তাঁকে বলা হয়নি, তাঁর বৌভাতে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটি কে, যাঁর জন্য তাঁর শ্বশুরমশাই তাঁকে দোতলার হলঘর থেকে ডেকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হয়নি, কেনই বা সেই নিমন্ত্রিত ব্যক্তি বাকিদের মতো হলঘরে এসে তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। তাই এই বাড়িতে সদ্য বধূ হয়ে আসা বছর কুড়ির তরুণীটিকেই হাজির হতে হল নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটির কাছে, তাঁর আশীর্বাদ নিতে।
সেখানে গিয়ে তো তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কে অপেক্ষা করছেন তাঁর জন্য! ডান হাত তাঁর কোমরে, বাঁ হাতে ধরা ধুতির কোঁচা। বিয়েবাড়ির আলোর রোশনাইকে যেন ম্লান করে দিচ্ছিল ওই ব্যক্তির উপস্থিতি। নববধূ ওই ব্যক্তির মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বিস্ময়ের শেষ সীমাও পেরিয়ে গেলেন। মনে পড়ে গেল— সিনেমাহলে গিয়ে ‘শিল্পী’, ‘চন্দ্রনাথ’ এই সব ছবিতে নায়ক হিসাবে যাঁকে দেখেছেন, বাড়িতে আসা ‘প্রসাদ’, ‘উল্টোরথ’-এর মতো সিনেমা পত্রিকার প্রচ্ছদে যাঁর ছবি অসংখ্য বার দেখেছেন, ইনিই তো সেই! সিনেমাপ্রেমী মানুষের নয়নের মণি উত্তমকুমার! এ যে অবিশ্বাস্য! তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং উত্তমকুমার! নাকি কোথাও ভুল হচ্ছে! তাঁর মতো দেখতে অন্য কেউ… এই সব ভাবতে ভাবতে তিনি এই ব্যক্তিটিকে প্রণাম করার কথাই ভুলে গেলেন। তাঁর শ্বশুরমশাই তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন, “বৌমা, প্রণাম করো।”
শ্বশুরমশাই হলেন সত্যনারায়ণ খান। পুত্রবধূ হলেন সত্যনারায়ণের বড় ছেলে দিলীপের স্ত্রী মৃদুলা। নিমন্ত্রিত ব্যক্তি সত্যিই ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। ঘটনাস্থল হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের গোহালপোতা গ্রামে সত্যনারায়ণের বাড়ি। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সত্যনারায়ণবাবুর বড় ছেলে দিলীপের বৌভাত ছিল। তাতে আমন্ত্রিত ছিলেন উত্তমকুমার এবং সুপ্রিয়াদেবী। যুগলেই এসেছিলেন। সেদিনের কথা মনে করে মৃদুলা বলেন, “বিয়ের আগে শুনেছিলাম, আমার শ্বশুরমশাইয়ের সিনেমার ব্যবসা। তা বলে আমার বৌভাতে উত্তমকুমার আসবেন, তা আমার স্বপ্নেরও বাইরে ছিল। তাঁকে দেখে আমি এতটাই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম যে, প্রণাম করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি কিন্তু আমার দিকে তাকাননি। নীচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডলে ছিল একটা চাপা হাসির রেশ। শ্বশুরমশাইয়ের কথায় যেন আমার চেতনা ফিরে এল। তাঁকে প্রণাম করলাম।” তাঁর বৌভাতে উত্তমকুমার একটি দামি বেনারসি শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। মৃদুলা বলেন, “শাড়িটি প্রথমেই আমাকে দিয়ে এসেছিলেন সুপ্রিয়াদেবী। বড় খোঁপা করে তিনিও খুব সেজে এসেছিলেন। তবে তিনি যে সুপ্রিয়াদেবী তা জানতাম না। তিনি শাড়ি দিয়ে চলে যাওয়ার পরে আমার ননদেরা এ-কথা জানান। আমার বৌভাতের আসর বসেছিল পারিবারিক হলঘরে। পাশের ঘরে ছিলেন উত্তমকুমার। সেখানে তাঁকে প্রণাম করানোর জন্য আমার শ্বশুরমশাই আমাকে নিয়ে যান।”
সত্যনারায়ণ খান ছিলেন বাংলা ছবির প্রযোজনা-পরিবেশনা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সংস্থার নাম ‘চণ্ডীমাতা ফিল্মস’। তাঁর প্রযোজিত পরিবেশিত বহু ছবির বহির্দৃশ্যের শুটিং হয়েছে গোহালপোতা গ্রামে। সেই সূত্রে উত্তমকুমার, সুপ্রিয়াদেবী, সুচিত্রা সেন-সহ বাংলা ছবির প্রায় সব অভিনেতা-অভিনেত্রী গোহালপোতায় এসেছেন, থেকেছেন সত্যনারায়ণের বাড়িতে। বিবাহ-পরবর্তী সময়ে মৃদুলার দায়িত্ব ছিল উত্তমকুমারের খাবারদাবারের ব্যবস্থা করা। তিনি বলেন, “১৯৭০ সালে আমার বিয়ে হয়। তার আগে থেকেই উত্তমকুমার আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার বিয়ের দু’দিন আগেও তিনি ‘কমললতা’ ছবির শুটিং করতে এসেছিলেন বলে শুনেছি। আমার বিয়ের পরে যে-সব ছবির শুটিং এখানে হয়েছে, সেগুলি হল মূলত ‘হার মানা হার’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘প্রতিশোধ’ প্রভৃতি। আমার শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যু হয়েছে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে। আমার বিয়ের পর থেকে শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যু পর্যন্ত এই ছ’বছরে প্রায় দশ বার উত্তমকুমারকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছি। কখনও দু’-তিন দিন থেকেছেন। কখনও এসেই চলে গিয়েছেন। যখন থাকতেন, সকালে খেতেন এক কাপ চা এবং দু’টি ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট। প্রাতরাশ করতেন পাউরুটি-সন্দেশ দিয়ে। দুপুরে ও রাতে খেতেন চারখানা করে গরম রুটি, বাচ্চা মুরগির স্টু। কম মশলা দিয়ে কী ভাবে স্টু রান্না করতে হবে, তা সুপ্রিয়াদেবী আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। রুটি হত কয়লার উনুনের গনগনে আঁচে।”
শুধু শুটিং উপলক্ষেই উত্তমকুমার আসতেন, তা নয়। মৃদুলা বললেন, “আমার প্রথম মেয়ে জন্মানোর আগে সাধ উপলক্ষে উত্তমকুমার এবং প্রযোজক অসীম সরকার এসেছিলেন। উত্তমকুমার দু’টি দামি টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি দিয়েছিলেন। মেয়ের মুখেভাত উপলক্ষে তিনি এসেছিলেন সুপ্রিয়ার সঙ্গে। গিনির লকেট বসানো সোনার হার সুপ্রিয়া পরিয়ে দিয়েছিলেন মেয়ের গলায়। দেওরের বিয়েতেও তাঁরা দু’জনে এসেছিলেন। বেনারসি শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর সব উপহার আমি আজও রেখে দিয়েছি।”
জানা গেল, মহানায়ক খুব বেশি কথা বলতেন না। যতটুকু বলতেন, তাও খুব নিম্নস্বরে। এখানে এলে থাকতেন দোতলা বা তিনতলার ঘরে। মৃদুলা বলেন, “এক দিন তিনি বারান্দায় চেয়ারে বসেছিলেন। আমার ছোট্ট মেয়ে উঠানে খেলছিল। তার ছিল খালি গা। উত্তমকুমার আমাকে বললেন, ‘বৌমা, ওকে জামা পরিয়ে দাও।’ আরও এক দিন তিনি অনেক ক্ষণ আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসেছিলেন, সেই স্মৃতি ভুলব না।” এক বার দোলের সময় অনেকের সঙ্গে উত্তমকুমার এসেছিলেন। হইচই করে আবির খেলে সেদিন বিকেলেই কলকাতায় ফিরে গিয়েছিলেন।”
এক বার উত্তমকুমারকে সুপ্রিয়াদেবীর উপরে খুব রেগে যেতে দেখেছিলেন মৃদুলা। তিনি বলেন, “সেদিন কী একটা ছবির শুটিং উপলক্ষে উত্তমকুমার বিকেলেই চলে এসেছিলেন। সুপ্রিয়াদেবীরও আসার কথা। কারণ তিনিও ছিলেন ওই ছবিতে। আমাদের বাড়ির গাড়ি তাঁকে আনতে গিয়েছিল। কিন্তু রাত এগারোটা বেজে গেলেও তিনি আসেননি। আমার শ্বশুরমশাই আর উত্তমকুমার বাড়ির সামনের রাস্তায় পায়চারি করছেন। আরও কিছুটা পরে সুপ্রিয়াদেবীকে নিয়ে গাড়ি এল। গাড়িতে সুপ্রিয়া বসে। সেই অবস্থায় উত্তমকুমার তাঁকে প্রচণ্ড রেগে বললেন, ‘তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই! এটা কি হোটেল পেয়েছ যে, যখন ইচ্ছে ঢুকবে যখন ইচ্ছে বেরোবে। মনে রাখবে, এটা একটা বাড়ি।’ সুপ্রিয়াদেবীর তখন প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। মিনমিন করে বললেন, ‘কী করব! থিয়েটারের শো শেষ হতে দেরি হল।’ সবটাই ঘটেছিল আমার চোখের সামনে।”
১৯৭৬ সালের নভেম্বরে সত্যনারায়ণ খান মারা যাওয়ার পরও উত্তমকুমার এই বাড়িতে এসেছিলেন। তবে খুব কম। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমার মারা যান। তার পর এই বাড়িও যেন তার ঔজ্জ্বল্য হারায়। এখন সত্যনারায়ণের বিশাল বাড়ি কার্যত শুনশান। ছেলেকে নিয়ে মৃদুলা থাকেন কলকাতায়। কিন্তু বছরে এক-দু’বার তিনি আসেন গোহালপোতায়। কয়েক দিন করে থেকে যান। শুনশান এই বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে থাকেন ছিয়াত্তর বছরের মৃদুলা। বলেন, “ছেলে আসতে চায় না। আমাকেও বলে, ‘কী আছে ওখানে যে তুমি যাও!’ আমি তাকে বলি, তুই সেটা বুঝবি না কেন আমি যাই। আমি সেখানে গেলে যেন দেখতে পাই উত্তমকুমারকে। তাঁর স্মৃতি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক স্বপ্নের জগতে।”