E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

গণেশ পাইনের অন্দরমহল

সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্টসের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক ১৯৬৩ সাল থেকে। ভাস্কর বিমল কুণ্ডুর কথায় উঠে আসে গণেশ পাইনের নিরলস কর্মপ্রবণতার কথা।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০২৬ ০৫:৪৩

গণেশ পাইনের শিল্পভাষা কোনও আঞ্চলিক বা জাতীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিস্তার এশিয়া ও ইউরোপীয় আধুনিকতার মধ্যবর্তী এক স্বতন্ত্র ভুবনে। তাঁর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী সচরাচর দেখা যায় না। এর জন্য সংগ্রাহক চন্দ্রশেখর বর্মাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। বহু দিন ধরে সংরক্ষিত সংগ্রহ তাঁর শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় দেয়।

সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্টসের বি আর পানেসর গ্যালারিতে পরিবেশিত তিন দিনের প্রদর্শনীতে শিল্পী পাইনের অরিজিনাল ছবি দেখতে পাওয়া গেল। প্রথম দিন ছিল শিল্পীর জন্মদিন। সেই উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি বিশেষ মাত্রা পায় সোসাইটির অন্যতম দুই বরিষ্ঠ শিল্পী বিমল কুণ্ডু এবং প্রদীপ মৈত্রর সহযোগিতায়।

কক্ষের আয়তন অনুযায়ী যতটা সম্ভব কাজ দেখানোর দায়িত্ব ছিল কিউরেটর জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্যের উপরে। তবে যাঁরা সত্যিকারের ছবি বোঝেন, তাঁদের গণেশ পাইন নেশা ধরান। প্রদর্শিত ছবিগুলির সামনে দাঁড়ালে এই সত্যতা অনুভব করা যায়।

সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্টসের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক ১৯৬৩ সাল থেকে। ভাস্কর বিমল কুণ্ডুর কথায় উঠে আসে গণেশ পাইনের নিরলস কর্মপ্রবণতার কথা। তাঁর মতে, এতগুলি মূল কাজ একসঙ্গে না দেখলে শিল্পীর গণেশ পাইন হয়ে ওঠার ইতিহাস বোঝা সম্ভব নয়। ছাত্রজীবনে করা ছোট ছোট অঙ্কন, রূপাবলির অনুকরণ, আলপনার নকশা কিংবা সামাজিক বাস্তবতার প্রাথমিক ড্রয়িং— সবই তাঁর অসাধারণ প্রস্তুতির সাক্ষ্য বহন করে। কলেজজীবনে তিনি যে নিজেকে কতটা তৈরি করেছিলেন, এই সব ছোট ছোট ছবি তার প্রমাণ।

গ্যালারি জুড়ে ছিল ছোট ছোট ৪০টি মূল কাজ। ব্যক্তিগত সংগ্রহের এই সমাবেশ কার্যত মূল্যবান আর্কাইভ। প্রস্তুতিমূলক স্কেচ, কালি ও ক্রেয়নের ‘দ্য নাইট’ (২০০৮)। একই মাধ্যমের আর একটি কাজ ‘পোর্ট্রেট অব অঞ্জন সেন’। সোনার খনি থেকে যেন উঠে আসে একের পর এক দুর্লভ ছবি। যেমন, ১৯৬৪ সালে জলরঙে করা এক উপবিষ্ট মানুষ। রুলটানা ডায়েরির পাতায় ‘কৃষ্ণ’র স্কেচ (১৯৮৪), ‘দুর্গা’ সংক্রান্ত নোট বা শিরোনামহীন ইঙ্ক ড্রয়িংয়ে দোতলা বাসে ওঠার ঠেলাঠেলি, এককথায় অপূর্ব স্কেচ। এ ছাড়া স্থানচিত্র, ধোঁয়াওঠা মালগাড়ি, রামায়ণের ইলাস্ট্রেশন— সব মিলিয়ে শিল্পীর নির্মাণ-প্রক্রিয়ার এক উন্মুক্ত ভান্ডার। স্বল্প রেখায় গঠিত কম্পোজ়িশনগুলি বিস্ময় জাগায়। বিশেষত মধুসূদনের ‘রেখো মা দাসেরে মনে’ কবিতার চিত্রাঙ্কন যেন আধুনিকতার চরম প্রকাশ। পেপার হোয়াইটকে সচেতন ভাবে কাজে লাগিয়ে রেখার যে সংহতি এনেছেন, তাতে বিস্ময় জাগে।

প্রদর্শনীতে ছিল মিশ্র মাধ্যমের ‘মুখাবয়ব’, স্ত্রী মীরা পাইনের প্রতিকৃতি, গ্রাফ পেপারে অজস্র ক্রসিং আঁচড়ে দারিদ্রের অঙ্কন। এ ছাড়া ফুলের টব হাতে একটি মেয়ের বিবিধ ভঙ্গি, টেম্পারায় ‘কুইন’ এবং গভীর আবহে নীলাভ ‘পি-হেন’। শিল্পীর রং ব্যবহারের জন্য তৈরি করা কালার চার্ট বিশেষ ভাবে আকর্ষণ করে। ডায়েরির গ্রিড লাইনের মধ্যে টেম্পারায় তৈরি এই রং নির্বাচন তাঁর কাজের অন্তরঙ্গ প্রস্তুতি সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।

আলোচ্য প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি, শিল্পীর ‘আনফ্রেমড’ ধারণাকে ধরতে চাওয়া। একজন শিল্পীর প্রস্তুতি, নোট, স্কেচ, ইলাস্ট্রেশন এবং ব্যক্তিগত বিনিময়কে শিল্প-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখার সচেতন প্রয়াস। ফলে দর্শক সম্পূর্ণ শিল্পীসত্তার মুখোমুখি হতে পারেন। কবিতা অবলম্বনে নির্মিত কাজগুলি শিল্পীর সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের ইঙ্গিত দেয়। রামায়ণের ইলাস্ট্রেশন বা ছোট ড্রয়িংয়ে তাঁর পরবর্তী শিল্পভাষার বীজ স্পষ্ট অনুমেয়।

মূলত দেশভাগের অভিঘাত, মৃত্যুচেতনা, লোককথার জগৎ এবং শৈশবের স্মৃতি তাঁর শিল্পকল্পনার ভিত নির্মাণ করেছে। এ সব কাজের মধ্যে শিল্পীর রূপান্তরমুখী স্বাধীনতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। অত্যন্ত সংযত রেখা, শূন্যস্থানের ব্যবহার এবং সঙ্কেতধর্মী আখ্যান বৃহত্তর কাজের পূর্বাভাস বহন করে। তিন দিনের এই আয়োজনে শিল্পীর ব্যক্তিগত উক্তিগুলিও ছিল শিক্ষণীয়। সেখানে বাল্যস্মৃতি, কালো পটের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং শিল্পচর্চার প্রতি দায়বদ্ধতার কথা উঠে এসেছে।

প্রদর্শনীর কিউরেটোরিয়াল ধারণাটিও প্রশংসার দাবি রাখে। দর্শক বুঝতে পারেন, একটি শিল্পকর্মের নেপথ্যে কত দীর্ঘ গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং চিন্তার ইতিহাস কাজ করে। তাঁর ছবিতে বাস্তব ও কল্পনা, জীবন-মৃত্যু, ভয় ও বিস্ময় একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। ফলে তাঁর শিল্প এক ধরনের স্বপ্নময় অথচ গভীর মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। পরিশেষে বলা যায়, এটি শুধু গণেশ পাইনের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী নয়, তার চেয়েও বেশি শিল্পীর চিন্তা, সংগ্রাম ও সৃজনপ্রক্রিয়ার এক বিরল দলিল। কলকাতার শিল্প-ইতিহাসে এমন আয়োজন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠান

চন্দননগর সারস্বত-এর আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সভাঘরে হয়ে গেল সাহিত্যসন্ধ্যা ‘একাকী তাঁরা দুজন’। প্রারম্ভিক সঙ্গীত পরিবেশন করেন রূপশ্রী তোষ পোদ্দার। দেবারতি মিত্রের রচনা ও ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা পাঠে ছিলেন স্বপ্না দে, ইরা সর্বজ্ঞ, সুস্মিতা চক্রবর্তী, অয়নিকা রায়, অর্পিতা শীল, সায়ন্তনী মিত্র, মণিকণা দত্ত ও রৌণক আলম মল্লিক। এর পর ব্যক্তি দেবারতি মিত্র ও তাঁর গদ্যসাহিত্যের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করলেন কবি মধুপর্ণা মুখোপাধ্যায়। ‘কবি ও আবৃত্তিকার একে অন্যের পরিপূরক হলেও উভয় উভয়ের প্রতি সম্মান করেন কতটা?’ শীর্ষক আলোচনাসভায় গঠনমূলক মত বিনিময় হল কবি ও আবৃত্তিকারের মধ্যে। সেই পর্বে ছিলেন সৌগত চট্টোপাধ্যায়, কবিতা সোনালী, সৌভিক গুহ সরকার, মহুয়া দাস প্রমুখ। অনুষ্ঠানের ভাবনা ও বিন্যাসে সারস্বত-এর কর্ণধার শুভদীপ চক্রবর্তী। সঞ্চালনায় ছিলেন মধুমিতা বসু। পরিচালনার দায়িত্বে অর্পিতা শীল ও সুমনা পাঠক দাস।

কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ডান্স গ্রুপ ফেডারেশন নিবেদিত বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘অমলিন অমলা’। নৃত্যশিল্পী অমলাশঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাজ্যের ২৫টি নৃত্যদল অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কলাসঙ্গম নৃত্যক্ষেত্র, যার পরিচালনায় রয়েছেন অভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও তানিয়া দেওয়ানজি। এ ছাড়াও নৃত্য পরিবেশন করেন সুস্মিতা নন্দী, স্বর্ণাভ মিশ্র, রুদ্র মিশ্র, সুলগ্না সরকার-সহ একাধিক শিল্পী ও নৃত্যদল। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ডান্স গ্রুপ ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক চন্দ্রোদয় ঘোষ। সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীদের হাতে স্মারক তুলে দেন পলি গুহ।

রবীন্দ্রনাথের গান এক অনন্য দর্শন বোধের গান, যার সূত্র অনেক গভীরে নিহিত। উপনিষদের গভীর প্রভাব রয়েছে রবীন্দ্রনাথের জীবনে, গানে। গীতাঞ্জলির কবিতা, গান একেশ্বরবাদ, নিরাকার ঈশ্বরের কথাই বলে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী আনন্দ গুপ্ত ও তাঁর সংস্থা দক্ষিণায়ন ইউকে-র ব্যবস্থাপনায় নিবেদন করলেন ‘টেগোর অ্যান্ড জার্নি উইথ দ্য উপনিষদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। নৃত্য পরিবেশনায় দীক্ষামঞ্জরির শিল্পীরা। ২৬ মে, ভারতীয় জাদুঘরে আয়োজিত হয় এই অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের বেশ কিছু গান পরিবেশিত হয়। আনন্দ গুপ্তর কণ্ঠে ‘চিরসখা ছেড়ো না’, ‘তোমার অসীমে’, ‘শৃণ্বন্তু বিশ্বে’ উল্লেখযোগ্য। সমগ্র অনুষ্ঠানের সঙ্গীত আয়োজনে ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তালবাদ্যে বিপ্লব মণ্ডল। নৃত্য পরিচালনায় ডোনা গঙ্গোপাধ্যায় ও রঘুনাথ দাস।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Society of Contemporary Arts

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy