E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নবম জন্মদিনে নয় শিল্পীর রংমিলান্তি

প্রদর্শনীর সবচেয়ে কনিষ্ঠ শিল্পী মৈনাক। এঁর ছবিতে শিকড়ের টান নিবিড়। মৈনাক যেন আপন মনোজগতে মগ্ন, ডুবে রয়েছেন নিজেরই দুনিয়ায়।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:১৬
সমাহার: দেবভাষায় আয়োজিত ‘নাইন্থ সিম্ফনি’ প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

সমাহার: দেবভাষায় আয়োজিত ‘নাইন্থ সিম্ফনি’ প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

দেবভাষা ব‌ই ও শিল্পের আবাসে গ্যালারির নবম জন্মদিনের আয়োজন করা হয়েছিল ন’জন শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে। প্রদর্শনীর নাম ছিল ‘নাইন্থ সিম্ফনি’।

ফিলহারমোনিক সোসাইটি বেঠোফেনকে কমিশন করেছিলেন ১৮১৭ সালে। এটি প্রথম সঞ্চালিত হয়েছিল ভিয়েনা শহরে, ১৮২৪ সালে। এই নাইন্থ সিম্ফনিকে পশ্চিমি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম বলা হয়। রচনাকালে শিল্পী ছিলেন সম্পূর্ণ বধির।

কেন প্রদর্শনীর নাম ‘নাইন্থ সিম্ফনি’? এই সিম্ফনিতে বেঠোফেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং মানবজাতির ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। আধ্যাত্মিকতায় শিল্পী পেয়েছেন ধর্মসাম্য, স্বাধীনতা এবং মানুষের চরম পূর্ণতা। এই নাইন্থ সিম্ফনির গোড়ায় আছে তুমুল বিশৃঙ্খলা। তার পরে হতাশা এবং একাকিত্বের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে তুরীয় আনন্দে উত্তরণ। হয়তো এই প্রদর্শনীতে ন’জন শিল্পীর যাত্রায় তার‌ই আভাস মেলে নানা ভাবে।

প্রদর্শনীর সবচেয়ে প্রবীণ শিল্পী যামিনী রায়। বিশ্ব চিত্রকলায় যামিনী রায় যে স্থান অধিকার করে আছেন, তা তুলনারহিত। তিনি প্রথম ভারতীয় চিত্রশিল্পী, যিনি পশ্চিমি অ্যাকাডেমিক ধরনের ছবিকে পরিপূর্ণ ভাবে বর্জন করে বাংলার লোকসংস্কৃতি, লোকশিল্প এবং মহাকাব্যের অনুপ্রেরণায় অনবদ্য ছবি সৃষ্টি করে চিরকালীন হয়েছেন।‌ এই প্রদর্শনীতে তাঁর ছোট্ট দু’টি পথ-দৃশ্য ভারী মনোরম।

প্রদর্শনীর সবচেয়ে কনিষ্ঠ শিল্পী মৈনাক। এঁর ছবিতে শিকড়ের টান নিবিড়। মৈনাক যেন আপন মনোজগতে মগ্ন, ডুবে রয়েছেন নিজেরই দুনিয়ায়। তিনি যখন বৃহত্তর পৃথিবীর সম্মুখীন হন, তখন সেখান থেকেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী তুলে আনতে জানেন নানা মণিমুক্তো। এখানে তাঁর কালি-কলমের রেখায় অপূর্ব ছবিগুলি বাংলার এক চলমান জীবনের দিশা দেয় দর্শককে।

সাধক শিল্পী সোমনাথ হোরের কাজও অলঙ্কৃত করেছিল এই প্রদর্শনী। ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকের পুরো সময়কালের কাজগুলি ছাড়াও শিল্পীর জীবনের প্রায় পুরোটাই উৎসর্গীকৃত ছিল অবহেলিত মানুষের জন্য। বহু মাধ্যমে কাজ করেছেন সোমনাথ হোর। রেখাচিত্রগুলি তার মধ্যে অনবদ্য। জীবনের মূলমন্ত্র মানবিকতাকে তিনি কোনও দিন ছাড়েননি। এখানে তাঁর জলরঙের একটি স্কেচে এক নারীমূর্তি বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে।

অনেকটা একই সময় প্রবাহের কাজ ধরা পড়ে শিল্পী কে জি সুব্রহ্মণ্যনের সৃষ্টিতেও। তাঁর শিল্পযাত্রা অপেক্ষাকৃত জটিল হলেও গভীর প্রকৃতিপ্রেমের নিদর্শন মেলে জলরঙের একটি স্কেচে। শুধুই একজোড়া খেজুর গাছ। সংবেদনশীলতা এবং সহানুভূতিতে জড়ানো একটি ছবি।

শিল্পী গণেশ হালুই শুরুতে অজন্তার রেখাচিত্র অভ্যাস করার সময়ে ভারতীয় ঐতিহ্যকে অন্তর থেকে অনুভব করেছিলেন। ছেলেবেলায় দেখা জামালপুরের প্রকৃতির সবুজের ব্যাপ্তি, আঙিনায় প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্রের জলের আহ্বান আত্মায় বহন করেন তিনি। রেখায়-রঙে নিসর্গ এবং মানুষের নির্যাসটুকু শুধু নিয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কথায় ‘রিকালেকশন ইন ট্র্যাঙ্কুইলিটি’ আঁকেন।

শিল্পী সনৎ কর তাঁর ছাপচিত্রে রেখার উৎকর্ষে এবং রঙের অভিনব ব্যবহারে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে বিশ্বের ছাপচিত্রের ইতিহাসে নতুন ভাবে সংযোজিত করেছেন। সৃষ্টির অন্তিম কথা ‘বিস্ময়’কে পাথেয় করে, বৈষ্ণব পদাবলির রাস্তা ধরে শেষে ছাপচিত্র এবং পেন্টিংকে একাত্ম করে তুলেছেন। প্রদর্শনীতেও তেমনই একটি রঙিন এচি‌ং দেখা গেল।

শিল্পী যোগেন চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ শিল্পসফরে রেখা নিয়ে বহু দিন ধরে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। তা করতে গিয়ে এমন একটি স্তরে রেখাকে তিনি নিয়ে গিয়েছেন, যেখানে রেখা তাঁর কাছে আত্মসমর্পিত। তাঁর একটি ব‌ইয়ে যোগেন লিখেছেন যে, পুরুষ এবং নারীশরীরকে তিনি যে ভাবে খুশি, খেলাচ্ছলে, দুমড়ে-মুচড়ে সেটির এক অনন্য অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। ঠিক যেমনটি তিনি করে থাকেন প্রকৃতির সঙ্গে খেলায়। তার নিদর্শনও পাওয়া গেল প্রদর্শনীতে।

শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি বেঙ্গল স্কুলের পথপ্রদর্শন এবং পশ্চিমি শিল্পের প্রভাব অতিক্রম করে, সম্পূর্ণ নিজস্ব এক স্বাক্ষরে, রেখার সরলীকরণে, নান্দনিক ছন্দে, একান্ত ভাবে ভারতীয় শিল্পের আধুনিকতার গীতিকবিতা। প্রদর্শনীতে রাখা তাঁর কাজে তা যেন আরও একবার প্রমাণিত হল।

শিল্পী কৃষ্ণেন্দু চাকী তাঁর সাতটি ক্যানভাসে কালজয়ী এক আখ্যানকে অবলম্বন করে, তাকে ছাপিয়ে উন্নত মননে‌ ছবি এঁকেছেন। নাম দিয়েছেন, ‘রামায়ণচিত্র’। রামায়ণের পটে যে সব ছবি দেখা গেল, সেইগুলি ঐতিহ্য ছাপিয়ে আরও ভিন্ন কিছু ভাবনার, শিল্পীর নিজস্ব চেতনার সূচনাকারী।

কেন প্রদর্শনীর নাম ‘নাইন্থ সিম্ফনি’, তা এই নয় শিল্পীর সৃষ্টির সমাহার প্রত্যক্ষ করলেই অনুধাবন করা যায়। সব মিলিয়ে সার্থক এক প্রদর্শনী।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Debovasha Art exhibition

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy