E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিশ্বকাপে খেলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও

কারণ বিষয়টি অল্প সময়ের মধ্যেই থাবা বসিয়েছে আমাদের জীবনের প্রতিটি ছন্দে। ঘটমান ফিফা বিশ্বকাপও সেই প্রবণতারই প্রত্যক্ষ নিদর্শন। ২০২২-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাড়া-জাগানো আবির্ভাবের পর পুরুষদের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ এটিই এবং সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম সবচেয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ ফুটবল। তথ্য-বিশ্লেষণের প্রযুক্তি কেন অপরিহার্য হয়ে উঠছে খেলায় জয়ের জন্য?

অতনু বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৩
মুহূর্ত: চলতি বিশ্বকাপে মিশরের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের মুহূর্ত। নীচে, ফুটবল মাঠের দখল নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (প্রতীকী)

মুহূর্ত: চলতি বিশ্বকাপে মিশরের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের মুহূর্ত। নীচে, ফুটবল মাঠের দখল নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (প্রতীকী)

আলোচনাটা ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে। তবু, প্রথমে ফিরে দেখব ক্রিকেটের একটা পুরনো ঘটনা। ২০১৫-র ওয়ান-ডে ক্রিকেটের বিশ্বকাপের আসর বসেছিল অস্ট্রেলিয়া আর নিউ জ়িল্যান্ডে। সেই টুর্নামেন্টে গ্রুপের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি হাই-প্রোফাইল দল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরে তাদের প্রধান কোচ পিটার মুরের প্রতিক্রিয়া কিন্তু ছিল বেশ আকর্ষণীয়— “আমাদের ডেটা দেখতে হবে।”

পরের উদাহরণটা রাজনীতির। এর পরের বছর, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হারলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টন। হারার পরে তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁদের ‘ডেটা অপারেশন’ ভাল ছিল না প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকানদের মতো। আসলে ২০১৬-তে নির্বাচনী প্রচারে হিলারি ক্লিন্টনের পক্ষ অনেকটাই নির্ভর করেছিল ‘অ্যাডা’ নামে এক কম্পিউটার অ্যালগরিদম— এবং তার সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ-ভিত্তিক স্ট্র্যাটেজির উপর।

তা হলে খেলা থেকে রাজনীতি— সব কিছুতেই জয়-পরাজয়ের নেপথ্যে কি কোনও দলের ডেটা অ্যানালিটিক্স টিম তথ্য বা ডেটাকে কতটা ভালভাবে মন্থন করে কাজে লাগাতে পেরেছে, সেটুকুই? এক দশক আগেই অবস্থাটা এমন ছিল? আসলে আজকের দিনে কোনও নামজাদা খেলার টিম বা রাজনৈতিক দল তথ্য এবং তার প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে কৌশল ঠিক করছে— এটা বলার মতো কোনও ঘটনা নয়। বরং এমন না হওয়াটাই বিস্ময়ের। ফুটবলের মতো একটা প্রবল জনপ্রিয় খেলাও এই ডেটা এবং প্রযুক্তিচালিত সুনামির বাইরে থাকতে পারে না। কিন্তু বেসবল বা ক্রিকেটের মতো খেলার সঙ্গে ফুটবলের কিছু চরিত্রগত পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। বেসবল বা ক্রিকেট চরিত্রগত ভাবে অনেকাংশে স্থির, খণ্ডিত। তুলনায় ফুটবল অবিচ্ছিন্ন।

২০২২ সালের নভেম্বরে আত্মপ্রকাশ করল চ্যাটজিপিটি। সভ্যতার ইতিহাসে সে এক পরিবর্তন-বিন্দু। আমাদের জীবনের সঙ্গে চ্যাটজিপিটি-র ক্রমেই সম্পৃক্ত হওয়াটা নিঃসন্দেহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মূলধারায় উঠে আসার একটি লক্ষণ। ঘটনাচক্রে চ্যাটজিপিটি-র সেই শুরুর সময়ে সংঘটিত হচ্ছিল কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এআই যে থাবা বসিয়েছে আমাদের জীবনের প্রতিটি ছন্দে, ২০২৬ সালের ঘটমান ফিফা বিশ্বকাপে এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার সেই প্রবণতারই প্রত্যক্ষ নিদর্শন। ২০২২-এ এআই-এর সেই সাড়া জাগানো আবির্ভাবের পর পুরুষদের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ এটাই। ২০২৬-এর টুর্নামেন্টটি কিন্তু আগের সব আসর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন— সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা। দেখা যাচ্ছে, ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি, অ্যানথ্রপিকের ক্লড, এক্স-এর গ্রক এবং গুগলের জেমিনি-র মতো এআই প্রযুক্তিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে সে-প্রতিযোগিতায়। কাতারেও অবশ্য এআই-এর ব্যবহার ছিল, যদিও অধিকাংশ দর্শক সেটা খুব একটা বুঝে উঠতে পারেননি।

মানিবল

মাইকেল লুইস ২০০৩ সালে লিখেছিলেন ‘মানিবল: দি আর্ট অব উইনিং অ্যান আনফেয়ার গেম’ বইটি। এটি আমেরিকান বেসবল দল ‘ওকল্যান্ড অ্যাথলেটিক্স’-এর ম্যানেজার বিলি বিনের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। বইটির উপর ভিত্তি করে ২০১১ সালে হলিউডে হয়েছে ‘মানিবল’ নামের জীবনীমূলক ক্রীড়া-নাট্য চলচ্চিত্র— বেনেট মিলার পরিচালিত। বিলি বিনের ভূমিকায় সেখানে ব্র্যাড পিট। বইটিতে ২০০২-এর মরসুমে বিলি বিন কর্তৃক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অর্ধেক— এমনকি এক-তৃতীয়াংশ— অর্থ দিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক দল গঠনের প্রচেষ্টার বিবরণ রয়েছে। অতি অল্প বাজেটে টিম করেও আমেরিকার মেজর লিগ বেসবল প্রতিযোগিতায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিলেন বিলি বিন, কারণ তিনি ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে, একটি শক্তিশালী দল গড়ে তুলেছিলেন কম মূল্যায়িত খেলোয়াড়দের নিয়ে।

‘মানিবল’ চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে, ‘সাবেরমেট্রিক্স’ নামক নিয়োগের জন্য খেলোয়াড় সন্ধানের এক অপ্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন বিন এবং তাঁর সহকারী পিটার ব্র্যান্ড। ‘সাবেরমেট্রিক্স’ আদতে ‘বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান’কে বর্ণনা করে। বেশি প্রতিভাবান ও ব্যয়বহুল খেলোয়াড় নিয়োগ করার সামর্থ্য না থাকায়, তাঁরা ‘বেস স্টিলিং’, রক্ষণভাগ ও ‘ব্যাটিং গড়’-এর মতো প্রচলিত খেলোয়াড়ি দক্ষতার পরিমাপগুলোতে কিছুটা ছাড় দেন। পরিবর্তে তাঁরা মনোযোগ দেন দলের ‘অন-বেস পার্সেন্টেজ’ নামে একটি অপ্রচলিত সূচককে বাড়ানোর দিকে। পুরোটা না হলেও, ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করে একে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে খানিকটা। ক্রিকেটে এক জন ব্যাটারের ব্যাটিং গড় বা স্ট্রাইক রেট তার দক্ষতার নিদর্শক হতে পারে। এমনিতে আইপিএল-এ কোনও খেলোয়াড় কেনার সময় সে-সবই হয়তো দেখা হয় কমবেশি। কিন্তু তা দেখে খেলোয়াড় নিয়োগ না করে কোনও খেলোয়াড় কত বল খেলে কত বার আউট হয়েছে বা কত শতাংশ ইনিংসে আউট হয়নি, সে রকম কিছুকে তার দক্ষতার বা কার্যকারিতার পরিমাপ হিসেবে ধরলে বিষয়টা যেমন হবে, এ যেন অনেকটা সে রকম। বিন এবং ব্র্যান্ড এমন সব খেলোয়াড়কে দলে নেন, যাদের প্রকৃত মূল্য বা গুরুত্ব সে সময় সে ভাবে বিবেচিত হয়নি— যেমন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ডেভিড জাস্টিস, চোটপ্রাপ্ত ক্যাচার স্কট হ্যাটেবার্গ এবং ‘সাবমেরিনার’ (নিচু বা পাশ থেকে বল নিক্ষেপকারী) পিচার চ্যাড ব্র্যাডফোর্ড।

সভ্যতার ইতিহাসে ঘটনাটির, বা বলা ভাল মাইকেল লুইসের বইটি এবং পরবর্তী কালের চলচ্চিত্রটির— প্রভাব কিন্তু অপরিসীম। এর ফলে খেলা-সহ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সূচনা হল ‘মানিবল’ যুগের। প্রচুর তথ্য নিংড়ে, তথ্য বিশ্লেষণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তৈরি হতে থাকল স্ট্র্যাটেজি, জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে।

২০১৪-র ব্রাজ়িল বিশ্বকাপে জার্মানি দল ব্যবহার করেছিল ‘এসএপি স্পোর্টস ওয়ান’ নামে এক অ্যানালিটিক সফটওয়্যারের তথ্যভান্ডার। সে সময় সকল দল এমন প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠেনি। তাই ট্রেনিং, ফিটনেস এবং পারফরম্যান্সে জার্মানির মতো প্রযুক্তি-ব্যবহারকারী দল যে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছিল, বলাই বাহুল্য। যেমন, ২০১০-এর বিশ্বকাপে জার্মানির খেলোয়াড়রা বল ধরে রাখত গড়ে ৩.৪ সেকেন্ড। এসএপি ম্যাচ ইনসাইটস-এর সাহায্যে তারা বুঝল যে দ্রুত বল ছাড়তে হবে। ট্রেনিংয়ের ফলে ২০১৪-তে গড় সময়টা কমে দাঁড়াল ১.১ সেকেন্ড!

মোটামুটি তখন থেকেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে, সেই তথ্য মন্থন করে, খেলোয়াড় নিয়োগ করে চলেছে একেবারে ‘মানিবল’ স্টাইলে। লিভারপুল, ম্যাঞ্চেস্টার, আর্সেনাল— সবাই। এক দশকেরও বেশি আগে লিস্টারের মতো দল যখন প্রচুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এন’গোলো কান্তে, জেমি ভার্ডি এবং রিয়াদ মাহরেজ-এর মতো কম দামি খেলোয়াড়দের নিয়োগ করে, বিস্মিত হয় অনেকেই। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবেই ২০১৬-র প্রিমিয়ার লিগ জেতে লিস্টার। ‘মানিবল’ বিস্তৃত হতে থাকে ফুটবলে, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও।

হিলারি ক্লিন্টনের আগে বারাক ওবামাও প্রচুর তথ্যভিত্তিক প্রচার চালিয়েছিলেন তাঁর নির্বাচনে— ২০০৮ এবং ২০১২-তে। একটা মস্ত দেশের নির্বাচনকে যেন ছোট ছোট পাড়ায় ভেঙে প্রচারের কৌশল ঠিক করা হয়। এবং সেটা ওবামার জয়ের অন্যতম সহায়ক ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ওবামার সেই নির্বাচনী প্রচারই ছিল প্রথম কোনও প্রধান নির্বাচনে ডেটার এমন ব্যাপক ব্যবহার, দুনিয়ার মধ্যেই। হিলারি ক্লিন্টন যখন ভোটে লড়ছেন, তখন কিন্তু প্রযুক্তি আর এক পক্ষের ব্রহ্মাস্ত্র নয়, প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলেছে দু’পক্ষই। ক্লিন্টনের প্রতিপক্ষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষও ব্যবহার করেছে সেই একই ধরনের প্রযুক্তি। এই যেমন আজ আমরা, দর্শকরা, বড় বড় খেলা দেখি, কিন্তু বুঝে উঠতে পারি না যে, খেলোয়াড়রা মাঠে খেলছেন ঠিকই, অলক্ষ্যে খেলছেন দু’দল প্রযুক্তিবিদ।

এআই মানিবল

প্রযুক্তি ক্রমেই উন্নত হয়। ইতিমধ্যে হইহই করে এসে গিয়েছে এআই— ডেটা বা তথ্যই যার শোণিতপ্রবাহ। তথ্যের সমুদ্র মন্থন করেই কাজ করে চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিলি বিনের সেই মানিবল পরীক্ষার পঁচিশ বছর পর এখন তাই এসেছে ‘এআই মানিবল’ যুগ— যা কালের নিয়মে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ধারায়, হয়তো অবশ্যম্ভাবীই ছিল।

খেলাধুলার ক্ষেত্রে ‘এআই মানিবল’ হল স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স বা ক্রীড়া-বিশ্লেষণ থেকে ‘প্রেডিক্টিভ ইন্টেলিজেন্স’ বা ভবিষ্যৎ-নির্দেশক বুদ্ধিমত্তার দিকে উত্তরণ। এখানে স্থির স্প্রেডশিটের জায়গা নিচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন মেশিন-লার্নিং সিমুলেশন ইঞ্জিন, যা খেলোয়াড়দের প্রতিটি মুহূর্তের নড়াচড়ায় নজরদারি করে নিখুঁত ভাবে, অ্যাথলিটদের কাজের চাপ পর্যবেক্ষণ করে, প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বার করে, চোট পাওয়ার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে এবং সব মিলিয়ে মাঠের পারফরম্যান্সকে নিয়ে যায় সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

বর্তমানে আমেরিকার মেজর লিগ বেসবল বা এমএলবি, ন্যাশনাল ফুটবল লিগ বা এনএফএল এবং ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এনবিএ-তে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। তাই ফুটবল বা সকারের জগতেও এটি আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি এবং বায়োমেট্রিক বিশ্লেষণের সাহায্যে অ্যাথলিটদের স্বাস্থ্য, ক্লান্তি ও সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়গুলির প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দলগুলো নিশ্চিত করতে চাইছে তাদের পারফরম্যান্স ও খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা।

খেলাধুলার জগতে এআই কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে, তার কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। অতি সম্প্রতি, আমেরিকার ‘ওকল্যান্ড বলারস’ প্রথম পেশাদার বেসবল দল হিসেবে দলের লাইন-আপ ঠিক করা কিংবা খেলোয়াড় বদলের মতো মাঠের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে এআই— অর্থাৎ মানুষ কোচের জায়গা নিয়েছে যন্ত্র। একই ভাবে, নরওয়ের ফুটবল দল ‘হ্যামক্যাম এফসি’ প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ করেছে এআই-কে। এ ছাড়াও কোচদের সাহায্য করার জন্য এআই উপস্থিত অনেক খেলাতেই। যেমন, এনএফএল-এ, ‘ডাউন’, ‘ডিসট্যান্স’ এবং মাঠের অবস্থানের মতো খেলার তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোচদের সাহায্য করার জন্য স্বয়ংক্রিয় ভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় প্রাসঙ্গিক ভিডিয়োগুলো।

এআই: সমতা ও বিভাজন

এআই আসার ফলে খেলাধুলোর ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রযুক্তিগত ব্যবধানও। ধনী দলগুলো এআই প্রযুক্তির পিছনে খরচ করতে পারছে দেদার। খেলার ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের এই ব্যবধান কমাতে প্রয়োজন সমতা বিধানের। সেটা সহজ নয়, পুরোপুরি সম্ভবও নয়। তবু সমতার লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে ফিফা। এটিই প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ, যেখানে প্রতিটি দলের বেঞ্চে যাতে একই এআই অ্যানালিস্ট বা বিশ্লেষক থাকতে পারে, ব্যবস্থা হয়েছে তার। সমতা বজায় রাখতে ফিফা চালু করেছে ‘ফুটবল এআই প্রো’— লেনোভো-র সহযোগিতায় তৈরি একটি এআই টুল, যা সব দলের জন্যই উন্মুক্ত। সহজ কথায় বলা চলে, ‘ফুটবল এআই প্রো’ যেন ফুটবলের জন্য চ্যাটজিপিটি-র মতো একটি ব্যবস্থা, যা বিশ্বকাপের ৪৮টি দলকেই ফিফার বিশেষ ম্যাচ-ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। এতে রয়েছে ২,০০০-এরও বেশি মেট্রিক বা পরিমাপক এবং লক্ষ লক্ষ ডেটা পয়েন্ট। এর মাধ্যমে তারা দেখতে পারে থ্রি-ডি অবতার, অ্যানিমেটেড রিপ্লে এবং ভিডিয়োর আকারে তৈরি কৌশলগত বিশ্লেষণ। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে যেমন হয়— ক্রমশ তা আরও তথ্য পায়, আরও শেখে, হয়ে ওঠে আরও উন্নত। বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা চলাকালীনও এই এআই টুলটি শিখতে থাকবে ক্রমাগত, এবং আরও উন্নত ও বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ‘ফুটবল এআই প্রো’-কে তাই অভিহিত করা হয়েছে সমতা বিধানকারী বা ‘ইকুয়ালাইজ়ার’ হিসেবে। এর রয়েছে বড় ও ছোট দলের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনার ক্ষমতা— অন্তত ভাবা হয়েছে এমনটাই। মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা-র গ্লোবাল রিসার্চ উল্লেখ করেছে, “অতীতে ধনী দলগুলোর যে বাড়তি সুবিধা ছিল, ২০২৬ সালে এআই সেই ডেটার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে সবাইকে সমান সুযোগ করে দেবে।” এই সমতা সত্যিই কতটা কার্যকর হবে, তা অবশ্য পরবর্তী কালের পর্যালোচনার বিষয়।

এর বাইরেও, প্রতিটি দলের নিজস্ব এআই মডেল ব্যবহারের সুযোগ অবশ্যই আছে। আমেরিকা, জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো নির্ঘাত সেটাই মূলত করছে, যার ফলে তাদের নিজস্ব বিশ্লেষকরা থ্রি-ডি অবতার ও ভিডিয়ো ফুটেজ ব্যবহার করে তুলনা করতে পারবে খেলার শৈলী বা কৌশল। খেলোয়াড়রা পাবেন ব্যক্তিগত ম্যাচ বিশ্লেষণ, এবং কোচরা মূল্যায়ন করতে পারবেন পরবর্তী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত পরিবর্তনগুলোর সম্ভাব্য ফল। যেমন, এই বিশ্বকাপের জন্য ইংল্যান্ডের এআই কৌশলের মধ্যে খেলোয়াড়দের সক্ষমতা বাড়ানো থেকে পেনাল্টিতে দক্ষতা অর্জন— রয়েছে সব কিছুই। এ জন্য তারা ব্যবহার করেছে বিভিন্ন এআই টুল— যার কিছু তাদের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএ-র নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি, এবং কিছু আবার কেনা বাইরের প্রযুক্তি কোম্পানি থেকে। এ-সবের সাহায্যে করা যায় ডেটা বিশ্লেষণ, শনাক্ত করা যায় আকর্ষণীয় তথ্য এবং তৈরি করা যায় কোচ ও খেলোয়াড়দের জটিল বিষয়গুলো বুঝতে সহায়তা করার মতো উপস্থাপনা। কয়েক সপ্তাহ আগে টাইমস স্কোয়ারের স্ক্রিনে আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দল নাটকীয় ভাবে ঘোষণা করেছে, এই বিশ্বকাপে খেলা বিশ্লেষণ করতে ও খেলোয়াড়দের চোট এড়াতে তাদের কোচিং স্টাফ ব্যবহার করবে গুগল জেমিনি-র এআই প্রযুক্তি। এই বিশ্বকাপ বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোরও এআই প্রসারের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে গুগল অংশীদারি গড়ে তুলেছে আমেরিকা, ব্রাজিল ও ফ্রান্স-সহ আটটি দলের সঙ্গে।

বিশ্বকাপ জুড়ে এআই

বিশ্বকাপের খেলোয়াড়রাও তো সাধারণ মানুষ। তাঁরাও ম্যাচের প্রস্তুতি নিতে, নতুন শহরের পরিবেশে মানিয়ে নিতে, শহরের কোথায় খাওয়াদাওয়া বা কী কী করা যায়, সে-সব বিষয়ে এআই ও ডিজিটাল টুল ব্যবহার করছেন।

এআই ব্যবহারের ফলে উপকৃত হবেন রেফারি এবং দর্শকরাও। রেফারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য নতুন কিছু ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অফসাইড ও হ্যান্ডবল শনাক্ত করার প্রযুক্তি। স্মার্ট বলের ভিতরে থাকা সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমেই মূলত হ্যান্ডবল শনাক্ত করার বিষয়টি সম্ভব হচ্ছে। এ যেন মস্তিষ্ক-সহ একটি বল। সর্বকালের বৃহত্তম এই বিশ্বকাপে এআই-এর ব্যবহারের একটি উদাহরণ হল ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি’। যাঁরা খেলা দেখবেন, তাঁরা কেবল ফুটবলই উপভোগ করবেন। কিন্তু যারা পর্দার পিছনের দৃশ্য দেখবেন, তারা প্রত্যক্ষ করবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম ভিডিয়ো, সেন্সর, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর সমন্বয়ে এক বিশাল আয়োজনে পরিচালিত এ যাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম বাস্তব-পরীক্ষা।

বাইরে থেকে সাধারণ মনে হওয়া একটি ম্যাচের নেপথ্যে কাজ করছে ক্যামেরা, সার্ভার, অ্যালগরিদম, মোবাইল ডিভাইস এবং এআই সিস্টেমের এক বিশাল ও জটিল নেটওয়ার্ক, যা এই বিশ্বকাপকে দিচ্ছে এক অনন্য রূপ। মাঠের প্রায় প্রতিটি ঘটনাই জোগান দিচ্ছে ডিজিটাল ডেটা বা তথ্যের— বলের গতিবিধি, খেলোয়াড়দের অবস্থান, শারীরিক সংস্পর্শের মুহূর্ত, রেফারির সিদ্ধান্ত, দর্শকদের নড়াচড়া, এমনকি দর্শকদের জন্য সম্প্রচারিত দৃশ্য— সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। ক্রীড়া-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ যেন একটি বিশাল জীবন্ত গবেষণাগার। এখানে বল নিজেই জানে কী ভাবে চলতে হবে এবং তথ্য পাঠাতে হবে; রেফারিরা সংযুক্ত ক্যামেরার সঙ্গে; খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব করে থ্রি-ডি অবতার; সম্প্রচার কার্যক্রম চলে ‘এজ-কম্পিউটিং’ পরিকাঠামোর উপর ভিত্তি করে; এবং দর্শকরা অ্যাপ ও সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবেশ করেন এমন এক দুনিয়ায় যেখানে অ্যালগরিদমের সাহায্যে যাচাই করা হয় তথ্য বা প্রবেশাধিকার।

ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা-র গবেষণা-দল কিন্তু বলেছে, “২০২৬ সালের বিশ্বকাপই হল প্রথম টুর্নামেন্ট যেখানে ডেটা বা তথ্য নিজেই একটি প্রধান পণ্য।” সেই সঙ্গে তারা আরও বলেছে, “আমরা একটি বিশাল ও রিয়েল-টাইম সিমুলেশন প্রত্যক্ষ করছি, যেখানে ভৌত জগৎকে হুবহু তুলে ধরা হচ্ছে ডেটার মাধ্যমে— আর এই প্রক্রিয়ায় কয়েক পেটাবাইট ডেটা তৈরি হচ্ছে প্রতি সপ্তাহে।”

প্রযুক্তি বনাম মানুষ

তা হলে ডেটা আর তার বিশ্লেষণ, সে জন্য প্রযুক্তি আর আরও ভাল প্রযুক্তিই কি শেষ কথা? ‘মানিবল’ সিনেমার মাঝামাঝি সময়ে দেখা যাচ্ছে, বেসবল স্কাউটিংয়ে মানুষের হস্তক্ষেপের দিকগুলোর প্রশংসা করতে গিয়ে প্রবীণ গ্রেডি বলেন, “বিলি, বেসবল মানেই কেবল সংখ্যা আর বিজ্ঞান নয়... ওদের সেই অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে যা আছে আমাদের।” এর জবাবে বিলি বিন অবশ্য বলেছিলেন, “মানিয়ে নাও, নয়তো টিকে থাকতে পারবে না।”

বিলি বিন সত্যিই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, খেলাধুলো ও জীবনযাত্রার অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও গণিতকে কাজে লাগানোর ধারণাটি তিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন দুনিয়া জুড়ে। এখন এটা স্পষ্ট যে, আজকের দিনের ‘বিলি’দের টিকে থাকতে হলে ‘মানিবল-পদ্ধতি’তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও নিতে হবে আপন করে, সম্পৃক্ত করে।

তবে, এআই-এর এই যুগে ডেটার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই অর্থে, বিশ্বকাপ কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও খেলাধুলোর যৌথ প্রদর্শনীই নয়, সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বহুজাতিক পরীক্ষাও বটে।

দলগুলোর এটাও নিশ্চিত করা উচিত যে, এআই যেন মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন না করে বরং তাতে সহায়তা করে, এআই যেন কাজ করে পরিপূরক হিসেবে। প্রয়োজন ম্যাচের প্রেক্ষাপট, খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব এবং খেলার মোড় বা ‘মোমেন্টাম’ সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সফল সমন্বয়। কারণ, শুধুমাত্র প্রযুক্তি কখনও শেষ কথা হতে পারে না।

প্রথম দিকে ‘মানিবল’ কৌশল ব্যবহার করে সব চাইতে বেশি সাফল্য যারা পেয়েছেন, তাঁদের এক জন হলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেট কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। কিন্তু এই ‘মানিবল’-অনুপ্রাণিত ফ্লাওয়ারের অধীনেই ইংল্যান্ড ০-৫ ব্যবধানে হেরেছে ২০১৩-১৪’র অ্যাশেজ় সিরিজ়ে। আবার ২০০২-এ আমেরিকান লিগের পশ্চিম অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন হয় ওকল্যান্ড অ্যাথলেটিক্স— বিলি বিনের যুগান্তকারী ‘মানিবল’ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ডিভিশন প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে মিনেসোটা টুইনস-এর কাছে পরাজিত হয় তারা। এক জন গণমাধ্যম বিশ্লেষক দাবি করেন, পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, এমন কিছু অদৃশ্য গুণের অভাবই ছিল ওকল্যান্ড অ্যাথলেটিক্স-এর সেই পরাজয়ের কারণ। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিলি বিনের অধীনে ওকল্যান্ড অ্যাথলেটিক্স পর পর চার বার প্লে-অফ পর্যায়ে উঠেছে বটে, কিন্তু সে পর্যায়ে তাদের ফল হয়েছে খুব খারাপ। সাবেরমেট্রিক্স কাজ করেনি সেখানে। তাই স্পষ্টতই একটা পর্যায়ে ‘মানিবল’-এরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা।

২০১১ সালে ‘দ্য বিউটি অব শর্ট হপস: হাউ চান্স অ্যান্ড সারকামস্ট্যান্স কোফাউন্ড দ্য মানিবল অ্যাপ্রোচ টু বেসবল’ নামে বই লিখেছেন শেলডন হির্শ আর অ্যালান হির্শ। তাঁদের যুক্তি, বেসবল খেলার যে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তার কোনও গাণিতিক পরিমাপ সম্ভব নয়, অঙ্কের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই তার। নিঃসন্দেহে, প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, তবে একমাত্র বা চূড়ান্ত সমাধান নয়। হতে পারে না।

আর আমরা তো জানি, বিশ্বাস করি— লিয়োনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বা কিলিয়ান এমবাপের মতো ‘ম্যাজিশিয়ান’দের অনন্য প্রতিভার কাছে এআই বা যে কোনও প্রযুক্তি-ভিত্তিক ‘মানিবল’ কৌশল অকেজো হয়ে পড়তে পারে যে কোনও দিন। আর ঠিক সেখানেই তো যন্ত্রের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব— সেখানেই মানুষের জাদুকরি নৈপুণ্য সুন্দর ও আকর্ষণীয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
fifa Football World Cup 2026 Artificial Intelligence

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy