E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

খুঁটিনাটিতেই উৎকর্ষ

ম্যাক্সিমালিজ়ম একটি নান্দনিক শিল্পচর্চা, যেখানে উজ্জ্বল রং, জটিল বিন্যাস, স্তরে স্তরে টেক্সচার, ভিন্নধর্মী নকশা ইত্যাদির সহযোগে অলঙ্কারবহুল এক অপূর্ব সমৃদ্ধির প্রকাশ দেখা যায়।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ ০৭:৫১
সমারোহ: সিমা আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

সমারোহ: সিমা আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল মডার্ন আর্টে ২০২৬-এর সামার শো-এর উদ্বোধন হল সম্প্রতি। বিষয়, ‘ম্যাক্সিমালিজ়ম ইন ইন্ডিয়ান আর্ট’। এই বিশেষ প্রদর্শনীর কিউরেটর রাখি সরকার জানালেন, যেহেতু কিছু দিন আগে মিনিমালিজ়ম নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে, সেই জন্য তাঁদের মনে হয়েছিল, ম্যাক্সিমালিজ়ম নিয়েও ভাবনাচিন্তা করা প্রয়োজন। ম্যাক্সিমালিজ়ম একটি স্বতঃস্ফূর্ত ভারতীয় অভিব্যক্তি। ভারতীয় জীবনযাপন, পোশাকআশাক, পুজোআর্চা, খাওয়াদাওয়া সব কিছুর মধ্যেই যেন একটা প্রাণের প্রাচুর্য বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ পায়।

বিশেষ ভাবে ভারতীয় চিত্রশিল্পে অজন্তারও বহু আগে মধ্যপ্রদেশের গুহাচিত্র, মন্দিরের স্থাপত্যশিল্প, ইলোরার কৈলাস মন্দির, দেওয়ালচিত্র, ট্যাপেস্ট্রি, বস্ত্র ডিজ়াইন, মোগল ও রাজপুত মিনিয়েচারের মাধ্যম ছাড়াও অন্যান্য বহু জায়গায় আমাদের সভ্যতার এক বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে ম্যাক্সিমালিজ়ম।

ম্যাক্সিমালিজ়ম একটি নান্দনিক শিল্পচর্চা, যেখানে উজ্জ্বল রং, জটিল বিন্যাস, স্তরে স্তরে টেক্সচার, ভিন্নধর্মী নকশা ইত্যাদির সহযোগে অলঙ্কারবহুল এক অপূর্ব সমৃদ্ধির প্রকাশ দেখা যায়। এই পরিসরে শিল্পীরা সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের উন্মুক্ত করে, কোনও কিছু আড়াল না করে শিল্প সৃষ্টি করেছেন। উনিশ শতক থেকে শুরু করে আজকের নতুন শিল্পীদের কাজ দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রদর্শনী।

বিশ শতকের শিল্পীদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়, প্রকাশ কর্মকার, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ পাইন, সুধীর পটবর্ধন প্রমুখ খ্যাতনামা শিল্পীদের অনবদ্য সব ম্যাক্সিমালিস্ট কাজের পাশাপাশি আধুনিক শিল্পী সম্প্রদায় তাঁদের কাজ নিয়ে যোগ দিয়েছেন সারা দেশ থেকে। এঁদের ছবির আঙ্গিক ফিগারেটিভ বা চিত্রধর্মী, রূপকধর্মী অথবা বিমূর্ত, যে রকমই হোক, সব অগ্ৰাহ্য করে শিল্পীদের কাজে বাহুল্য বা উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা, প্রাণবন্ততা বা অতিরিক্ত প্রাচুর্য খোঁজা হয়েছে।

তুহিন রঞ্জন ঘোষ ‘হুইস্পার্স অব দ্য ফ্লোয়িং আর্থ’ ছবিতে একফালি পৃথিবীকে স্তরে স্তরে ভাগ করে এঁকেছেন। আকাশ, পাহাড়, নদী, গাছপালা, জনবসতি সব কিছু যেন পাশাপাশি ঘর বেঁধেছে একটি ক্যানভাসের উপরে, সুদৃশ্য অ্যাক্রিলিক রঙের বৈচিত্রে।

অশোক মল্লিক তাঁর ‘স্লিপিং ইন নাইট’ ছবিতে উন্মুক্ত প্রান্তরে পুরুষ-নারী, শিশু, কুকুর ইত্যাদি ইচ্ছাকৃত ভাবে অগোছালো চরিত্রে এঁকেছেন। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ জাগ্রত অবস্থায়, কেউ বা স্বপ্নে। অল্প পরিসরে অনেক কিছু দেখিয়েছেন, উজ্জ্বল অ্যাক্রিলিক রং ক্যানভাসে ব্যবহার করে।

কুন্তল দত্তের ‘ইয়েলো ভিলেজ’ ছবিটিতে সুন্দর ক্যাডমিয়াম ইয়েলো র‌ং যেন গাছপালা, বাড়িঘর, গ্ৰামগঞ্জ, মানুষ, দূরের পাহাড়, আকাশের মেঘ... সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে খেলা করেছে প্রাণের আনন্দে। সামান্যতম অন্য রং যেন ওর খেলার সঙ্গে!

ইউসুফের শিরোনামবিহীন ছবিতে শান্ত পটভূমিতে অনেক বিশৃঙ্খলা, অনেক আঘাত-প্রতিঘাত এবং এক দিকে ইঁদুরদৌড়ের হুলস্থূল, পিছন-পিছন তাড়া করে আসছে অনিশ্চিত অস্তিত্বের অস্বস্তি, শূন্যতা ও একাকিত্ব। বিমূর্ত আঙ্গিকে ক্যানভাসের উপরে অ্যাক্রিলিক কলম এবং পেনসিলে করা একটি অসাধারণ ছবি।

শ্রেয়সী চট্টোপাধ্যায়ের ‘দ্য হোলি ডিপ’ ক্যানভাসে শিল্পী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কাঁথা সেলাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য মাধ্যমের মিশ্রণ ঘটিয়ে খুব আকর্ষক একটি ডিজ়াইন সৃষ্টি করেছেন, যেটি গভীরতাহীন এক সমতল প্রেক্ষাপটে আঁকা। সেখানে বহু মন্দির, বাড়িঘর, নানা পুকুরঘাট, বিভিন্ন পরিবহণ। তার সঙ্গে এখানে-ওখানে মানুষ, জল, মাটির নিঃশ্বাস মাখামাখি। এক ক্যানভাসে কত কথা বলেছেন শিল্পী। এই হচ্ছে চরম ম্যাক্সিমালিজ়ম।

অর্পিতা সেনগুপ্ত মিশ্র মাধ্যমে ক্যানভাসে ডিপটিক চরিত্রে এঁকেছেন ‘ট্রানজ়িয়েন্স’, যার অর্থ ক্ষণস্থায়ী বা নশ্বরতা। এই ছবিটিতে নানা রঙের মেয়ে-পুরুষ, পশুপাখি যেন রইরই হল্লায় মেতে! সেলফির আসক্তি নিয়ে, লুটেপুটে আনন্দ মেখে জীবনের কর্মকাণ্ডে মত্ত। শিল্পী কিন্তু তাঁর আঁকার মাধ্যমে গভীর এক জীবনদর্শনের কথা বলছেন। হয়তো আজকের জীবন কী অসম্ভব ক্ষণস্থায়ী মনে করেই মানুষ এবং প্রকৃতিরও এই ভোগলিপ্সা। মুহূর্তটিকে ধরে রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টা।

পি এস জলজার ছবির নাম ‘ফ্লোটিং স্পেস’। ধারণাটি বেশ মৌলিক। একেবারেই নিজস্ব ভঙ্গিতে শিল্পীর ধ্যানধারণার পরিণামে সৃষ্টি এই ছবি। কাগজের উপরে জলরঙের কাজ। ডক্টর বি আর অম্বেডকর, যাঁকে ভারতীয় সংবিধানের জনক বলা হয়, তিনি একটি নৌকাযর মাঝখানেগদির উপরে বসে আছেন। চারিদিকে উত্তাল নদী। আজকের এই পরিস্থিতি হয়তো তাঁকে কিছুটা চিন্তান্বিত করেছে। মানুষে মানুষে মতভেদ,ঘর ভেঙে পড়ছে, ভাঙছে স্বপ্ন।মানুষ দিশেহারা হয়ে একতা ভুলে বিভিন্ন মতাদর্শ অবলম্বন করে নানা পথের যাত্রী।

দীপক দাদাসাহেব আঙ্কলখোপের ছবির নাম ‘এক্সিজ়টেন্স’, অর্থাৎ অস্তিত্ব। ট্রিপটিকে করেছেন ক্যানভাসের উপরে অ্যাক্রিলিক রঙের সাহায্যে। একটি গাছের গাথা। সে যেন নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখার জন্য জীবনের লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। তার শরীরের শিরা-উপশিরা দেখিয়ে মনে করানো হচ্ছে যে, সে যেন মানুষের সমগোত্রীয় এক জীব। যেন দুরন্ত ঘোড়ার গতিতে জীবন ধারণ করছে। ভারী উপভোগ্য এই বৃক্ষের ভঙ্গিমাটি এবং এর রঙের বিন্যাস।

এ ছাড়াও বহু ছবি সেই ম্যাক্সিমালিজ়ম শিল্পদর্শন মেনে এখানে দেখা গেল। তবে অল্প পরিসরে অন্যান্য অনেক অসাধারণ ছবির বিস্তার এখানে ধরা পড়ল না। প্রদর্শনীটি চলবে অগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
cima Artwork

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy