রমা রল্যাঁর সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন সঙ্গীতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য শিক্ষা এবং উপস্থাপনায় একটা শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, রল্যাঁ পাল্টা যুক্তি রাখছেন যে, যে সঙ্গীত নির্জীব তাকেই নিয়মে বেঁধে শুদ্ধ রাখতে হয়। সঙ্গীতে প্রাণ থাকলে তাঁর বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। রবীন্দ্রনাথের নিজের গানের ক্ষেত্রেও যে সেটা কিছুটা প্রযোজ্য, তা বহু বারের মত ফের প্রমাণ করে দিলেন সঙ্গীতশিল্পী জয়তী চক্রবর্তী ও শ্রীকান্ত আচার্য। বেঙ্গল ওয়েব সলিউশনস আয়োজিত ‘গানে মিলে দুই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দুই শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করলেন কলামন্দিরে।
ইমন কল্যাণ ও বিলম্বিত তিনতালে নিবদ্ধ ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে’-র অল্পশ্রুত সংস্করণটি দিয়ে যখন অনুষ্ঠান শুরু হল, তখনই বোঝা গেল যে, এ শুধু গানের অনুষ্ঠান নয়, কিছুটা রবীন্দ্রচর্চার উপলক্ষও হতে চলেছে। নিয়মের তর্জনীহেলন না মেনে, কোনও পরম্পরা অনুসরণ না করে শুধু ভাললাগার কিছু গান দিয়ে ডালি সাজিয়েছিলেন শিল্পীরা। শ্রীকান্ত ‘ছিন্নপত্র’ থেকে কিছু অংশ পাঠ করলেন, মনের জড়তার প্রতি কবির অসন্তোষ এবং প্রবৃত্তির বহমানতার প্রতি আসক্তিকে পাথেয় করে জয়তী গাইলেন ‘প্রচণ্ড গর্জনে আসিল এ কি দুর্দিন’। সুরফাঁক তালে নিবদ্ধ এই গানটিকে বেশ যত্ন করে যন্ত্রানুষঙ্গের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে। ঠিক একই ভাবে পূর্বপরিকল্পিত সঙ্গীতায়োজন করা হয়েছে ‘গোলাপ ফুল ফুটিয়ে আছে’, ‘হৃদয়ের এ কূল ও কূল’, ‘আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন’, ‘জানি নাই গো সাধন তোমার বলে কারে’ প্রভৃতি গানে। ‘গোলাপ ফুল...’ গানটির মধ্যে যে নাটকীয়তা, তা দুই শিল্পীর কবিকণ্ঠ ও ভ্রমরের সংলাপ ভাগাভাগি করে গাওয়ার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ‘হৃদয়ের এ কূল’ গানটি জয়তীর গলায় বহুশ্রুত, বিখ্যাতও। সেই খ্যাতির বিড়ম্বনায় ও বৈচিত্রের তাগিদে নাটকীয়তার পরিমাপ একটু অতিরিক্ত বলে মনে হল। আবার ততোধিক প্রাণ ঢেলে শিল্পী গাইলেন ‘নাই, রস নাই’, ‘হায় গো, ব্যথায় কথা যায় ডুবে যায়’, ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে’ প্রভৃতি।
‘ছিন্নপত্র’ থেকে পাঠের সঙ্গে সঙ্গে শ্রীকান্ত তাঁর চিরাচরিত মেঘমন্দ্র কণ্ঠে গাইলেন ‘যেতে যেতে একলা পথে’। এই গানটিতে অবশ্য আবহের বা সঙ্গীতায়োজনের বাহুল্য লক্ষ করা গেল না। গাওয়ার ফাঁকে শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীতে কখনও মুলতানি রাগের ভিন্ন ব্যবহার, বেহাগের নিজস্ব রূপ বা ভৈরবীর অপ্রচলিত ব্যবহার নিয়ে কথা বললেন। উদাহরণস্বরূপ গাইলেন, ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে’, জয়তীর সঙ্গে গাইলেন ‘যখন ভাঙল মিলন-মেলা’। শুধু জয়তীর কণ্ঠে শোনা গেল কবির দেওয়া বিশুদ্ধ ভৈরবীর সুরে ‘সুন্দরী রাধে আওয়ে বনি’। ‘তুমি তো সেই যাবেই চলে’ গানটির মধ্যে রাগ শ্রী-র সঙ্গে রাগ পূরবীর মিশ্রণ ও সঙ্গে কিঞ্চিৎ পুরিয়া কল্যাণের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলেন। প্রায় একই সুরের রেশ টেনে গাইলেন ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না’। ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ গাইলেন শ্রীকান্ত, যা আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলল ‘চিঠিপত্র’ থেকে জয়তীর পাঠ।
বিশেষ চমক হিসেবে শিল্পীরা দু’টি গান করেন— ‘প্রেমের হাতে ধরা দেবো’ এবং ‘কো তুঁহু বোলবি মোয়’। প্রথম গানটি আসলে ‘গীতাঞ্জলী’র একটি কবিতা, যাতে রবীন্দ্রনাথের ধারায় সুরারোপ করেছেন সরোদশিল্পী পণ্ডিত দেবজ্যোতি বসু, কণ্ঠ দিয়েছিলেন জয়তী নিজে এবং ব্যবহার হয়েছিল ‘যোগাযোগ’ নামের একটি চলচ্চিত্রে। অন্য দিকে, ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ থেকে নেওয়া ‘কো তুঁহু বোলবি মোয়’-তে কীর্তনের সুর দিয়ে ‘চিরসখা হে’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন সুরকার বাপ্পি লাহিড়ী, কণ্ঠ দিয়েছিলেন শ্রীকান্ত। কীর্তনের সুরের উপর রবীন্দ্রনাথের বিশেষ কোনও দাবি থাকার কথা নয়, তবে প্রথম গানটির সুর নিয়ে যে পরীক্ষা করা হয়, তাতে রবি ঠাকুরের সুরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় নাকি কিছু অনুকরণীয় প্যাটার্ন— তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়ে গেল। সবশেষে ‘সে যে মানে না মানা’— এই গানটি গেয়ে এবং শ্রোতামণ্ডলীকেও গাইয়ে শিল্পীরা অনুষ্ঠান শেষ করেন। রবীন্দ্রনাথের গানে সুরের বিবর্তন নয়, তবে হয়তো আবেগ, অনুভূতি ও অভিব্যক্তির বিবর্তনের সাক্ষী রইলেন শ্রোতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠান
সঙ্গীত পরিবেশনায় সৈকত মিত্র।
- নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রফেশনাল পারফর্মিং সিঙ্গারস (অ্যাপস)। গত ২৪ অগস্ট রাজ্য সঙ্গীত অ্যাকাডেমিতে অ্যাপস-এর তরফে আয়োজন করা হয়েছিল রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, যেখানে ৩০ জন সদস্য দুই কবির গান পরিবেশন করেন। সংগঠনের সভাপতি শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক সৈকত মিত্র ছাড়াও সংগঠনের এগজ়িকিউটিভ কমিটির সদস্য ঊষা উত্থুপ, শম্পা কুণ্ডুর মতো শিল্পীরাও উপস্থিত ছিলেন। এ দিন অনুষ্ঠান চলাকালীন দুই নতুন শিল্পীকে বরিষ্ঠ শিল্পীরা পরামর্শ দিলেন, মঞ্চে কী ভাবে পেশাদার সঙ্গীত পরিবেশন করতে হয়। উল্লেখ্য, পুরনো এগজ়িকিউটিভ কমিটির পরিবর্তে অ্যাপস-এ সম্প্রতি নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে। আগামী দিনেও তাদের নানা কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানের মুহূর্তে।
- সম্প্রতি কলকাতার লেজেন্ড অ্যান্ড লিগ্যাসি কাফে তথা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রে হয়ে গেল উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ-এর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে স্মরণ অনুষ্ঠান। প্রদর্শিত হল বিশিষ্ট পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘উস্তাদ-এ-বিসমিল্লা’। পদ্মশ্রী সোমা ঘোষ, বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী স্মরণ করলেন তাঁর গুরু তথা পিতাসম বিসমিল্লা খাঁকে। এ দিন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী দেবাশীষ বসুর সঙ্গে আলাপচারিতায় পদ্মশ্রী সোমা ঘোষ ভাগ করে নিলেন বিসমিল্লা খাঁ-এর প্রতি তাঁর মনের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা। গাইলেন টুকরো, টুকরো গান যা বারাণসীর কথা মনে করিয়ে দিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গ্র্যামি জুরি পণ্ডিত প্রদ্যুৎ মুখোপাধ্যায়।
- সম্প্রতি মধুসূদন মঞ্চে ‘পূরবী’-র আয়োজনে অলক রায়চৌধুরীর একক অনুষ্ঠান হয়ে গেল। প্রথমার্ধে রবীন্দ্রনাথের গান ও উত্তরার্ধে হারানো দিনের গানে সাজানো হয়েছিল। মাঝে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুলপ্রসাদ সেন রচিত কাব্যগীতিতে শ্রুতিরম্য কণ্ঠ দিলেন দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ মধুসূদন মঞ্চে শোনা গেল ইদানীং অশ্রুতপ্রায় একাধিক গান। যেমন সলিল চৌধুরীর ‘সেই মেয়ে’ যা শুনিয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র, ‘কিছু রং দিও’ ইত্যাদি। এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘সার্থক জনম আমার’ পরিবেশিত হয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্মরণীয় আধুনিক গান ‘আমি দেখতে ভালবাসি’ ও ‘মন বলে আমি’-র মতো গান পরিবেশন করলেন শিল্পী। বিশেষ নজর কেড়েছেন বেহালায় অম্লান হালদার।
সঙ্গীত পরিবেশনে শিল্পী।