য হাতে শিশুকে সামলানোর দৃশ্যটি চোখে পড়ে। মাতৃত্ব এবং জীবিকার দুই প্রান্ত একই শরীরে এসে মিলেছে। আবার অন্য ছবিতে কৃষিকাজের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর শারীরিক ভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে শ্রমের দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে নারী কোনও আদর্শায়িত রূপপ্রতিমা নয়। বরং তার শ্রমই সৌন্দর্যের প্রধান উপাদান। এই সব ছবিতে রঙের ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। খুব বেশি উজ্জ্বল রঙের আয়োজন নেই। মোনোক্রোমিক জলরঙের স্বচ্ছতা, দ্রুত রেখার ব্যবহার এবং অসম্পূর্ণ রেখে যাওয়া সাদা স্পেস স্কেচের জীবন্ত দলিল বলা যায়। ধূসর মাটির টোনের সঙ্গে কোথাও এক ফোঁটা লাল বা নীলের ছোঁয়া ছবির প্রাণকে আরও তাজা করে তোলে। আবার তুলনায় হলুদ রং কখনও রোদ, কখনও মাঠ, কখনও মাটির উষ্ণতা কিংবা জীবনের ভিতরে থাকা আশাবাদের ইঙ্গিত বহন করে।
বড় ক্যানভাসগুলিতে শরীর ও পরিবেশের সম্পর্ক আরও জোরালো। একজন নারীকে কৃষিকাজের মধ্যে দেখা যায়, কোথাও পিছনে গবাদি পশু, কোথাও মাঠের বিস্তার। মাটি, ফসল, পশু, বৃষ্টি, রোদ মিলিয়েই তার পূর্ণ জীবন। ফলে ‘আর্দি কুইন’ শুধুই গ্রামীণ জীবনের ছবি হয়ে ওঠে না। শক্তি ও মমতার স্বীকৃতির ছাপ রাখে। শিল্পী বিশাইয়ের আগের ছবিতে ধর্ম, সামাজিক বিষয়ের নানা অভিজ্ঞতা দেখা যায়। তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিল ২০০০ সালে। এই দীর্ঘ যাত্রার পর বর্তমান শিরোনামে ফিরে আসা যেন মাটির কাছাকাছি প্রবেশ করা। এই সিরিজ়ে শিল্পীর আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, দারিদ্র্যকে কেবল বিষাদ হিসেবে তুলে ধরা নয়। তাদের সারল্য এবং বেঁচে থাকার আনন্দকেও উপভোগ করা। পরিশেষে নারীর বহু পরিচয়ের মধ্যে ‘মা’ সম্বোধনের ধারণাকেই শিল্পী প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
গৌরাঙ্গ বিশাইয়ের ছবির বিষয় স্বচ্ছ হলেও, এই স্পষ্টতা কোথাও কোথাও ছবির সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে। যেমন একই ধরনের আবেগ ও শ্রমভঙ্গি কিছু কাজে পুনরাবৃত্তির অনুভূতি তৈরি করেছে। ফলে, পর্যায়ক্রমে দেখলে আগের ছবির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় না। এবং ‘কুইন’ ধারণাটি কিছু কাজে মুকুটের রূপকে উপস্থিত হলেও, নারীর অন্তর্গত শক্তি, সিদ্ধান্ত আরও সামনে আনা উচিত ছিল। তা হলে ‘আর্দি কুইন’-এর ধারণাটি নারীর সামগ্রিক সত্তায় পর্যবসিত হতে পারত। আসলে শিল্পী যে জীবনকে দেখেছেন, সেই জীবন সম্পর্কে তাঁর আবেগ স্পষ্ট। সেই আবেগ কিছু ছবিতে বেশি
প্রভাব ফেলেছে। ফলে দর্শক চরিত্রটির প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, অন্তর্নিহিত প্রশ্নের জায়গাটি ততটা তৈরি হয় না।
তবে ‘আর্দি কুইন’-এর গুরুত্ব অস্বীকার করার নয়। রং, রেখার সম্মানে বাস্তবধর্মী ড্রয়িং যথেষ্ট গতিমুখী। যার দিকনির্দেশ গৌরাঙ্গ বিশাইয়ের কাজের পরবর্তী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এখানে প্রধানত মাটির সঙ্গে লেগে থাকা নারীদের অস্তিত্বের প্রতি শিল্পীর শ্রদ্ধা অনুভব করা যায়। ‘আর্দি কুইন’-এ তিনি যে দরজা খুলেছেন, তার পরের ধাপে যদি পরিচিত গ্রামীণ নারীর ছবির বাইরে তাদের অন্তর্জগতের দিকে আরও গভীর ভাবে যান, তা হলে এই সিরিজ় আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে।